kalerkantho


আমার ঢাকা...

সর্বংসহা ঢাকা আমার

মৌলি আজাদ   

৭ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



সর্বংসহা ঢাকা আমার

সেই যে ঢাকার এক ক্লিনিকে প্রথম চিৎকার দিয়ে ঢাকাকে জানিয়েছিলাম—আমি এসেছি তোমার শহরে, সে শহরে আজও আছি...

ইিউরোপ-আমেরিকা যাইনি আমি। তবে বইয়ের পাতায় আর ছবিতে সেসব দেশের পরিষ্কার মসৃণ রাস্তা, উঁচু দালান আর চমৎকার ছবির মতো সাজানো শহরের বর্ণনা পেয়েছি ঢের। ভ্রমণের সুবাদে এশিয়া আর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার শহরগুলো আমার দেখা। কিছু শহর ভালোই পরিপাটি, আবার কয়েকটি শহর এখনো গুছিয়ে উঠতে পারেনি বলে মনে হয়েছে। আর আমার নিজ শহর ঢাকা! যেখানে প্রায় ৪০ বছর ধরে আমার বাস। সেই যে ঢাকার এক ক্লিনিকে প্রথম চিৎকার দিয়ে ঢাকাকে জানিয়েছিলাম—আমি এসেছি তোমার শহরে, সে শহরে আজও আছি। মাঝে ঢাকার বাইরের দু-একটি শহরে নিজেকে গোছাতে চেয়েছিলাম। পারিনি। জানি না কেন? এটা কি তবে রাজধানী ঢাকার টানেই?

ঢাকা শহরের বাইরে পৃথিবীর যেকোনো জায়গায় যাই না কেন—ঢাকার কথা মনে হলেই মনের মধ্যে অদ্ভুত এক আচ্ছন্নতা আমাকে ঘিরে ধরে। প্রচুর মানুষ, রিকশার টুং টাং শব্দ, রাস্তায় অসংখ্য গাড়ি, রাস্তায় পড়ে থাকা ধুলা আর কাগজের খোসা। কিন্তু তার পাশেই ফুটপাতে আড্ডায় মেতে আছে তরুণ-তরুণীরা। এই তো আমার প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর ঢাকা।

কৈশোরে ঢাকার আজিমপুরে থাকতাম। তখন রাস্তায় এত গাড়ি দেখিনি। যদিও ঢাকার রাস্তায় আজকাল বিএমডাব্লিউ, পরসে, মার্সিডিসের মতো নামিদামি গাড়ি হরহামেশাই দেখা যায়। সে সময় হাইরাইজ বিল্ডিং আমার চোখে পড়েনি। এলাকার মেয়েরা দল বেঁধে স্কুলে যেতাম আবার বাড়ি ফিরতাম। মা-বাবাও আমাদের নিরাপত্তা নিয়ে খুব বেশি চিন্তিত ছিলেন না। বিকেলে আশপাশে সমবয়সী যাদের সঙ্গে আড্ডা দিতাম, বিষয় থাকত মূলত একটাই—‘পড়ার বুক বা আউট বুক’। সে সময় কারো ভালো রেজাল্ট হলে সঙ্গে সঙ্গে বাসায় চলে আসত মিষ্টি। পাশের বাড়ির আংকল মারা গেছেন, কিভাবে বন্ধুর পরিবার তাদের অনিশ্চিত আগামী দিনগুলো পাড়ি দেবে, তা ভেবে রাতে ঘুমাতে পারতাম না। নিজের জন্মদিনে মনে মনে আশা করতাম, নিশ্চয়ই প্রিয়জনের কাছ থেকে পাব প্রিয় লেখকের কোনো বই। মাঝেমধ্যে ঘুরতাম ঢাকার নিউ মার্কেটে। সস্তায় কত কিছুই না কিনতাম! তারুণ্য পুরোটাই কাটিয়েছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কোয়ার্টারে। মনে হতো এ যেন স্বর্গ। চারপাশ সবুজ গাছে ঢাকা এক ভূস্বর্গ!

এখন ২০১৮ সাল। মাঝেমধ্যে মনে হয়, আমার শৈশব-কৈশোর-তারুণ্য সব যেন কেউ এক টান দিয়ে নিয়ে গেছে। সেই সঙ্গে বদলে গেছে আমার পুরনো সেই চেনা ঢাকা। আজ ঢাকার রাস্তা মানে গাড়ির ভিড়। ফুটপাতজুড়ে দোকানপাট। নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে অনেক বেশি সময় নিয়ে ঘর থেকে বের হতে হয়। চারপাশে গাড়ির ধোঁয়া আর শব্দে হাঁসফাঁস করি আমি। ক্লান্তি ভর করে আমায়। ঢাকার মানুষকেও লাগে বড্ড অচেনা। বেশির ভাগই যেন এক নোংরা প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত, যেভাবেই হোক, অন্যকে টপকে নিজেকে ওপরে উঠতে হবে। অন্যের দিকে তাকানোর সময় নেই যেন কারো। হালফ্যাশন আর বাংলিশ উচ্চারণে অভ্যস্ত আমাদের সন্তানরা। আড্ডায় গিয়ে আজ আর ঢাকার মানুষ মন খুলে দুদণ্ড কথা বলে না। মাথা নিচু করে তাদের হাত ঘুরে চলে শুধু মোবাইলে। প্রযুক্তিনির্ভর ফাস্ট ফুডের দোকানসমৃদ্ধ যত্রতত্র ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শহর আজ ঢাকা। উড়াল সেতু, বিশাল বিলবোর্ড, হাজারো নামিদামি পণ্যের শপিং সেন্টার, চেইন সুপার শপ ও নিয়ন বাতিতে ঘেরা আমার ঢাকা আজ বড় ব্যস্ত। ঢাকা, তোমার কি সময় নেই নিজের দিকে তাকানোর? তুমি কি এই শহরের নানা ঝামেলার ভারে ভারাক্রান্ত? যানজট কি তোমায় ক্লান্ত করে? জলাবদ্ধতায় তোমারও কি আমাদের মতো কষ্ট হয়? এত বড় বড় অট্টালিকার ভিড়ে ফুটপাতের রাতযাপনরত শিশুদের দেখে কি তুমি বিব্রত হও? তুমি কি এ শহরে একটা ফাঁকা মাঠ বা ঝিল খোঁজো? সর্বংসহা ঢাকা আমার। মেগাসিটি ঢাকা আমার। জীবিকার শহর ঢাকা আমার। ভাবছ, তোমার এত সব অসুবিধা দেখার জন্য তবে কি কেউ নেই? আছে। নিশ্চয়ই আছে। শুধু সময়ের অপেক্ষা...

 


মন্তব্য