kalerkantho


পৌনে চার লাখ মানুষের জন্য একটি পার্ক!

৩ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



পৌনে চার লাখ মানুষের জন্য একটি পার্ক!

সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। প্রবেশাধিকারে সীমাবদ্ধতা থাকায় জনসাধারণের খুব একটা উপকারে আসছে না

একসময়ের তিলোত্তমা নগরী ঢাকায় আজ যেন তিল ধারণের ঠাঁই নেই। ঘিঞ্জি ভবন, পরিবহন ও জনস্রোতের রাজত্ব চারদিকে। দুই দশক আগেও পর্যাপ্ত খেলার মাঠ, উন্মুক্ত স্থান ও পার্ক ছিল, যার বেশির ভাগই আজ বিলীন। ফলে কমেছে নগরবাসীর বিনোদনের পরিসর। যৎসামান্য উন্মুক্ত পরিসরও দিন দিন হারিয়ে যাওয়া এই শহরের বিরাজমান পরিস্থিতি নিয়ে সবিস্তারে লিখেছেন তোফাজ্জল হোসেন রুবেল। ছবি তুলেছেন শেখ হাসান

 

রাজধানী ঢাকায় প্রতিনিয়তই বাড়ছে মানুষের সংখ্যা। সে তুলনায় বাড়ছে না নাগরিক সুযোগ-সুবিধা ও বিনোদনের পরিবেশ। একসময়ের প্রাকৃতিক পরিবেশকে ঘিরে বুড়িগঙ্গার তীরে গড়ে ওঠা শহর ঢাকা এখন ক্রমেই হারাচ্ছে মানুষের বাসযোগ্যতা। প্রায় দুই কোটি মানুষের ভারে ন্যুব্জ রাজধানীতে নেই একটু আনন্দ আর বিনোদনের পরিবেশ। পর্যাপ্ত খোলা স্থানের অভাবে নগরবাসীর নাভিশ্বাস পরিস্থিতি। শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে গিয়েও যেন একটি পরিবেশসম্মত বিনোদনকেন্দ্র পাওয়া যায় না। পুরান ঢাকার তুলনায় শহরের অন্য অংশে উন্মুক্ত স্থান বা পার্ক-উদ্যান একেবারেই কম। আর যেটুকুও রয়েছে সেখানে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ প্রবেশ করতে পারে না। আর অন্যগুলোতে অপরিছন্নতা আর নিরাপত্তাহীনতায় চলাচল করা যায় না। রাজধানী ঢাকার ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অল্পবিস্তর ফাঁকা জায়গায় মূলত মানুষের বিনোদনের চাহিদাও পূরণ করে থাকে। নগরজীবনে একটু বিশুদ্ধ নির্মল বাতাসের স্বাদ নিতে মানুষ ছুটে যায় বিনোদনকেন্দ্রগুলোতে। কিন্তু চাহিদার তুলনায় তা একেবারেই অপ্রতুল। সরকারি উদ্যোগে এখন আর বিনোদনকেন্দ্র গড়ে ওঠে না বললেই চলে। অথচ বিশ্বের প্রায় সব উন্নত শহরে এলাকাভিত্তিক রয়েছে বিনোদনকেন্দ্র। রয়েছে পরিবেশবান্ধব নানা ধরনের বিনোদনের জায়গা। আর এগুলো সম্ভব হয়েছে নগর সরকারব্যবস্থা থাকার ফলে। রাজধানীর সার্বিক দেখভালের দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের হাতে থাকলেও বিভিন্ন দপ্তরের নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে না থাকায় পরিকল্পনামাফিক কাজ  তারাও করতে পারে না। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, উন্নত শহরে করপোরেশনের হাতে নগর পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও ওয়াসার ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব থাকে। এরপর স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে করপোরেশন সব ধরনের কাজ সম্পন্ন করে। ১৯৯০ সালে সিটি করপোরেশন প্রতিষ্ঠার পর এ পর্যন্ত নতুন করে কোনো পার্ক-উদ্যানের পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়নি। ফলে ঘনবসতিপূর্ণ রাজধানী ঢাকা শহর ক্রমেই বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। বড় আকারের উদ্যান ছাড়াও রাজধানীতে সিটি করপোরেশনের হিসাবমতে, পার্ক রয়েছে ৪৭টি আর খেলার মাঠ রয়েছে ১০টি। কিন্তু এগুলো কাগজের সঙ্গে বাস্তবের মিল পাওয়া যায় না। এ হিসাব অনুযায়ী পৌনে চার লাখ মানুষের জন্য একটি পার্ক। আবার এ পার্কগুলোর মধ্যেও ১৭টি বেদখলে।

