kalerkantho


ঢাকার অপরাধ
কারওয়ান বাজার রেললাইন বস্তি

শিশুসন্তান নিয়ে মাদক কারবার করছে নারীরা

এস এম আজাদ   

৩ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



শিশুসন্তান নিয়ে মাদক কারবার করছে নারীরা

কারওয়ান বাজারের রেললাইন-সংলগ্ন বস্তি এলাকায় হরহামেশাই মিলবে এমন মাদক সেবনের দৃশ্য

কারওয়ান বাজার রেলস্টেশন থেকে একটু উত্তরে এগোলেই দেখা মিলবে রেললাইনের দুই পাশে শত শত খুপরিঘর। এই রেললাইন ধরে হাঁটতে গিয়ে শোনা গেল একটি নারীকণ্ঠের ডাক। ছোট্ট একটি খুপরিঘরের ভেতর থেকে এক নারী বলে উঠলেন, ‘মামা, কী লাগব? আছে তো। আসেন, লইয়া যান।’ এরপর আর কথা নেই। দাঁড়াতেই ফাঁক দিয়ে শিশুসন্তান কোলে এক নারীকে আড়ালে সরে যেতে দেখা গেল। জানা গেল না, কী নিতে বলা হচ্ছিল। আরো একটু এগোতেই আরেকটি খুপরিঘর থেকে একই রকম ডাক। তবে এবার প্রস্তাব স্পষ্ট—‘গাঞ্জা লাগব? ১০ ট্যাহার, না ২০ ট্যাহার? ইয়াবা লাগলেও আছে।’ কবুতরের খোপের মুখের মতোই সেই খুপরিঘরের দরজার আড়াল থেকে কথা বলছিলেন এক নারী। দেখা গেল তাঁর কোলেও একটি শিশুসন্তান। ঘরের সামনে খেলছিল চার-পাঁচ বছর বয়সের আরেক শিশু। কোনটা কত—জানতে চাইলে ওই নারী ডালার মতো একটি পাত্র এগিয়ে বলেন, ‘ট্যাহা দেন। কয় ট্যাহার নিবেন, কন।’ পরে নেব—জানাতেই সেই ডালা দ্রুত ভেতরে ঢুকিয়ে ফেলেন।

সমপ্রতি কারওয়ান বাজারের এই এলাকা ঘুরে এমনই অবস্থা দেখা গেছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ট্রেনে আসা গাঁজা ও ইয়াবা বিক্রি করছে এখানকার ২৫ থেকে ৩০টি পরিবার। গাঁজা, ইয়াবা, ফেনসিডিল ও হেরোইন খুচরা বিক্রেতা পুরুষরা ঘুরেফিরে বিক্রি করে। আর নারীরা ঘরের মধ্যেই ডালা সাজিয়ে বিক্রি করে ইয়াবা আর গাঁজা। পরিবারের ছোট ছোট শিশুসন্তানকেও মাদক বিক্রিতে ব্যবহার করে তারা। কারওয়ান বাজারে মাদক সরবরাহ করছে অন্তত ১৫ জন কারবারি। এই বস্তিতে ঘুরলে বলা যায় হরহামেশাই দেখা মিলবে সেবন ও বিক্রির দৃশ্য। ক্রেতাদের বেশির ভাগই পরিবহনের চালক-হেলপার এবং কারওয়ান বাজারের কিছু দোকান মালিক ও কর্মচারী।

স্থানীয় কয়েকজন কালের কণ্ঠকে জানান, মাদক বিক্রেতা পরিবারগুলোতে বেশি সন্তানের জন্ম হচ্ছে। সন্তানদের দিয়ে মাদক ব্যবসা করাচ্ছে তারা। আবার গ্রেপ্তার হলে শিশুসন্তান দেখিয়ে সহানুভূতি নিয়ে সহজেই জামিনে মুক্তি পেয়ে যায়। পার্শ্ববর্তী এলাকার বাসিন্দারা অভিযোগ করছে, পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের নিয়োমিত মাসোহারা দিয়ে মাদক বিক্রি চলছে কারওয়ান বাজারে। মাঝেমধ্যে অভিযান চালানো হলেও আগেই খবর পেয়ে নিয়ন্ত্রকরা সটকে পড়ে। খুচরা বিক্রেতাদের সামান্য কিছু মাদকসহ গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তারা জামিনে ছাড়া পেয়ে আবার একই কাজ করে। এ কারণে কারওয়ান বাজারের মাদক সমস্যা কমলেও দীর্ঘদিনেও সমাধান করা যাচ্ছে না। মাদক কারবারি পরিবারগুলোকে পুনর্বাসন না করা গেলে সমস্যা সমাধান হবে না বলেও মনে করছে স্থানীয়রা। তবে পুলিশ ও ডিএনসির কর্মকর্তারা বলছেন, কারওয়ান বাজারে প্রায়ই অভিযান চালানো হচ্ছে। সেখানে মাদক বাণিজ্য বন্ধে নজরদারি আছে বলেও দাবি করেন তাঁরা।

