kalerkantho


স্থানীয়দের উদ্যোগে মাদকের আখড়া এখন আকর্ষণীয় পার্ক

কবীর আলমগীর   

৭ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



স্থানীয়দের উদ্যোগে মাদকের আখড়া এখন আকর্ষণীয় পার্ক

ভোর হতে না হতেই পার্কটি ভরে যায় কানায় কানায়। কেউ এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত হাঁটেন। কেউ একটু থেমে শুরু করেন শারীরিক ব্যায়াম। কেউ কেউ বসার বেঞ্চে বিশ্রামের ফাঁকে গল্প করেন। সরকারি খাতায় এটি চৌধুরীপাড়া শিশু পার্ক নামে পরিচিত। এটির মালিকানা গৃহায়ণ ও গণপূর্ত অধিদপ্তরের। এভাবেই স্থানীয়দের চিত্তবিনোদন ও প্রাতর্ভ্রমণের জন্য পার্কটি ব্যবহার হওয়ার কথা থাকলেও অযত্ন-অবহেলায় এই পার্ক একসময় নেশাখোরদের দখলে চলে যায়। প্রতি সন্ধ্যারাতেই পার্কে ঢুকে পড়ত মাদকসেবীরা, চলত মাদকের কেনাবেচা ও সেবন। পার্কটি প্রতিষ্ঠার পর এভাবেই চলেছে ১০-১২ বছর। কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় পার্কটির অবস্থা দিন দিন বেহাল হয়ে পড়ে। নেশাখোরদের আনাগোনায় পার্কটিতে প্রবেশেও ভয় করত স্থানীয়রা। পার্কটি রক্ষণাবেক্ষণে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বছরের পর বছর পড়ে ছিল অবহেলায়।

স্থানীয় কয়েকজনের উদ্যোগে এক যুগ পর অবহেলায় পড়ে থাকা এ পার্ক এখন শোভা বিলিয়ে যাচ্ছে। মাদকের আখড়া থেকে পার্কটি এখন পরিণত হয়েছে রকমারি ফুলের বাগানে। মানুষ এখানে হাঁটতে আসে, খেলাধুলা করতে আসে শিশু-কিশোররা। কিন্তু কিভাবে অবহেলায় পড়ে থাকা একটি পার্ক এলাকাবাসীর কাছে ধীরে ধীরে পছন্দের জায়গা হয়ে উঠল, সেই প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ‘চৌধুরীপাড়া গ্রীন সোসাইটি’র সহসাধারণ সম্পাদক মো. ফায়েজ উল্লাহ বলেন, “২০১৪ সালে আমরা প্রথম উদ্যোগটি গ্রহণ করি। পরিকল্পনা করি, কিভাবে এই পার্ক সুন্দর করা যায় এবং ব্যবহার উপযোগী করে গড়ে তোলা যায়। এ ব্যাপারে প্রচারাভিযানও চালানো হয়। এভাবে উদ্যোগের কথা জানানো হয় স্থানীয় তিনশতাধিক মানুষকে। প্রথম প্রথম সবার মধ্যেই আগ্রহ-উদ্দীপনা থাকলেও শেষ পর্যন্ত দলে থাকেন ৫০-৬০ জন। পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য আমরা একটি সংগঠন দাঁড় করাই। সংগঠনটির নাম দেওয়া হয় ‘চৌধুরীপাড়া গ্রীন সোসাইটি’।”

সম্মিলিতভাবে একটা কমিটিও গঠন করেন তাঁরা। কমিটির সভাপতি হন শফিকুল ইসলাম, সহসভাপতি মনিরুজ্জামান চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন। প্রথম পরিকল্পনা সম্পর্কে ফায়েজ উল্লাহ আরো বলেন, ‘একটা ভালো কাজ শুরু করতে যাচ্ছি, এটা ছিল সবচেয়ে আনন্দের। কিন্তু পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হলে টাকা দরকার। আমরা টাকা সংগ্রহ শুরু করলাম। যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী চাঁদা দেওয়া শুরু করলাম।’ এভাবেই চাঁদা সংগ্রহ করে শুরু হলো পার্কটির সংস্কারকাজ। ঠিক করা হলো প্রবেশদ্বার, দুটি বাথরুম, বসানো হলো বাচ্চাদের খেলাধুলার জন্য দোলনা, ঢেঁকি, স্লিপার। লাগানো হলো তিনশতাধিক ফুলের চারা। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি পার্কের দেয়ালে দেওয়া হয় রঙের ছোঁয়া। শুধু এখানেই শেষ নয়, এগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য একজন নিরাপত্তা প্রহরী ও একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মীও রাখা হয়েছে। তাদের বেতন বাবদ সংগঠনের পক্ষ থেকে খরচ করা হচ্ছে ১৪ হাজার টাকা।

