kalerkantho


দখলদারদের কবলে দিয়াবাড়ী সড়ক

মো. হারুন অর রশিদ   

৩ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



দখলদারদের কবলে দিয়াবাড়ী সড়ক

দিয়াবাড়ী সড়কের বেশির ভাগ ফুটপাতই অবৈধ দখলদারদের কবলে

‘ফুটপাত দখল, যত্রতত্র অবৈধ বাজার, খাল দখল, মাদক-চাঁদাবাজিসহ নানা অবৈধ কর্মকাণ্ডের রামরাজত্ব যেন ঢাকা শহর। চারদিকে প্রতিনিয়ত যেন দখলের প্রতিযোগিতা চলছে। দেখার কেউ নেই! কোথাও কোথাও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা গ্রহণ করলেও দুই দিন পর একই অবস্থায় ফিরে যায়। প্রশাসন দিব্যি স্থানীয় প্রতিনিধিদের দোহাই দিয়ে ফায়দা লুটছে। আবার স্থানীয় ক্ষমতাসীন দলের নেতারাও প্রশাসনের সঙ্গে হাত মিলিয়ে তাঁদের পকেট ভারী করছেন। চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া আমাদের সাধারণ জনগণের কী করার আছে বলুন?’ এভাবেই প্রশ্ন রাখলেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ১০নং ওয়ার্ডের দিয়াবাড়ী সড়কের দখল পরিস্থিতি সম্পর্কে বলতে গিয় স্থানীয় বাসিন্দা কাঠ ব্যবসায়ী ইসমাইল হোসেন বাদল।

দিয়াবাড়ী সড়কটি মিরপুর ১নং সেকশন থেকে শাহ আলী মাজার সড়ক ও বেড়িবাঁধ হয়ে তুরাগ নদীর পাশ ঘেঁষে আশুলিয়া, উত্তরা, টঙ্গি, গাজীপুরসহ উত্তরবঙ্গের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করেছে। তাই যাতায়াতের জন্য জনবহুল এই সড়কটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সড়কটির প্রবেশমুখ থেকে শুরু করে বেড়িবাঁধ পর্যন্ত সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, সড়কটির ফুটপাতের বেশির ভাগ অংশ দখল হয়ে আছে। যা-ও মাঝেমধ্যে ফুটপাতের চিত্র দেখা মেলে, সেটুকুরও নেই ইট বা টাইলস। ভাঙাচোরা আর এখানে-সেখানে খানখন্দে ভরা ফুটপাত, বৃষ্টি হলেই পরিণত হয় মরণ ফাঁদে।

স্থানীয় বাসিন্দা আলাউদ্দিন মণ্ডল বলেন, ‘এই সড়কের দুই ধারে ফুটপাতসহ সড়কের ১০-২০ ফুট জায়গা দখল করে আছে ফার্নিচার, স মিলের (করাত কল) কাঠ, সাইকেল মেরামতের সরঞ্জাম, ফলের আড়ত। এমনকি ফুটপাতের ওপর স্থায়ীভাবে স্থাপন করা হয়েছে শাহ আলী মাজার প্রকল্পের স্টিল মার্কেট। যে কারণে পথচারীদের সড়কের মাঝখান দিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হয়। তাই কয়েক দিন পর পর এখানে ঘটে দুর্ঘটনা। বলা যায়, ফুটপাতহীন এই অঞ্চলের সড়কে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা প্রতিনিয়ত জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করে।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের সন্তানদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এসব সড়কে চলাচল করতে হয়। আমাদের এই দুরাবস্থা দেখার কেউ নেই। আপনার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানাই।’

প্রাইম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকা স্থানীয় বাসিন্দা শারমিন সুলতানা বলেন, ‘আমাদের প্রাত্যহিক এসব সমস্যা দেখভাল করার মতো কোনো লোক কি আছে? প্রতিনিধিরা তাঁদের আখের গোছাতে ব্যস্ত। স্থানীয় কাউন্সিলরের মতে, ক্ষমতাসীন দলের নেতারা বলুন আর আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীই বলুন সবাই নিজেদের সুবিধা গ্রহণে ব্যস্ত। এসব সমস্যার সমাধান করলে তো তাদের উপরি কামাই বন্ধ হয়ে যাবে। সে জন্য এসব সমস্যা জিইয়ে রাখে তারা। প্রকৃত জনবান্ধব নেতা ও দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের অভাব আমাদের। এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে হলে আমি মনে করি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।’ শফিকুল ইসলাম নামের আরেক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, ‘এই এলাকায় চলে রমরমা মাদক-বাণিজ্য। ফলে আমাদের সন্তানরা ধাবিত হচ্ছে নেশার দিকে। এ ছাড়া এখানে সন্ধ্যার পর রীতিমতো ছিনতাই থেকে শুরু করে সব ধরনের অসামাজিক কাজ চলে খোদ পুলিশের নাকের ডগাতেই। এরা দেখেও না দেখার ভান করে।’

