kalerkantho


‘নারীর ক্ষমতায়নের অন্যতম শর্ত অর্থনৈতিক মুক্তি’

সমাজ ও সংসারের নানা প্রতিকূলতা সামলে এখন পুরোদস্তুর ব্যবসায়ী নাসরিন রুমী। দীর্ঘ ১৪ বছরের সংগ্রাম শেষে এখন অনেক উদ্যোক্তারই আইকন তিনি! শুরুটা ছিল শূন্য থেকে, এরপর একাধিক আউটলেট ও একটি কারখানার মালিক তিনি। তাঁর উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার গল্প শোনাচ্ছেন কবীর আলমগীর

৮ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



‘নারীর ক্ষমতায়নের অন্যতম শর্ত অর্থনৈতিক মুক্তি’

মোহাম্মদপুর কেন্দ্রীয় কলেজের বিপরীত পাশে তাজমহল রোডে ঢুকে কয়েকটি বাড়ি এগিয়ে গেলে ডান পাশে চোখে পড়ে ফ্যাশন হাউস ‘লাবণ্য’। কাচের পরিপাটি দেয়ালঘেরা শোরুমে ঢুকতেই চোখে পড়ে মাথার ওপর রঙিন বাতিগুলো নিরলসভাবে আলো বিতরণ করে যাচ্ছে।

দেয়ালে রঙের কারুকাজ। দোকান সাজানো হয়েছে দেশীয় সব উপকরণে। শোরুমে সাজানো শাড়ি-সালোয়ার, গয়না, মাটির কিছু শিল্প। একবার কোনো ক্রেতা দোকানে ঢুকলেই তার বুঝি আর বের হতে ইচ্ছা করবে না। দেখা পাওয়া গেল ফ্যাশন হাউসের উদ্যোক্তা নাসরিনের। প্রথম প্রশ্নটিই ছিল, ‘আপনি কি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শেষের কবিতা উপন্যাসটি পড়েছেন?’ নাসরিনের জবাব, ‘পড়েছি তো। সেখানে অমিত-লাবণ্য নামে দুটি চরিত্র আছে না?’ এবার পাল্টা প্রশ্ন করি, আপনার ফ্যাশন হাউসের নামটা কি শেষের কবিতার নায়িকা লাবণ্যের নামে?

প্রশ্ন শুনে খুশি হলেন নাসরিন, লুকিয়ে থাকা মুচকি হাসিই খুশির প্রমাণ। ফিরে গেলেন নামকরণের গল্পে। জানালেন, নামকরণের পেছনে উপন্যাসের চরিত্র নয় বরং তাঁর স্বামীর দেওয়া নাম এটি।

তিনি বলেন, আমি তখন উদ্যোক্তা হিসেবে একদমই নতুন। বিভিন্ন জায়গায় পোশাক প্রদর্শনী করি। যেখানেই মেলা হতো অংশ নিতাম। যাতে ক্রেতাদের সঙ্গে সরাসরি একটা সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা যায়। প্রথমে নাম দিয়েছিলাম ‘নাসরিন কালেকশন’। পরে স্বামীর প্রেরণায় এটির নাম দিই ‘লাবণ্য’।

নামকরণের গল্প শেষে শুরু করলেন নিজের উদ্যোক্তা হওয়ার গল্প। তিনি বলেন, ‘গ্রাজুয়েশন শেষ করেছি। এরই মধ্যে সংসার হয়েছে, মেয়েও হয়েছে। স্বামী-সন্তান নিয়ে আমার ব্যস্ত দিন কাটে। স্বামী চাকরি করতেন। হঠাৎ তাঁকে চাকরিটা ছেড়ে দিতে হয়। তখন থেকেই বুঝেছি জীবনযুদ্ধটা কী রকম? বুঝেছি জীবন এক সংগ্রামের নাম। সংসারে নানা সমস্যা থাকবে—এটাই স্বাভাবিক। সেসব সমস্যা-সংকট থেকে বুদ্ধি করে উত্তরণের পথ তৈরি করতে না পারলে সংকটের চোরাবালিতে ডুবতে হবে! যা হোক স্বামী ছিলেন সরকারি অফিসার। বসনিয়া মিশনে যান। কিন্তু আর্থিক সচ্ছলতা বলতে যা বোঝায়, নানা কারণে আমাদের আটপৌরে সংসারে তা ছিল না। চিন্তা করলাম উপার্জনের কোনো পথ দরকার। মিশনে থাকাকালে মেয়েকে ভিকারুননিসা নূন স্কুলে আনা-নেওয়ার কাজ আমিই করতাম। মেয়েকে স্কুলে আনা-নেওয়ার ফাঁকে চার অফিসারের স্ত্রী মিলে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের ট্রেনিং নিই। রাতে বাসায় ফিরে হোমওয়ার্ক করতাম। পাশাপাশি কিছু প্রোডাক্ট তৈরি করে নিজের সৃষ্টিশীলতার ক্ষমতা যাচাই করে নিতাম। ’ নাসরিন বলেন, ‘প্রথমে উদ্যোক্তা হিসেবে আমার কাজ ছিল বিভিন্ন মেলায় অংশ নেওয়া। পরপর তিন বছর মেলায় অংশ নিয়েছি। আমি নতুন তাই ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা ছিল আমার লক্ষ্য। এ ছাড়া পোশাক প্রদর্শনী ও ডিজাইন বিষয়ে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছি। আনন্দ ভুবন, আনন্দ আলো, সাপ্তাহিক ২০০০ পত্রিকার প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিলাম। ’