সরেজমিনে গাঁজা কিনতে যাওয়া দুই যুবকের সঙ্গে কথা হয়। তেজতুরী বাজার এলাকার দুই যুবক নাম-পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অন্তত ২৫টি খুপরিঘরের ভেতরে নারীরা ইয়াবা ও গাঁজা বিক্রি করে। মাদক ব্যবসা করার জন্যই প্রতিটি পরিবার বেশি সন্তান জন্ম দিচ্ছে। পুরুষ সদস্যরা বাইরে কিছু সময় শ্রমজীবীর কাজ করলেও বেশির ভাগ সময় মাদক বিক্রি করে। নারীরা ঘরে থেকেই বিক্রি করে। ঘরের পাশের জায়গায় সেবন করার ব্যবস্থাও করে দেয়।

১৯ নম্বর ঘরে ডালাভর্তি গাঁজা নিয়ে কথা বলছিলেন এক নারী। গাঁজা না নিয়ে নাম জানতে চাইলে তিনি বলতে রাজি হননি। তিনি জানান, আগে গৃহকর্মীর কাজ করতেন। অন্যদের দেখে বেশি লাভের আশায় মাদক ব্যবসা শুরু করেছেন। ‘আমাগো ক্ষতি কইরা আপনার কী লাভ।’

রাসেদুল ইসলাম ও আব্দুল মতিনসহ কারওয়ান বাজারের কয়েকজন দোকানদার বলেন, আশপাশের এলাকা থেকে মাদকসেবীরা রেললাইনে যায়। দূর থেকেও কিছু আসে। যারা নিয়মিত কেনে, তাদের বিক্রেতারা চেনে। অপরিচিত দেখলে ‘আওয়াজ দেয়’। সন্দেহ হলে আর এগোয় না। ট্রেনলাইন ও আশপাশ থেকে আসা মাদক নারীদের দিয়েই বেশি বিক্রি করা হয়।

সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কারওয়ান বাজারের অন্যতম মাদক সরবরাহকারী মাদকসম্রাজ্ঞী খ্যাত জরিনা। কারওয়ান বাজার এলাকায় রয়েছে তার একাধিক সহযোগী। রেললাইন বস্তি এলাকার মাদক ব্যবসায়ীদের মধ্যে যাদের সিন্ডিকেট আছে, তারা হলো—পারভীন, সাহিদা, লীজা, রেশমা, মাহমুদা, নীলা, মিনা, আঙ্গুরী, কাজলী, সুমি, মমতাজ, শুক্কুর আলী, মনু, দুলাল, কৈতরী ও কুট্টি। মাদক বিক্রেতা অন্য পরিবারগুলো তাদেরই সহযোগী।

পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে রেল স্টেশনের পাশে ডিম মার্কেটের এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘মাদক ব্যবসায়ীরা পুরো পরিবেশটাকে খারাপ করে দিচ্ছে। ওদের সন্তানরাও খারাপ পথে যাচ্ছে। অথচ পুলিশ, র‌্যাব এলে নাকি কিছু পায় না। টাকা খেয়ে ঢাকঢোল পিটিয়ে আগেই জানিয়ে দেয়, আমরা আসছি, তোমরা সরো!’

তবে ডিএনসির ঢাকা মেট্রো উপ-অঞ্চলের উপ-পরিচালক মুকুল জ্যোতি চাকমা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কারওয়ান বাজারে আমরা প্রায়ই অভিযান চালাই। অনেককে ধরেছি। তবে বন্ধ করা যাচ্ছে না। সেখানে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।’

ডিএনসি সূত্র জানায়, গত ৩ নভেম্বর সব সংস্থার সমন্বয়ে বিশেষ অভিযান চালানো হয় কারওয়ান বাজারে। তবে কোনো মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করা যায়নি। মিলেছে সামান্য কিছু গাঁজা, হেরোইন ও ইয়াবা। ওই দল একই দিন মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প ও সিদ্দিকবাজারে অভিযান চালিয়ে সাত মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করে। ১৬ নভেম্বর আরেকটি অভিযান চালানো হলেও সাফল্য আসেনি।

ডিএনসির সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ খুরশিদ আলম বলেন, জরিনা, শুক্কুর, পারভীন, মীনা, সাহিদা, কুট্টি, মনু এমন অনেকের বিরুদ্ধে আমরা মামলা দায়ের করে গ্রেপ্তার করেছি। কিন্তু তাদের অনেকেই এখন আদালত থেকে জামিন নিয়ে আবার অপকর্ম করছে।

এদিকে তেজগাঁও থানার ওসি মাজহারুল ইসলাম বলেন, মাদক ব্যবসায়ীদের অপতৎপরতা বন্ধে আমরা সেখানে নজরদারি করি। পোশাক পরিহিত অবস্থায় টহল দিতে পারি না। পোশাক পরে গেলে তারা মাদকদ্রব্য লুকিয়ে ফেলে। এ কারণে গোপনে খোঁজ নিয়েও অভিযান চালানো হয়।



মন্তব্য