kalerkantho


দৃপ্ত পায়ে এগিয়ে চলা

মারুফা মিতু   

৭ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



দৃপ্ত পায়ে এগিয়ে চলা

মডেল : বেলা ছবি : মঞ্জুরুল আলম

প্রেস ফর প্রগ্রেস। দৃপ্ত পায়ে এগিয়ে চলা। আমাদের নারীরা এগিয়ে চলছেন। আত্মবিশ্বাসে। দৃঢ়চিত্তে প্রতিটি ক্ষেত্রে অবদান রাখছেন। যোগ্যতায়-দক্ষতায়। ২০১৮ সালে নারী দিবসের প্রতিপাদ্য প্রেস ফর প্রগ্রেস বাংলাদেশের নারীদের জন্য উপযুক্ত প্রতিপাদ্যই ধরা যায়।

বাংলাদেশের নারীদের দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উন্নয়ন ও ক্ষমতায়ন এখন একটি অন্যতম আলোচিত বিষয়। বিশ্বব্যাপী নারীরা যুগ যুগ ধরে শিক্ষা-দীক্ষায় পিছিয়ে আছে। পরিবার ও সমাজে তাদের স্থান এখনো পুরুষের সমকক্ষ নয়। পুরুষশাসিত সমাজ মনে করে পারিবারিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ইস্যুতে নারীর মতামতের খুব একটা প্রয়োজন নেই। ফলে নারী তার ন্যায্য অধিকার এখনো পায়নি। সামাজিক অবহেলার কারণে নারীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকারও কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। পঞ্চাশের দশকের আগে অনেক উন্নত দেশেই নারীর ভোটাধিকার ছিল না। অনেক দেশে জাতীয় নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সুযোগ থাকলেও প্রার্থী হিসেবে নারীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার অনুমতি ছিল না। তাই নারীর রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় বিশ্বনেতারা এগিয়ে আসেন। সত্তরের দশক থেকে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো ছাড়া প্রায় সব দেশেই নারী ভোটাধিকার পায়। সৌদি আরবের নারীদের ২০১৫ সালে ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ২০১৫ সালের ১২ ডিসেম্বর পৌর নির্বাচনে তাঁরা ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন।

নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য দূরীকরণে ১৯৭৯ সালে জাতিসংঘে সিডও সনদ অনুমোদিত হয়। ১৯৮১ সাল থেকে তা কার্যকর হয়। এ পর্যন্ত বাংলাদেশসহ ১৮০ টিরও বেশি দেশ এতে স্বাক্ষর করেছে। বাংলাদেশ উচ্চ আদালত ২০০৯ সালে সিডও সনদের আলোকে কর্মক্ষেত্রে ও শিক্ষাঙ্গনে নারী ও শিশুর প্রতি যৌন হয়রানি বন্ধে একগুচ্ছ দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। সেই পরিপ্রেক্ষিতে সরকার পদক্ষেপ নিয়েছে এবং এর সুফল পাওয়া যাচ্ছে।

ইতিমেধ্য নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে সরকার ২০১০ সালে পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ ও সুরক্ষা আইন প্রণয়ন করেছে। এ ছাড়া নারীনীতি, মানবপাচারসংক্রান্ত আইন, পর্নোগ্রাফি আইন, শিশুনীতিসহ অনেক আইন প্রণয়ন করা হয়েছে, যা নারী ও শিশুর সুরক্ষায় ভূমিকা রাখছে।

জাতিসংঘ কর্তৃক ২০০০ সালে গৃহীত সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যগুলোর মধ্যে লিঙ্গসমতা, নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা, সর্বজনীন শিক্ষা এবং শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্য উন্নয়নে বাংলাদেশ অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে পূরণ করতে সক্ষম হয়েছে। এখন আমাদের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। জাতিসংঘ পর্যালোচনায় দেখা গেছে, বিশ্বকর্মঘণ্টার দুই-তৃতীয়াংশ সময় কাজ করে নারী। কিন্তু বৈশ্বিক আয়ের মাত্র ১০ শতাংশ তারা আয় করে।

আবার বিশ্বসম্পদের এক শতাংশেরও কম সম্পদ নারীর মালিকানায় আছে। বিশ্বের প্রাপ্তবয়স্ক অশিক্ষিত মানুষের দুই-তৃতীয়াংশ নারী। আর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গমনোপযোগী কিন্তু স্কুলে যায় না এমন শিশুর ৬০ শতাংশই মেয়েশিশু। তাই ছোট-বড়, ধনী-গরিব সব দেশই নারীর ক্ষমতায়ন ইস্যুতে সোচ্চার হয়েছে। বিশ্বের প্রভাবশালী দেশ যুক্তরাষ্ট্রের নারীরা এখনো বেতনবৈষম্যের শিকার।