স্মৃতিচারণা করে নাসরিন বলেন, ‘সাপ্তাহিক ২০০০ পত্রিকায় নিজের ডিজাইন করা চারটি পোশাকের ডামি দিয়েছিলাম। সেই চারটি পোশাকই সেরা হয়। প্রতিযোগিতায় জেতার পর উৎসাহ আরো বেড়ে যায়। অন্য দশজন মানুষ যেভাবে প্রস্তুতি নিয়ে ব্যবসা শুরু করে আমার শুরুটা সে ভাবে ছিল না। তবে আমার দায়িত্বটা ছিল নিজের জন্য কিছু করা, সংসারের জন্য কিছু করা। এই বিশ্বাসটা জন্ম নিয়েছিল, একজন নারী সংসার-ঘর সামলানোর পাশাপাশি চাইলে অনেক কিছুই করতে পারে। ’

তবুও নানা কারণে পিছুটান ছিল নাসরিনের। তিনি বলেন, ‘যখন ব্যবসা শুরু করি, অনেকেই নিষেধ করেছে; বলেছে—ঘর সামলাও, সন্তান সামলাও। মেয়েদের ঘরের কাজেই মানায়! একটা মেয়ে সংসারের বলয় থেকে বেরিয়ে এসে স্বাধীনভাবে কিছু একটা করবে, এটি আমাদের সমাজ অনেক সময় ভালো চোখে নেয় না। সমাজের স্রোতের বিপরীতে গিয়ে আমাকে নিজের ব্যবসা দাঁড় করাতে হয়েছে। এই চ্যালেঞ্জটি আমাকে নিতে হয়েছে। সংসারে সন্তান সময় চায়। স্বামী সময় চান। এ ছাড়া আত্মীয়-স্বজন, সামাজিকতা তো আছেই। ততক্ষণ না ওই ব্যবসার কোনো মূল্যায়ন আছে, যতক্ষণ নারী একটা পর্যায়ে পৌঁছে না যাচ্ছে। এতই ব্যস্ত থাকি যে এখনো অনেকেই বলেন সব ছেড়ে দিয়ে যেন সংসারে সময় দিই। তাঁদের প্রতি আমার উত্তর—নারী ঘর-সংসার করবে, প্রয়োজনে ব্যবসাও করবে। আমি যখন শুরু করি আমার হাতে তো কোনো টাকা ছিল না। সংসার খরচ মেটাতে গিয়ে বাড়তি কোনো টাকা জমিয়ে রাখব, সেই বাস্তবতাও ছিল না। মাত্র তিন হাজার টাকায় শুরু করেছিলাম। একান্ত আগ্রহ ছিল বলেই তিন হাজার টাকার পুঁজি আমাকে আজকের এ অবস্থানে নিয়ে এসেছে। আমি মনে করি, নারীর মুক্তির ক্ষেত্র ত্বরান্বিত করতে হবে নারীকেই। নারীর ক্ষমতায়নের অন্যতম শর্ত হচ্ছে অর্থনৈতিক মুক্তি। নারীরা স্বাবলম্বী হলে পরিবার ও সমাজে তাদের প্রভাব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা বাড়ে। ’

তিনি আরো বলেন, ‘২০০৩ সালে নিজের আউটলেট থ্রো করি। আমরা দেশীয় পণ্য নিয়ে কাজ করছি। দেশকে ভালোবেসেই এটা করেছি। পহেলা বৈশাখ, ঈদ—এ রকম মৌসুমে বড় পুঁজির দরকার হয়। এ ছাড়া কর্মচারীদের বেতন তো আছেই। আমরা তো ব্যাংক বা অন্য কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ পাই না। আমার দুটি আউটলেট আছে, আরেকটি ধানমণ্ডিতে। আমার নিজের বাসাতেই ছোট একটি কারখানা আছে। ওখানে আমি প্রোডাক্টের স্যাম্পল তৈরি করে ক্রেতাদের দেখাই। এরপর ক্রেতারা সেই স্যাম্পল দেখে অর্ডার দেন। সব মিলিয়ে আমার অধীনে এখন ১৫ জন কাজ করেন। আমার হাতে কয়েকজন মানুষ জীবিকা অর্জনের সুযোগ পাচ্ছেন। তাঁরা নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সুযোগ পাচ্ছেন, এটাই বা কম কিসে!’

নাসরিন একজন উদ্যোক্তাই নন, একজন ক্রিয়েটিভ ডিজাইনারও। শাড়ি ও থ্রি-পিসের ডিজাইন তিনি নিজেই করেন। ক্রেতাদের চাহিদা অনুসারে তিনি কাপড়ের নকশা করেন। অথচ ডিজাইনে তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক কোনো শিক্ষা নেই। নিজের ডিজাইন সম্পর্কে নাসরিন বলেন, ‘এত দিন কাজ করছি, ডিজাইনগুলো নিজে নিজেই করি। ক্রেতাদের পছন্দ অনুসারে শাড়ি, থ্রি-পিসসহ অন্যান্য পোশাকের ডিজাইন করি। ডিজাইন করার সময় আমাদের দেশীয় মোটিভগুলো ব্যবহার করি। যাতে আমাদের চিরায়ত ঐতিহ্য ও বাঙালি ফ্যাশনের দিকটা পরিষ্কার হয়ে ওঠে। ’ নাসরিন বলেন, ‘যতই দিন যাচ্ছে আত্মবিশ্বাস ক্রমেই বাড়ছে। স্বপ্ন দেখছি আন্তর্জাতিক কোনো পোশাক প্রদর্শনীতে অংশ নেওয়ার। আমি চাই, আমার হাতেগড়া প্রতিষ্ঠানটি মধ্যবিত্তের ফ্যাশন হয়ে উঠুক। ’


মন্তব্য