kalerkantho


স্মৃতির শহর

এখন হলো আমিত্বের জয়জয়কার

ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও চেয়ারম্যান
পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ)

৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



এখন হলো আমিত্বের জয়জয়কার

১৯৪৩ সালে সিলেটের মৌলভীবাজারে আমার জন্ম। এমসি কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই। সেটা ছিল ১৯৫৮ সাল। তখন ঢাকা খুব ছোট ছিল। প্রাইভেট কার বেশি ছিল না। কিছু ট্রাক ছিল, আর কিছু বাস চলত। যেগুলোকে আমরা বলতাম মুড়ির টিন। ঢাকা বলতে তখন পুরান ঢাকাকেই বোঝাত। আমি থাকতাম এসএম হলে। নিউ মার্কেট তখনো পুরোদমে চালু হয়নি। বর্তমান বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে তখন উন্নতমানের কিছু দোকান ছিল, আর ছিল কিছু চায়ের দোকান। নাজ নামে একটা সিনেমা হলও ছিল। এলিফ্যান্ট রোডের চার-পাঁচটা বাড়ির মধ্যে গডস গিফট বলে একটা বাড়ির কথা মনে আছে। বর্তমান হাতিরপুল ছিল জঙ্গল। বড় বড় বহু গাছ ছিল। ধানমণ্ডি তো পুরাটাই জঙ্গল তখন। মতিঝিল ছিল ডোবা-নালায় ভর্তি। নতুন ঢাকা এর মধ্যেই ছিল সীমাবদ্ধ। পরিমাণে অল্প হলেও পুরান ঢাকায় ঘোড়ার গাড়ি চলত তখনো। আর ছিল রিকশা। সাপ আর বানরের খেলা দেখানো হতো এখানে-সেখানে। ওষুুধ বিক্রি করার জন্য গান গাইত। লোকজন সেখানে জড়ো হতো। অনেকটা গ্রামীণ চরিত্র ছিল সেই ঢাকার। জীবনযাত্রা ছিল খুব সহজ। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন সময়ে মাসে ৪৫ টাকা বৃত্তি পেতাম। এমএ পড়ার সময় সেটা বেড়ে হয় ৯৫ টাকা। ঢাকা মেডিক্যালের ইমার্জেন্সি হতে এসএম হলে আসতে রিকশা ভাড়া লাগত চার আনা। যারা স্কলারশিপ পেত, বাড়ি থেকে তাদের খরচ বাবদ আর কোনো টাকা আনতে হতো না।

তবে সমস্যা ছিল, স্কলারশিপের টাকাগুলো আসতে তিন থেকে ছয় মাস লাগত।

আমাদের হল প্রভোস্টের অফিসে একটা ফোন ছিল। জরুরি কোনো খবর এলে ছাত্রদের ডেকে দেওয়া হতো। ঢাকা থেকে সিলেট যেতাম ট্রেনে। এখনকার মতো তখন এত বাস ছিল না। ট্রেনে ছিল ফার্স্ট ক্লাস, সেকেন্ড ক্লাস, থার্ড ক্লাস আর ইন্টার ক্লাস। আমরা বন্ধুরা মিলে দল বেঁধে থার্ড ক্লাসে সিলেট যেতাম। যতটুকু মনে পড়ে, এক-দুই টাকার বেশি ভাড়া ছিল না। তখন অবশ্য মানুষের আয়ও কম ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকরা ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা বেতন পেতেন। সচিব পর্যায়ের বেতনও ছিল তেমনি। আয়ের সঙ্গে জীবনযাত্রা ছিল সংগতিপূর্ণ। আর ছিল চমৎকার মূল্যবোধ। আমাদের এমএ ক্লাসে ৬০-৭০ জনের মধ্যে মাত্র তিনজন ছিলেন মেয়ে। তারা ক্লাসের বাইরে এসে দাঁড়াত। শিক্ষকের সঙ্গে ক্লাসে প্রবেশ করত, আবার শিক্ষকের সঙ্গেই বেরিয়ে যেত। হলে বা বিশ্ববিদ্যালয়ে মারামারি বাধলে একে-অপরকে কিল-ঘুষি দিত। বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের শেষ দিকে এসে মারামারিতে হকিস্টিক ব্যবহার করতে দেখেছি। বন্দুক বের করার ভাবনা আসেনি তখনো। নিয়মিত হলের নির্বাচন হতো। শিক্ষা-আন্দোলন শুরু হলে সম্পৃক্ত হতো প্রায় সবাই। তাদের মধ্যে ছিল দেশের চিন্তা। দেশের মানুষের চিন্তা।