নারীর দৃঢ় পায়ে এগিয়ে চলার বিষয়ে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়শা খানম জানান, তৃতীয় বিশ্বের দেশ হলেও বাংলাদেশ আর্থ-সামাজিক অগ্রগতিসহ অনেক ক্ষেত্রেই এখন বিশ্বের কাছে রোল মডেল। নারীর অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ এখন অনেক ধনী দেশকেও ছাড়িয়ে গেছে। নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের দিক থেকে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের প্রথম দশটি দেশের একটি। সরকার ইউনিয়ন পরিষদ আইন সংশোধন করে প্রতি ইউনিয়নে তিনজন করে নারী সদস্যের কোটা নির্ধারণ করেছে। উপজেলা পরিষদে নারী সদস্য অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা হয়েছে। পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনেও কাউন্সিলরের এক-তৃতীয়াংশ পদ নারীর জন্য সংরক্ষণ করা হয়েছে। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে বর্তমানে ১৫ হাজারের বেশি নারী সদস্য আছেন। পাশাপাশি উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা করে নারীরা মেয়র, চেয়ারম্যান, মেম্বার, কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁরা ইউনিয়ন, পৌরসভা, উপজেলা ও সিটি করপোরেশনে জনগণের উন্নয়নে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। পুরুষ সদস্যদের পাশাপাশি তাঁরাও বিভিন্ন সামাজিক ইস্যুতে মতামত দিচ্ছেন। তাঁদের প্রস্তাব গৃহীত হচ্ছে। জাতীয় সংসদে ৫০ জন সংরক্ষিত আসনের নারী সংসদ সদস্য রয়েছেন। এ ছাড়া বেশ কিছু নারী সরাসরি প্রত্যক্ষ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, সংসদে বিরোধীদলীয় নেত্রী, হাইকোর্টের বিচারপতি, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, সেনাবাহিনী, সরকারের উচ্চ পর্যায়ের আমলাসহ উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নারী রয়েছেন। তাঁদের গতিশীল নেতৃত্ব দেশকে আর্থ-সামাজিকভাবে এগিয়ে নিচ্ছে। রাষ্ট্রের কল্যাণে তাঁরা আইন প্রণয়ন করছেন।

আমরা যদি নারী ও শিশুর উন্নয়নের ধাপটি দেখি, তাহলে দেখব তাদের শিক্ষা, সেবা-শুশ্রূষা, চাকরি, সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। যাতে তারাও স্বাভাবিক শিশুদের মতো বেড়ে উঠতে পারে। ক্ষুদ্র জাতিসত্তা ও নৃগোষ্ঠীর শিশুদের উন্নয়নেও সরকার নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। গ্রামে গ্রামে কমিউনিটি ক্লিনিক ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র হয়েছে। সেখান থেকে দরিদ্র জনগোষ্ঠী স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছে। নারী ও শিশুর মৃত্যুহার হ্রাসে বাংলাদেশ সাফল্য অর্জন করেছে। নারী ও শিশুর মৃত্যুহার হ্রাসের জন্য বাংলাদেশ জাতিসংঘের সাউথ পুরস্কার লাভ করেছে।

দেশ-বিদেশ জয় করার পরও আমরা অনেক সময় দেখি, আমাদের নারীরা ঘরেই অনেক পিছিয়ে আছে। এ বিষয়েই শুনব একজন কর্মজীবী নারীর মুখে। ব্যাংক কর্মকর্তা সাদিয়া ইসলাম জানালেন, আমি একজন কর্মজীবী নারী। আর ব্যাংকে চাকরি মানে সারা দিন নাকেমুখে কাজের চাপে থাকা। সময়ের সঙ্গে পল্লা দিয়ে পথ চলতে হয়। ঘুম থেকে উঠেই সন্তানদের টিফিন বক্স রেডি করা, তাদের স্কুলে পাঠানোর জন্য তৈরি করা, ছেলে-মেয়েদের স্কুলে দিয়ে আমার অফিসে আসা। এর মধ্যে ঘরের কাজে সাহায্যকারীকেও সারা দিনের কাজ বুঝিয়ে দিয়ে আসা, কী রান্না হবে, তা-ও বলে আসা; বাচ্চারা স্কুল থেকে ফেরার পর কী খাবে ইত্যাদি। এসব আগের দিনই মোটামুটি গুছিয়ে রাখি। আরো বিকেলের নাশতা। এসব গুছিয়েই আমাকে অফিস যেতে হয়। সূর্যমামা জাগার আগেই আমাকে জাগতে হয়। একজন নারী যখন কর্মজীবী হন, তখন তাঁকে তিন গুণ বেশি কাজ করতে হয়। সংসারের সব কাজ সামাল দিয়েই অফিসে যেতে হয়। আবার কর্মক্ষেত্রেও একজন নারীকে তাঁর পুরুষ সহকর্মীর তুলনায় দ্বিগুণ কাজ করতে হয়। পদে পদে নারীকে প্রতিমুহূর্তে কতটা যোগ্য ও দক্ষ তা প্রমাণ করতে হয়। তাই কর্মক্ষেত্রে তাঁকে কাজটাও করতে হয় বেশি। আর সংসারে একজন নারীকে সব সময় দশভুজা হিসেবেই দেখতে চায় পরিবারের সদস্যরা। তাই নারীকে ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে দৌড়ে, পরিশ্রমে প্রতিটি সময় পার করতে হয়। আমি একজন কর্মজীবী নারী। বাইরের কাজের আর্থিক মূল্য মাস শেষে আমি কিন্তু ঠিকই পাচ্ছি। কিন্তু ঘরের কাজ, এর আবার কিসের মূল্যায়ন? তাই ঘরের কাজের কোনো মূল্যায়ন হয় না এই আমারই। যেখানে একজন নারী তাঁর কর্মদক্ষতায় বিশ্ব জয় করে চলছেন; কিন্তু প্রতিনিয়ত স্বীকৃতি পাচ্ছেন না ঘর থেকেই। দৃপ্ত পদক্ষেপে এগিয়ে চলার জন্য একজন নারীকে তাঁর স্বীকৃতির শুরুটা করতে হবে তাঁর ঘর থেকেই।

 

 


মন্তব্য