দখলদার নিউ পদ্মা টিম্বার স মিলের মালিক মো. মোতালেবের কাছে অবৈধভাবে ফুটপাত ও সড়কের জায়গা দখল করে কাঠের গুঁড়ি ফেলে রাখার ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি সব সময় কাঠ রাখি না। গাছের চালান এলে তখন জায়গার অভাবে রাখতে হয়। তা ছাড়া এখানে কাঠ রাখার জন্য পুলিশকে প্রতিদিন ২০০ টাকা ও স্থানীয় নেতা মামুনকে ২০০ টাকা করে দিই।’

আরেক দোকানদার মামুন স্টিলের মালিক মামুন মিয়া বলেন, ‘মাজার কমিটি মার্কেট করে ভাড়া দিয়েছে। এখানে দোকান ভাড়া নিয়ে ব্যবসা করছি। আমিও জানি ফুটপাত দখল করে মার্কেট বানিয়ে ভাড়া দিয়েছে। এটা অন্যায়, কিন্তু কী করব!’ দখলদার মাস্টার সাইকেল স্টোরের মালিক আব্দুল বারেকের কাছে ফুটপাত দখল করে দোকানের মালামাল রাখার ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন ‘আমি কি একা রেখেছি! সব দোকানদারই মালামাল ফুটপাতে রাখে। তাদের বলেন না কেন? তারা রাখা বন্ধ করে দিলে আমিও রাখব না। তা ছাড়া পুলিশকে প্রতিদিন ১০০ টাকা করে চাঁদা দিই।’ পুলিশের পক্ষ থেকে কে চাঁদা নেয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘পুলিশের সোর্স জামান এসে নিয়ে যায়, অনেক সময় কর্তব্যরত টহল পুলিশও এসে নিয়ে যায়।’

এ বিষয়ে কর্তব্যরত এসআই নুরুল হক বলেন, ‘আমরা সব সময় দখলের বিরুদ্ধে, যদি ওপর থেকে অর্ডার পাই তখন উচ্ছেদ অভিযান চালাই। কিন্তু দুই দিন যেতে না যেতে তারা আবারও বসে। এলাকার ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের ছত্রচ্ছায়ায় এসব হয়। এসব দোকানির কাছ থেকে তারা মাসোহারা তোলে।’ দোকানিরা তো পুলিশের কথাও বলেছে। পুলিশ তাদের কাছ থেকে ২০০ টাকা করে নিয়মিত চাঁদা নিচ্ছে। এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে আমার জানা নেই। কোনো পুলিশসদস্য এমন ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকলে, যথাযথ প্রমাণের ভিত্তিতে আমরা ব্যবস্থা নেব। তবে এখন পর্যন্ত কারো কাছ থেকে এমন কোনো অভিযোগ পাইনি।’

১০নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর আবু তাহেরের কাছে এলাকার এসব দখলদারি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘দিয়াবাড়ীর সড়কটি আমার ওয়ার্ডের বাইরে। আমি তো অন্য ওয়ার্ডের ব্যাপারে কথা বলতে পারি না।’ কত নম্বর ওয়ার্ডের জানতে চাইলে তিনি ৯নং ওয়ার্ডের কথা বলেন। ৯নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর আবুল হোসেনকে জিজ্ঞাসা করলে তিনিও বলেন, ‘এই সড়কটি তাঁর ওয়ার্ডের নয়। এটি ৮নং ওয়ার্ডের।’ ৮নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর টিপু সুলতানের কাছে জানতে চাইলে তিনিও বলেন, ‘সবাই জানে এটি ১০নং ওয়ার্ডের। কেন ১০নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর এই সড়কটি অস্বীকার করেছে আমার জানা নেই। তবে যে ওয়ার্ডের আওতায়ই হোক না কেন, জনপ্রতিনিধি হিসেবে আমাদের দায়িত্ব ও অঙ্গীকার হলো দখল, সন্ত্রাস ও মাদকমুক্ত এবং পরিবেশবান্ধব একটি সমাজ গড়ার। আর এ লক্ষ্যে সব ওয়ার্ডের কাউন্সিলরের একত্রে কাজ করা উচিত। আমার ওয়ার্ডের না হলেও আমি সরেজমিনে যাব। অবৈধ দখল মুক্ত করে অত্র এলাকার পরিবেশকে একটি সুন্দর পরিচ্ছন্ন বাসযোগ্য ওয়ার্ডের পরিণত করার ক্ষেত্রে আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করব।’



মন্তব্য