এ ব্যাপারে নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি ইকবাল হাবিব কালের কণ্ঠকে বলেন, “একটি শহরে সব ধরনের কাজ সঠিকভাবে করতে হলে ‘সিটি গভর্নমেন্ট বা নগর সরকার’ প্রয়োজন। আমরা যদি বিশ্বের উন্নত শহরগুলোর দিকে তাকাই, তাহলে দেখব বিনোদনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে ‘ওয়াটার বডি’ নির্মাণ। কিন্তু যেখানে আমাদের শহরের চারপাশে নদী ও খাল রয়েছে, সেখানে খুব সহজেই এ কাজটি করা যায়। কিন্তু ব্রিটিশ আমল থেকে যে পরিমাণ বিনোদনকেন্দ্র ছিল এখনো তাই রয়ে গেছে। শহরে মানুষের চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিনোদনকেন্দ্র না বাড়িয়ে তা কোনো কোনো ক্ষেত্রে কমানো হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী শহরের নির্দিষ্ট বাসিন্দাদের জন্য জোনভিত্তিক বিনোদনকেন্দ্র থাকা দরকার।”

১৬৬০ সালে মোগল আমলে প্রতিষ্ঠিত রমনা পার্ককে ঢাকার প্রাণ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়ে থাকে। শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত এ পার্ক রাজধানীবাসীর কাছে বিনোদন ও শরীরচর্চার জন্য উত্তম স্থান। কিন্তু এই উদ্যানে তেমন নজরদারি না থাকায় সন্ধ্যার পর নেমে আসে ভীতিকর পরিবেশ। আর ভাসমান যৌনকর্মীদের উৎপাত তো আছেই। পুরান ঢাকার বাহাদুর শাহ বা ভিক্টোরিয়া পার্ক, বলধা গার্ডেন আর নতুন ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, চন্দ্রিমা উদ্যান, বঙ্গভবন পার্ক, ওসমানী উদ্যান,  রয়েছে। দক্ষিণে জাতীয় সংসদ ভবন, পশ্চিমে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন ‘গণভবন’ ও উত্তরে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলনকেন্দ্র, এর মধ্যখানে অবস্থিত চন্দ্রিমা উদ্যান। অযত্ন আর অবহেলায় এ উদ্যানটির এখন বেহাল দশা। অপরিছন্ন অবস্থায় উদ্যানের লেকের পানির দুর্গন্ধে পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা যায় না। সকাল থেকে সন্ধ্যা গড়িয়ে রাতেও থাকে চন্দ্রিমা উদ্যানের লেকের পাড়ে বিনোদনপ্রেমী মানুষের ভিড়। অনেকেই বিভিন্ন দিবসে প্রিয়জনকে নিয়ে বেড়াতে আসেন এখানে। যানবাহনের কালো ধোঁয়ার মধ্যেও এ লেক যেন বিনোদনের অন্যতম স্থান হিসেবে কাজ করে। গত ছয় বছরে বিভিন্ন অজুহাতে শুধু চন্দ্রিমা উদ্যান থেকেই প্রায় এক হাজার গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। আর নতুন কোনো গাছ লাগানোর দৃশ্য চোখে পড়েনি। রাতের বেলায় এ উদ্যান ঘুটঘুটে অন্ধকারে পরিণত হয়। ফ্লাড লাইটগুলো বহু আগেই নষ্ট হয়ে গেছে। চারদিকের ছোট ছোট পার্ক লাইটও চুরি হয়ে গেছে। লেক বরাবর গ্রিলের বেড়া থাকলেও তা চুরি হয়ে গেছে। শুধু প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সঙ্গে পশ্চিম দিক বরাবর নতুন করে ফ্লাড লাইট লাগানো হয়েছে। বাগানের ভেতরে পায়ে হাঁটার রাস্তাগুলো সংস্কারের অভাবে খানাখন্দে পরিণত হয়েছে। উদ্যানের মাঝখানে বড় আকারের একটি পুকুর রয়েছে; কিন্তু এর চারদিক ঝোপঝাড়ে ভরে গেছে। বছরের পর বছর কোনো সংস্কার করা হয় না। ছোট একটি ডোবা থাকলেও তা জঙ্গলে ঢেকে রয়েছে। উদ্যানের উত্তর পাশের গ্রিলের বেড়া বিভিন্ন স্থানে ভেঙে যাতায়াতের রাস্তা তৈরি করা হয়েছে। এর দেয়াল ঘেঁষে তৈরি হয়েছে বেশ কিছু টং দোকান।

রাজধানীর উত্তরার বাসিন্দা সরোয়ার জাহান বলেন, ‘উত্তরা কল্যাণ সমিতির উদ্যোগে প্রায় সব সেক্টরেই একটি করে ছোট পার্ক রাখা হয়েছে। কিন্তু এগুলোতে সবুজের সমারোহ তুলনামূলক কম। আবার শিশুদের খেলাধুলার জন্য তেমন সরঞ্জাম নেই। যেগুলো আছে তা ভাঙাচোরা অবস্থায় পড়ে রয়েছে। ব্যক্তিমালিকানায় প্রতিষ্ঠিত পার্কগুলো সরকারি সহায়তা পেলে  সেগুলো থেকে আরো সেবা পাওয়া যেত।’

