kalerkantho


দেয়ালে দেয়ালে স্বপ্ন সাজান ফারজানা

ছোটবেলা থেকেই মেধাবী ছাত্র ফারজানা গাজী। পড়াশোনায় ভালো হওয়ায় বাবার স্বপ্ন ছিল মেয়েকে চিকিৎসক বানাবেন। কিছুটা মেয়েরও স্বপ্ন। এদিকে পাঠ্যপুস্তকের বাইরে রং-তুলি নিয়েই মেয়ের যত ব্যস্ততা। আঁকাআঁকি নিয়ে নিজের স্বপ্নরাজ্যে ডুবে থাকা ফারজানা ডাক্তার হওয়ার স্বপ্নকে ছুটি দিয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেন ইন্টেরিয়র ডিজাইনার হিসেবে। তিনি এখন ফারজানাস ব্লিসের স্বত্বাধিকারী। তাঁর ইন্টেরিয়র ডিজাইনার হয়ে ওঠার গল্পটা জানাচ্ছেন মারুফা মিতু

২৫ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০



দেয়ালে দেয়ালে স্বপ্ন সাজান ফারজানা

ছেলে-মেয়ে বড় হয়ে চিকিৎসক নয়তো প্রকৌশলী হবে। মা-বাবার এমন স্বপ্নই থাকে।

সেই অনুযায়ী সন্তানদের তাঁরা পড়াশোনা করিয়ে থাকেন। ব্যতিক্রম ছিলেন না ফারজানা গাজীও। পড়াশোনায় ভালো করার কারণে বাবার স্বপ্ন ছিল, মেয়েকে চিকিৎসক বানাবেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানের স্বপ্ন বাবার মনে। কিছুটা মেয়ের স্বপ্নেও। এদিকে পাঠ্যপুস্তকের বাইরে রং-তুলি নিয়ে মেয়ের ব্যস্ততা। আঁকাআঁকি নিয়ে নিজের স্বপ্নরাজ্যে ডুবে থাকে ছোট্ট শিশু। আমরা যে শিশুটির কথা বলছিলাম, তিনি ফারজানা গাজী। ফারজানাস ব্লিসের স্বত্বাধিকারী।

পড়াশোনায় ভালো হয়েও যে পেশার কোনো পরিচিতি নেই, সেই পেশাই কেন বেছে নেওয়া? কিভাবে প্রথম এই কাজের শুরু? জানতে চাইলে স্মিত হেসে উত্তর দেন—‘পাঠ্য বইয়ের পড়া তো ছিলই। পড়াশোনায় নিয়মিতই ছিলাম। কিন্তু এর পাশাপাশি ছবি আঁকতে বিভিন্ন ধরনের ছোটখাটো সৃষ্টিশীল কাজ করতে ভালো লাগত। এইচএসসি পরীক্ষার পর তাই আমার আত্মীয়-স্বজন কিংবা প্রতিবেশী কারো জন্মদিন-বিয়ে-গায়ে হলুদ ইত্যাদি অনুষ্ঠানের ঘরোয়া সাজের আয়োজন আমি নিজ উদ্যোগেই করে ফেলতাম। তখন আমাদের দেশে ইন্টেরিয়র ডিজাইনিং খুব একটা চালু হয়নি। এটা যে পেশা হিসেবে নেওয়া যায়, সেই বিষয়ে কারো কোনো ভাবনাই ছিল না। কিন্তু আমার শখ ছিল ঘরবাড়ি সুন্দর করে সাজানোর। যেকোনো অনুষ্ঠানে পারিপার্শ্বিক সব কিছু যেন একটা শৈল্পিকভাবে দাঁড়িয়ে যায়। কল্পনার রাজ্যে আমি সব কিছু নতুন করে, সুন্দর করে গুছাই। ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন ছিল নিজেই কিছু করার। যেটি হবে সৃষ্টিশীল। সেখানে স্বাধীন পেশার মাধ্যমে নিজে স্বাবলম্বী হওয়া যাবে, পাশাপাশি অন্যের জন্যও কাজের সুযোগ সৃষ্টি করা যাবে। সেই ভাবনা থেকেই আমি ইন্টেরিয়রের ব্যবসায় এসেছি। নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছি একজন উদ্যোক্তা হিসেবে। ’

ফারজানা গাজী দ্য পিপলস ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ থেকে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ওপর চার বছরের বিএসসি অনার্সে ফার্স্ট ক্লাস থার্ড প্লেস করায় ইউনিভার্সিটি থেকে লেকচারার পদে অফার পেলেন। কিন্তু একটু বোরিং লাগায় তখন আর ইচ্ছা হলো না নিজেকে সেখানে বেঁধে রাখতে। ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মতো কাঠখোট্টা বিষয়ের চেয়ে সৃষ্টিশীল কাজই তাঁকে বেশি টেনেছে। তাই বাইরের একটা প্রতিষ্ঠান থেকে তিনি এক বছরের ডিপ্লোমা শেষ করেন ইন্টেরিয়র ডিজাইনের ওপর। কিন্তু শেখার তো আসলে শেষ নেই। পরবর্তী সময়ে আবার এক বছরের ডিপ্লোমা করেন রেডিয়েন্ট ইনস্টিটিউট অব ডিজাইন থেকে। এরপর কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করে তিনি আলকভের ইন্টেরিয়র ডিজাইনার, সারওয়াত ইন্টেরিয়র অ্যান্ড ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের চিফ কনসালট্যান্ট, রেডিয়েন্ট ইনস্টিটিউট অব ডিজাইনের হেড অব অ্যাডমিন হিসেবে কাজ করেছেন।

