kalerkantho


দখল-দূষণে ধুঁকছে ধোলাইখালের অবশিষ্টাংশ!

জাহিদুল ইসলাম   

৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



দখল-দূষণে ধুঁকছে ধোলাইখালের অবশিষ্টাংশ!

দোলাই নদী কালের পরিক্রমায় পরিবর্তিত হয়ে এখন পরিণত হয়েছে মৃতপ্রায় ধোলাইখালে। খালের পাড়ে প্রতিনিয়ত ফেলা হচ্ছে ময়লা-আবর্জনা। খাল দখল করে গড়ে উঠেছে বাড়ি, দোকান ও রাস্তাঘাট। এতে খাল যতটুকু প্রশস্ত আছে, তা ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছে দখলের কবলে। এলাকার কাউন্সিলরও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যেকোনা সময় খালের উন্মুক্ত অংশটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার।

সরেজমিনে দেখা গেছে, সূত্রাপুর থানা থেকে পূর্ব দিকে একটু এগিয়ে গেলেই সেই ধোলাইখাল কালভার্ট পুল। পাশেই বক্স কালভার্টের শেষ প্রান্তে গড়ে উঠেছে একটি সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন (এসটিএস)। এই এসটিএস থেকে ডান দিকে কেশব ব্যানার্জি রোডে ঢুকতেই দেখা মেলে খালের উন্মুক্ত অংশের দুই পাড়েই আবর্জনার স্তূপ। স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আবর্জনা ফেলে ভরাট করে গড়ে তোলা হয়েছে অন্তত ৫০টি অস্থায়ী দোকান। এতে কেশব ব্যানার্জি রোডসংলগ্ন এবং মিল ব্যারাকের পাশ ঘেঁষে বয়ে যাওয়া খালের অংশটুকু এখন পর্যন্ত যে উন্মুক্ত আছে, সেটুকুও আবর্জনায় ভরাট আর দুই পাশের ভরাট জায়গা দখল হয়ে যাচ্ছে। যেখানে একসময় খালের প্রশস্ততা ছিল শতাধিক ফুট, তা এখন আছে মাত্র ২৫-৩০ ফুট। এই পানিও নোংরা, দূষণ আর দুর্গন্ধময় হয়ে গেছে। ধোলাইখালের এই বক্স কালভার্টের মাধ্যমে যাত্রাবাড়ী, ব্যারাক পুলিশ লাইনস, কেশব ব্যানার্জি রোড, আর কে দাস রোড, আলমগঞ্জ রোড, সূত্রাপুর, নারিন্দা, দয়াগঞ্জের সঙ্গে যুক্ত থাকায় এখানকার সব ড্রেন উন্মুক্ত হয়েছে এই খালে এসে। এ ছাড়া খালটি এখন ফরিদাবাদ হয়ে বুড়িগঙ্গায় পতিত হয়েছে। স্থানীয় কয়েকজন প্রবীণ ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এই খালের অংশটি এখন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৪৬ নম্বর ওয়ার্ডের অংশ। এই ওয়ার্ডের লোকসংখ্যা এক লাখ ২০ হাজারের বেশি। লোহারপুল এলাকার বাসিন্দা রহিদুল ইসলাম বলেন, ‘এই খাল একসময় অনেক বড় ছিল। সেখানে জেলেরা মাছ ধরত। জাহাজ চলাচল করত। এখন ধীরে ধীরে এটি ভরাট হতে হতে নালায় পরিণত হয়েছে।’