শ্যামলী নূরজাহান রোডের বাসিন্দা তুষার আহম্মেদ জানান, ‘পুরো এলাকায় বিনোদনকেন্দ্র বলতে তেমন কিছু নেই। বিকেলে বা সন্ধ্যায় পরিবারের লোকজন নিয়ে একটু বেরিয়ে আসব তেমন স্থান আশপাশে নেই। পার্কগুলোতে রেন্ট-এ-কারের গাড়ি পার্কিং করা থাকে। বিনোদন বলতে যা বোঝায়, আমাদের শহরে তা নেই। কিছু পার্ক আর খালি জায়গা ঘিরেই মানুষ বিনোদনের স্বাদ মেটায়। একটি আদর্শ শহরে পরিকল্পিত বিনোদনকেন্দ্র একান্ত জরুরি।’

এ ব্যাপারে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘শহরে বসবাসরত মানুষের ঘনত্ব বিবেচনা করে বিনোদনকেন্দ্র থাকা উচিত। সে তুলনায় আমাদের বিনোদনকেন্দ্র নেই। যেগুলো আছে তা-ও দক্ষ লোক দিয়ে রক্ষণাবেক্ষণ না করায় তা দিন দিন গুরুত্ব হারাচ্ছে। সিটি করপোরশেনের মধ্যে প্রায় পৌনে দুই কোটি মানুষের শহরের কেমন বিনোদনকেন্দ্র থাকা উচিত তা নিয়েও কোনো পরিকল্পনা করা সম্ভব হয়নি। ফলে সঠিক পরিকল্পনার অভাবে যেটুকু পার্ক, খেলার মাঠ, উদ্যান, উন্মুক্ত স্থান অর্থাৎ বিনোদনকেন্দ্র বলতে যা বোঝায় তা হারিয়ে যাচ্ছে।’

রাজউক চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান বলেন, ‘আমাদের শহরের মানুষের তুলনায় বিনোদনকেন্দ্র কম। পরিকল্পনামাফিক উন্মুক্ত স্থান না পাওয়ায় আমরা নতুন করে উদ্যান বা পার্ক নির্মাণ করতে পারি না। তবে রাজউকের যেসব নতুন শহর করা হচ্ছে সেখানে আধুনিক নগর পরিকল্পনার বিষয়টি মাথায় নিয়ে পর্যাপ্ত পরিমাণে বিনোদনের জন্য ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।’


পর্যাপ্ত নেই, যা আছে তাও রক্ষণাবেক্ষণ হচ্ছে না

অধ্যাপক ড. নজরুল ইসলাম, নগর পরিকল্পনাবিদ

 

আমাদের শহরে মানুষের তুলনায় খেলার মাঠ বা পার্ক একেবারেই অপ্রতুল। যা আছে, তা-ও দিন দিন রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে দখল হয়ে যাচ্ছে। নতুন ঢাকার তুলনায় পুরান ঢাকায় একেবারেরই কম। হাতে গোনা কয়েকটি পার্ক ছাড়া সেখানে উন্মুুক্ত স্থান বা খেলার মাঠ প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই কম। নাজিমুদ্দীন রোডের জেলখানার জায়গাটি কিছুটা সেই চাহিদা পূরণ করতে পারত। কিন্তু সেখানে অনেক স্থাপনা করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। তার পরও এটি ওই এলাকার বাসিন্দাদের কিছুটা স্বস্তি দেবে। ধানমণ্ডি লেক ছিল শুধু ওই এলাকার মানুষের জন্য। কিন্তু এটি এখন পুরো শহরের চাহিদা পূরণ করে। আমরা আগে দেখেছি খেলার মাঠে গরুর হাট বসত। এখন বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়। অনেক মাঠে নিয়মিত মেলাও বসে। অথচ এসব কিছু না করার জন্য উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। আমাদের এ শহরে সবচেয়ে বেশি বিনোদন থেকে বঞ্চিত শিশুরা। তারা বাসাবাড়িতে অনেকটাই আবদ্ধ থাকে। বিনোদন কেন্দ্র ও খেলার মাঠের অভাবে পাঁচ থেকে ১৫ বছরের শিশুরা বাইরে এসে একটু সময় কাটানোর সুযোগ পায় না। মহিলাদের জন্য পৃথক কোনো পার্ক নেই। সার্বিকভাবে আমাদের যে কয়টি পার্ক বা বিনোদন কেন্দ্র রয়েছে তা দেখভালের অভাবে দিন দিন ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে।

 

৪৭টি পার্কের

১৭টি বেদখল

নগর বিনোদনকেন্দ্র নেই বললেই চলে!

জোনভিত্তিক বিনোদনকেন্দ্র না হলে ফল পাওয়া

যাবে না

নদী ও খাল ঘিরে বিনোদনের চাহিদা

মেটানো সম্ভব

 

শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত রমনা পার্কে যথাযথ নজরদারির অভাবে বাড়ছে নিরাপত্তাহীনতা


গত ছয় বছরে বিভিন্ন অজুহাতে শুধু চন্দ্রিমা উদ্যান থেকেই প্রায় এক হাজার গাছ কেটে ফেলা হয়েছে


মন্তব্য