আজকের এই অবস্থানে আসার পেছনে নিজের অনুপ্রেরণার জায়গার কথা জানতে চাইলে ফারজানা বলেন, ‘আমার মা অনেক শৌখিন ও শৈল্পিক মনের একজন মানুষ, তাঁকে দেখেই এগিয়ে যাওয়ার শক্তি পেয়েছি। ’ ইন্টেরিয়র ডিজাইনকে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়া প্রসঙ্গে ফারজানা বলেন, ‘আসলে আমাদের দেশে ডিজাইনারদের মূল্যায়ন কম। অথচ বিদেশে একজন ডিজাইনারকে অনেক বেশি সম্মান ও মূল্যায়ন করা হয়। যেহেতু আমাদের দেশের মানুষের কাছে এই পেশা সম্পর্কে তেমন স্বচ্ছ ধারণা নেই, তাই আমার মনে হয়েছে, কাউকে না কাউকে তো নিতে হবে এর দায়িত্ব, তারই প্রচেষ্টা এটা। আমার কাছে ইন্টেরিয়র ডিজাইন পেশাটা যথেষ্ট সম্মানজনক মনে হয় এবং কিছু চ্যালেঞ্জিংও বটে। বর্তমানে আমাদের দেশে এই পেশা বেশ জনপ্রিয়। ইন্টেরিয়র ডিজাইন পেশা শুধু আধুনিক নয়, সময়োপযোগী এবং সম্মানজনকও বটে। দরকার শুধু সময়মতো দিকনির্দেশনা।

প্রথম প্রথম যখন আমি আমার প্রতিষ্ঠানের জন্য কাজ করতাম, মানুষ আমাকে নিয়ে আড়ালে-আবডালে হাসত। এটা কোনো পেশা হলো! শুধু শুধু সময় নষ্ট—তাদের এমনটাই মনে হতো। এই পেশায় আমি খুব সাফল্য অর্জন করতে পারব না কিংবা অনেক অর্থকড়ির মালিক হতে পারব না; কিন্তু আমি মনের দিক থেকে প্রশান্তি পাচ্ছি—এটাই বা কম কী! প্রথম যখন কাজ শুরু করি, তাই আমার পথচলাটা ছিল কিছুটা একলাই। মা-বাবা, কাছের আত্মীয়রা ছাড়া কেউ তেমন ইতিবাচক মূল্যায়ন করত না। কিন্তু দিন দিন আমি নিজে বুঝেছি, বাংলাদেশে এই পেশার প্রসার হচ্ছে। হয়তো আমি তেমন মসৃণ পথে হাঁটতে পারিনি। কিন্তু পরবর্তী সময়ে যাঁরা এই পেশায় আসবেন, তাঁদের জন্য তো পরিবেশটা বৈরী হবে না। আমার এমনটাই ধারণা। ইন্টেরিয়র ডিজাইনিংয়ে নিজেকে নিযুক্ত রেখে একজন সফল ব্যবসায়ী হওয়া যায়, তা আমি নিজেকেসহ অনেককে দিয়ে দেখেছি।

আর নতুন যাঁরা ইন্টেরিয়র ডিজাইনিংয়ে আসছেন, তাঁদের কাজ অনেক ভালো হচ্ছে। তাঁরা শুধু বিদেশি নয়, আমাদের দেশি মেটেরিয়াল ব্যবহার করেও অনেক ভালো ও নান্দনিক কাজ করছেন। নতুনদের ভালো করার জন্য আমার পরামর্শ একটাই—প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি থাকতে হবে আন্তরিকতা, দক্ষতা, সৃজনশীলতা, আগ্রহ, ধৈর্য, মনোযোগ, সর্বোপরি অন্যের পছন্দ বোঝার ক্ষমতা।

আমাদের দেশের বেশির ভাগ নারীই নিজের ইচ্ছাকে ধামাচাপা দিয়ে রাখেন। তাঁদের কোনো শখ থাকলে কিংবা সৃষ্টিশীল কোনো বিষয়ে আগ্রহী হলে তাঁরা সেটি মনের অগোচরেই রেখে দেন। আমার মতে, যাঁদের নানা বিষয়ে সুপ্ত স্বপ্ন রয়েছে মনের কোণে, তাঁরা ইচ্ছা করলেই ঘরে বসে নিজেদের স্বপ্ন পূরণের মধ্য দিয়ে কিছুটা উপার্জনও করতে পারেন। আমি দেখেছি, স্বাবলম্বী হতে অনেক নারী এখন সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে টুকটাক ব্যবসা করে যাচ্ছেন। যা তাঁদের ইচ্ছাশক্তির ইতিবাচক প্রকাশ বলেই আমি মনে করি। ’


মন্তব্য