খালের পাশে চা দোকানদার আবুল কালাম মিল ব্যারাকের রাস্তা দেখিয়ে বলেন, ‘এটিও খালের অংশ ছিল।’ এ ছাড়া খালের পশ্চিম দিকের কয়েকটি বাড়ি দেখিয়ে বলেন, ‘এই বাড়িগুলোর বেশির ভাগই পড়েছে খালের জায়গায়। খাল ভরাট হওয়ায় এলাকার সড়কে ভারী মালবাহী কনটেইনার চলাচলের কারণে সৃষ্টি হয় যানজটের। নালা ছোট হওয়ায় মাঝেমধ্যেই ড্রেন থেকে উঠে আসে ময়লা-আবর্জনা।’ মিল ব্যারাকের বাসিন্দা মাতিন বলেন, ‘কালভার্ট সেতুর কাছ থেকে শুরু হয়ে খালের উন্মুক্ত অংশটুকু বুড়িগঙ্গা নদীতে মিলেছে। সেখান থেকে পাম্প করে খালের পানি বুড়িগঙ্গায় ফেলা হয়। এমনিতে বক্স কালভার্ট করার পর পরিষ্কারের অভাবে তা প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে। এতে এলাকায় জলাবদ্ধতা বেড়েছে। এখন খালের এই উন্মুক্ত অংশটুকুও যদি ভরাট হয়ে যেতে থাকে, তাহলে দুর্ভোগ আরো বাড়বে।’ দেখা যায়, এসব দোকানের বেশির ভাগ বিক্রেতাই নারী। সব মিলিয়ে জায়গাটি রূপ নিয়েছে ছোটখাটো একটি কাঁচাবাজারে। এখান থেকে আরেকটু এগিয়ে খালের পাড়ে আবর্জনা ফেলার আরো চিত্র চোখে পড়ল।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মিল ব্যারাক এলাকার এক বাসিন্দা বলেন, ‘রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী স্থানীয় আওয়ামী লীগের কয়েক ব্যক্তি ধীরে ধীরে খাল ভরাটের কাজ করছেন। একটু একটু করে জায়গা ভরাট হয়, আর সে অংশটুকু ভাড়া দেওয়া হয় দোকান বসানোর জন্য। খালের কিনার দখল করে বাসা নির্মাণ করে বাস করা দেলোয়ার বলেন, এই বাড়ি তিনি ভাড়া নিয়ে থাকেন। বাড়িটি খালের জায়গায় পড়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সামান্য অংশ হয়তো পড়তে পারে। এটা আমি জানি না, মালিক বলতে পারবেন।’ তবে তিনি মালিকের নাম ও মোবাইল নম্বর দিতে রাজি হননি। কয়েকজন দোকান মালিকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাঁরা এই দোকান ভাড়া নিয়েছেন। তবে কার কাছ থেকে ভাড়া নিয়েছেন কিংবা কত টাকা ভাড়া দেন—এসব জানতে চাইলে তিনি বলতে রাজি হননি। টিনের ছাউনি দেওয়া সবুজ মিয়া নামের এক সবজি বিক্রেতা জানান, প্রায় এক বছর ধরে তিনি এখানে দোকান দিয়ে ব্যবসা করছেন। মাঝেমধ্যে সিটি করপোরেশন উচ্ছেদ অভিযান চালালেও এখন টাকা দিলে আর সমস্যা হয় না বলে জানালেন। উল্টো তিনি বলেন, ‘টাকা দিলে কী হয় না, বলেন?’

খাল ভরাট ও দখলের বিষয়টি জানতে চাইলে ৪৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর শহীদ উল্লাহ বলেন, ‘ধোলাইখালের অবশিষ্ট অংশটিতে কিছু স্থানীয় মানুষ তাদের নিত্যদিনের বাড়ির উচ্ছিষ্ট ফেলছে। আমাদের পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা তাদের বারবার সতর্ক করলেও কোনো কাজ হয়নি। আর এর সুযোগ নিচ্ছে কিছু স্থানীয় প্রভাবশালী।’ এটা কারা করছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সমাজে এক ধরনের লোক থাকে, যারা এসব অনাচার করে থাকে।’ স্থানীয় কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতার জড়িত থাকার বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি নিজেই আওয়ামী লীগের কাউন্সিলর, তাই এটা তো সরাসরি বলতে পারি না। তবে কেউই তো ধোয়া তুলসীপাতা নয়। যারা এমন করে, তাদের কোনো দলের লোক বিবেচনায় না নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তা ছাড়া এসটিএসের পেছনের অংশটিতে যেভাবে স্থানীয় লোকজন আবর্জনা ফেলছে, তাতে ধোলাইখাল বন্ধ হতে বেশি সময় লাগবে না। এ জন্য খালের দুই পাশে কাঁটাতারের বেড়া দিলে হয়তো কাজ হতে পারে।’

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী খান মোহাম্মদ বিলাল বলেন, ‘আমাদের অবৈধ দখল উচ্ছেদে অভিযান প্রতিনিয়তই চলে। এটা এ রকম হয় যে আমরা একদিক থেকে উচ্ছেদ করি, আরেক দিক থেকে তারা বসে যায়। তবে খাল ভরাট করে দখলের বিষয়টি আরো ভালো করে খোঁজ নেব। এ ছাড়া এসব ক্ষেত্রে স্থানীয় কাউন্সিলরের ভূমিকাই মুখ্য। এ জন্য আমরা স্থানীয় কাউন্সিলরকে এসব ব্যাপারে উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছি।’

উল্লেখ্য, ঐতিহাসিক এই ধোলাইখাল দোলাই নদী নামে পরিচিত ছিল, যা বালু নদী থেকে শুরু হয়ে ফরিদাবাদের কাছে বুড়িগঙ্গায় পতিত হয়েছে। ১৮৩০ সালে এখানে একটি লোহার পুল নির্মাণ করা হয়, যা লোহার পুল নামে পরিচিত ছিল। ঐতিহাসিক দানীর মতে, ঢাকার প্রথম সুবেদার ইসলাম খাঁ এটি কেটেছিলেন। ধোলাইখাল ঢাকার প্রধান জলপথ হিসেবে ব্যবহৃত হতো।


মন্তব্য