কমিটির সভাপতি শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘একটা ভালো কাজের সঙ্গে আছি, এটা আমাদের জন্য পরম পাওয়া। আমাদের আন্তরিকতার অভাব নেই। ভবিষ্যতেও আমাদের এ কাজের ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে। সরকারিভাবে পার্কটি রক্ষণাবেক্ষণের কোনো উদ্যোগ ছিল না। আমরা লোক নিয়োগ করে সংগঠন থেকে তাদের বেতন-ভাতা দিচ্ছি।’ তবে তিনি আর্থিক সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘ভালো এই উদ্যোগের ধারাবাহিকতা ধরে রাখার জন্য দরকার ফান্ড। আমরা আমাদের মতো চেষ্টা করে যাচ্ছি। প্রবাসী শুভাকাঙ্ক্ষীরাও অনেক সময় আমাদের সহায়তা করেন, আর্থিক অনুদান দেন। ব্যক্তিগত অনুদানের পাশাপাশি সরকারি সহায়তা পেলে ভালো হতো।’

তিনি আরো বলেন, ‘স্থানীয় শুভাকাঙ্ক্ষী প্রফেসর জামশেদ আলী শেখ, অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী আবদুল আজিজ, জার্মানির আবদুস সালাম খোকা, নিউ ইয়র্ক প্রবাসী বাবুল আহমেদ অনুদান দিয়েছেন। পার্কটির সৌন্দর্য বাড়ানোর কাজে তাঁরা সহায়তা দিয়েছেন। এখনো তাঁরা খোঁজখবর রাখছেন, এটা আমাদের বিশেষ পাওনা।’ স্থানীয় অপর এক সংগঠনের সাধারণ পরিষদের সভাপতি আসাদুজ্জামান আজাদ বলেন, ‘ঢাকা শহরে খোলামেলা জায়গাগুলো ক্রমেই সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, হাঁটাচলার জায়গা একেবারেই নেই। এই পার্কটিতে এখন সকাল-বিকাল মানুষজন হাঁটতে আসে, বাচ্চারা খেলাধুলা করতে আসে। এর থেকে ভালো লাগা আর কী হতে পারে।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমি চৌধুরীপাড়া গ্রীন সোসাইটির একজন শুভাকাঙ্ক্ষী। একটা ভালো উদ্যোগের সঙ্গে থাকতে পারায় নিজেকে ধন্য মনে করছি।’

প্রায় প্রতিদিনই এই পার্কে হাঁটতে আসেন সাবেক জজ শামসুল আবেদিন। তিনি বলেন, ‘পার্কটির পরিবেশ আগে ভালো ছিল না। এখন এটির পরিবেশ অনেক ভালো। সম্মিলিত প্রচেষ্টা থাকলে ভালো অনেক কিছু করা সম্ভব, এটি তার উদাহরণ। স্থানীয় তরুণ-যুবকদের এই উদ্যোগ থেকে শেখার অনেক কিছু আছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘তরুণদের মধ্যে অনেক সম্ভাবনা আছে। সম্মিলিত উদ্যোগ থাকলে এসব সম্ভাবনা সঠিকভাবে কাজে লাগানো যায়। পার্কটির সৌন্দর্যবর্ধনে তরুণদের এই সম্ভাবনার কথা জানান দেন।’

গ্রীন সোসাইটির উদ্যোক্তা শহিদুল আলম বলেন, ‘স্থানীয় লোকজন পার্কে এসে আনন্দ ভোগ করে, হাঁটাচলা-চিত্তবিনোদনের পরিবেশ পায়। স্থানীয় লোকজনও আমাদের এই উদ্যোগকে ইতিবাচকভাবে নিয়েছে।’ শুধু চিত্তবিনোদন নয়, স্থানীয়দের উদ্যোগে গত বছর আয়োজন করা হয় ফ্রি মেডিক্যাল ক্যাম্পের। নাক-কান-গলা, মেডিসিন প্রভৃতি রোগীর চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয় এই ক্যাম্পে। চৌধুরীপাড়া গ্রীন সোসাইটির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে সংগঠনের সভাপতি শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আপাতত পার্ক নিয়ে আমাদের পরিকল্পনা চলমান। তবে ভবিষ্যতে আমরা সামাজিক-সাংস্কৃতিক অনেক কাজ করতে চাই। আশা করি আমাদের এই সংগঠন ভালো কাজের একটা দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।’

 


মন্তব্য