মূল্যবোধের এই অবস্থান থেকে বর্তমানে আমরা অনেক অনেক দূরে চলে এসেছি। এখন হলো আমিত্বের জয়জয়কার। ব্যক্তিচিন্তা, গোষ্ঠীচিন্তার জয়জয়কার।

নিউ ইয়র্কের মতো কসমোপলিটন না হলেও ঢাকা মোটামুটি কসমোপলিটন রূপ পেয়েছে। দূতাবাসগুলোর বিদেশি নাগরিক ছাড়াও বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানে বেশ কিছু দেশের লোকজন কাজ করছে। বিশেষ করে ব্যবস্থাপনায় ভারতীয় ও শ্রীলঙ্কান রয়েছে প্রচুর। উন্নয়ন প্রকল্পের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের সংখ্যাও বেড়েছে। ঢাকায় এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় এখন চলাফেরা খুবই কঠিন। ফ্লাইওভার তৈরি করা হচ্ছে। মেট্টো রেলের ব্যবস্থা হচ্ছে। এগুলোর কাজ শেষ হলে সমস্যা হয়তো কিছুটা কমবে। এক হিসাবে দেখা যায়, প্রতিদিন ঢাকায় ২০০ মানুষ থাকতে আসে। এভাবে সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। প্রতি বর্গ কিমিতে ঢাকায় ৪৮ থেকে ৫৫ হাজার মানুষ বাস করে। এটা হলো অপরিকল্পিতভাবে নগর তৈরির খেসারত। অনেক পরিকল্পনা করা হয়। কিন্তু বাস্তবায়ন করা যায় না। রাস্তা বড় করতে গিয়ে অনেক সময় বাড়ি ভাঙতে হয়। বাড়ির মালিক তখন হাইকোর্টে রিট করে কাজ বন্ধ করে দেন। পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা নেই। ঢাকায় যে ২৬টি খাল ছিল, সেগুলোও দখল হয়ে গেছে। পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হচ্ছে না। শহরের একটা বড় অংশ হলো বস্তি। সেখানে নাগরিক সুযোগ-সুবিধাগুলো পৌঁছে না। বস্তির কারণে দূষণ বাড়ছে। মাদকের আখড়া গড়ে উঠছে। আন্তর্জাতিক জরিপে দেখা যায়, বসবাসের অনুপযোগী শহর হিসেবে আমাদের অবস্থান নিচ থেকে দ্বিতীয়!

ঢাকাকেন্দ্রিক জনসংখ্যার চাপ বাড়ার অন্যতম কারণ ঢাকানির্ভরতা। কোনো সিদ্ধান্ত পেতে গেলে ঢাকায় থাকতে হবে, না হয় ঢাকায় আসতে হবে। পার্শ্ববর্তী ভারতেও প্রাদেশিক শহরগুলোতে অনেক প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হয়। কেন্দ্রে আসার প্রয়োজন পড়ে না। বিকেন্দ্রীকরণের কথা আমাদের শিক্ষানীতিতে আছে। কিন্তু প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকের বদলির জন্যও মন্ত্রণালয়ে আসতে হয়। এতে নাগরিক সুযোগ-সুবিধার ওপর ব্যাপক চাপ পড়ে। যে কারণে নগরীতে গ্যাসের সমস্যা হচ্ছে। পানির সমস্যা বাড়ছে। চাহিদা যত বাড়ছে, তত দ্রুত সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে রয়েছে সমন্বয়ের অভাব। মূল্যবোধ কমে যাওয়ায় বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। প্রতিষ্ঠিত হওয়া সত্ত্বেও অনেক সময় ছেলে-মেয়েরা মা-বাবার সঠিক পরিচর্যা করে না। নচিকেতার গাওয়া ‘ছেলে আমার মস্ত মানুষ মস্ত অফিসার, মস্ত ফ্ল্যাটে যায় না দেখা এপারওপার,... ছেলের আমার, আমার প্রতি অগাধ সম্ভ্রম, আমার ঠিকানা তাই বৃদ্ধাশ্রম’ গানটি এ সময়ের এক নির্মম সত্য। আরেকটা সমস্যা সৃষ্টি হয় ছেলে-মেয়েরা বিদেশে স্থায়ীভাবে থেকে গেলে। তখন বয়োবৃদ্ধ মা-বাবাকে দেখাশোনার কেউ থাকে না। মারা যাওয়ার পরও ছেলে-মেয়েদের অনেক সময় আসা হয়ে ওঠে না। একসময় আমাদের অধিকাংশ পরিবার ছিল যৌথ। তখন এ ধরনের সমস্যা ছিল না। এটা বোধ করি উন্নয়নের অনুষঙ্গ। অন্যান্য দেশে এই সেবাটা দেয় সরকার। কিন্তু আমাদের দেশে নীতি-প্রচেষ্টা থাকা সত্ত্বেও সীমাবদ্ধতার কারণে প্রবীণরা এ ধরনের সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

আমাদের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো সরকারের আয়। কর ও ঋণ মিলিয়ে আমাদের দেশে এটা যখন ১৭ শতাংশ, অন্য দেশে তা প্রায় ৫০ শতাংশ। সে দেশগুলোর জন্য তাই সেবা দেওয়া অনেক সহজ হয়। ভারতে রিলায়েন্স গ্রুপের মতো বিভিন্ন বড় প্রতিষ্ঠান জনহিতকর কাজ করছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তৈরি করছে। দক্ষতা সৃষ্টিতে কাজ করছে। গবেষণার জন্য তারা প্রতিষ্ঠান তৈরি করছে। সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও আমাদের এখানে এখনো সেই সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। অবশ্য নারী-পুরুষ সাম্যের দিক থেকে আমরা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে অনেকখানি এগিয়ে আছি। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে সারা বিশ্বেই তাপমাত্রার অত্যধিক তারতম্য লক্ষণীয়। তাপ বেড়ে যাওয়ায় কোথাও আগুন লাগছে, কোথাও তুষারপাত, কোথাও আবার ঘূর্ণিঝড়। জলবায়ু পরিবর্তনের এই অভিঘাত ঢাকাতেও পড়েছে। এই অভিঘাত মোকাবেলায় বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি নেওয়া জরুরি। সম্প্রতি গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ডের অ্যাক্রিডিটেশন পেয়েছে ‘পিকেএসএফ’ ও ‘ইডকল’। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার জন্য এই ফান্ড। এর আওতায় ঢাকা শহরকে সবুজায়ন ও বৃক্ষায়ন করার সুযোগ রয়েছে। জলবায়ু ট্রাস্ট ফান্ডের আওতায়ও এ ধরনের কাজ করা সম্ভব।

গ্রন্থনা : হোসাইন মোহাম্মদ জাকি

 

হলে বা বিশ্ববিদ্যালয়ে মারামারি বাধলে একে-অপরকে কিল-ঘুষি দিত। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শেষ দিকে এসে মারামারিতে হকিস্টিক ব্যবহার করতে দেখেছি। বন্দুক বের করার ভাবনা আসেনি তখনো। নিয়মিত হলের নির্বাচন হতো। শিক্ষা-আন্দোলন শুরু হলে সম্পৃক্ত হতো প্রায় সবাই। তাদের মধ্যে ছিল দেশের চিন্তা। দেশের মানুষের চিন্তা। মূল্যবোধের এই অবস্থান থেকে বর্তমানে আমরা অনেক অনেক দূরে চলে এসেছি


মন্তব্য