kalerkantho


পাশে থাকি সন্তানের

ফরিদা আক্তার শেলী   

২৫ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০



পাশে থাকি সন্তানের

মডেল : মুক্তি সরকার, বৃতি, বৈচী, বলয়। ছবি : মঞ্জুরুল আলম

একটি সমাজে যখন কোনো একটি বিশেষ বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়, তখন তা যেন মহামারি আকারে দেখা দেয়। আমরা বর্তমানে আছি ব্লু হোয়েল মহামারিতে! ইন্টারনেটের একটি খেলা এই ব্লু হোয়েল।

নীল তিমি আঁকা আর এর দিকনির্দেশনামতো পথ চলতে চলতে আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে আমাদের কিশোর-কিশোরীরা! ফলে মা-বাবা চিন্তিত, আতঙ্কিত। ব্লু হোয়েল গেমে আসক্ত হয়ে সন্তান আত্মহত্যা করেছে! কিংবা কোনো জঙ্গি হামলায় গিয়ে দেখা গেল কিশোর ছেলেটি মা-বাবার মনের কোণে জায়গা করে নিতে পারেনি। অন্যদিকে ব্যস্ততার রুটিনে সন্তানকে সময় দিতে পারেননি মা-বাবা। ফলে সন্তানের মনের কোণে বন্ধু হওয়ার জায়গা পায়নি মা-বাবা। এভাবেই সন্তান ও মা-বাবার দূরত্বের সম্পর্ক দিনের পর দিন সন্তানকে বিপথগামী হতে সাহায্য করে। সঠিক দিকনির্দেশনার অভাবে ভুল পথে হেঁটে জীবনে ভুল টেনে আনে সন্তানরা।

সমবয়সী ছেলে-মেয়েরা মুহূর্তের মধ্যেই একজন আরেকজনের বন্ধু হতে পারে, কিন্তু একজন মা কিংবা বাবা সন্তানের সঙ্গে এই বন্ধুত্ব চাইলেই চট করে সেভাবে গড়তে পারেন না। কারণ মা-বাবার সঙ্গে যে বন্ধুত্ব তার ধরন স্বভাবতই বন্ধুর সঙ্গে বন্ধুত্বের মতো হবে না এবং কিছু মৌলিক পার্থক্য সেখানে থাকবেই, আর এটাই বাস্তবতা। তাই বলে এমনটিও নয় যে সন্তানের সঙ্গে আপনার বন্ধুত্ব হবে না, বন্ধুত্ব অবশ্যই হবে, তবে তার ধরন, এটি গড়ার প্রক্রিয়া বয়স অনুযায়ী হবে, কিছুটা ভিন্নভাবে ভিন্ন আবহে এবং যার অনেকটাই নির্ভর করবে পরিবেশ-পরিস্থিতির ওপর।

বিশেষ করে বন্ধুত্বের কোনো বয়স নেই বা যেকোনো বয়সেই বন্ধুত্ব গড়া যায়—প্রচলিত এ কথাটি সন্তানের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ার প্রশ্নে অন্তত চলবে না। কারণ সন্তানের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে হবে শৈশব থেকেই।

দেখা যায় কর্মক্ষেত্রের কারণে আপনি সন্তানকে ঘুমন্ত অবস্থায় রেখে যান। এবং হয়তো দেখা যায় রাতে আপনি যখন বাড়ি ফেরেন, ততক্ষণে সন্তান আবার ঘুমিয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতি এক-দুই দিনের নয়, প্রায় সারা জীবনের। এমনকি বেশির ভাগ ছুটির দিনেও আপনি সময় কাটাচ্ছেন অফিশিয়াল মেহমানদের সঙ্গে, পার্টিতে। ফলে মাসের এক-আধটা ছুটিতে, তা-ও অল্প সময়ের জন্য সন্তানের সঙ্গে যে সময়টুকু কাটাচ্ছেন, তাতে সন্তানের কাছে আপনি ক্ষণিকের অতিথির মতো। ফলে এই পরিস্থিতিতে সন্তানের সঙ্গে বন্ধুত্বের কথা না বলে বরং বলা ভালো, সন্তানের সঙ্গে দূরত্ব কমাবেন কিভাবে, সেটা।

সন্তানের সঙ্গে দূরত্ব ঘুচিয়ে একটা মধুর সম্পর্ক করে নিলে সন্তানরা বড় হয় একটা সুন্দর পারিবারিক পরিবেশে। বাসার পরিবেশ যখন সুন্দর হয়, মধুর হয়, তখন সন্তান বাইরের অন্যায় কাজ করা থেকে পিছিয়ে আসে। মনে রাখতে হবে, সন্তানের সঙ্গে বন্ধুত্ব হতে হবে তার শিশু বেলায়ই, অর্থাৎ যত ব্যস্ততাই থাকুক সন্তানের ঘুমাতে যাওয়ার আগেই আপনাকে ঘরে ফিরতে হবে এবং যতটা সম্ভব তার পাশে থাকতে হবে। অনেকেই হয়তো বলবেন, যে শিশু কথা বলতে পারে না, তার পাশে বসে বা সময় কাটিয়ে কী হবে! অবশ্যই হবে। পাশে বসে আপনি তাকে দেখবেন, সে আপনাকে দেখবে এবং তার কৌতূহলী দৃষ্টির সঙ্গে স্নেহ-সোহাগ মাখা কথা বলবেন, ওই সময়ে এটাই বন্ধুত্ব।

কিন্তু বড় হতে হতে বয়সের উত্তাল ঢেউয়ের বিপরীতে বাবা অথবা মায়ের সঙ্গে বন্ধুর এই অটুট-মধুর সম্পর্ক বেশির ভাগই আর অটুট থাকে না, ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। কিন্তু ছিন্ন হতে হতেও যে বন্ধনগুলো অটুট থাকে তার নেপথ্যে রয়েছে মা-বাবার পারিবারিক-পারস্পরিক সম্পর্ক-সম্মান, বিশ্বাস ও ধৈর্য-সহিষ্ণুততা ইত্যাদি। যা সন্তান অনুসরণ করে ও শেখে। বিশেষ করে স্পর্শকাতর বয়সে অতিরিক্ত সতর্কতার সঙ্গে বুঝিয়ে কথা বলা ও শাসন করাসহ নানা বিষয় কাজ করে বন্ধন অটুট রাখার নেপথ্যে। সন্তানের বয়ঃসন্ধিতে পাশে থাকার জন্য যা যা করতে পারেন—

 

গোপন নয় কোনো কিছু

কৈশোরে ছেলে-মেয়েদের শরীরে নানা রকম পরিবর্তন আসে। হরমোনের কারণে তা ঘটে। ছেলেদের কণ্ঠে পরিবর্তন আসে। মেয়েরা গুটিয়ে নেয় নিজেদের। সন্তান বিষয়টি লুকিয়ে রাখে, আর অনেক মা-বাবা বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে সংকোচ করেন। ফলে সন্তান ও মা-বাবার মধ্যে একটা মানসিক দূরত্ব তৈরি হয়। সব সময় সন্তানের প্রাইভেসিতে নাক গলান, অভিভাবকসুলভ আচরণ করলে সে আপনার সঙ্গে মিশতে ভয় পেতে পারে। সন্তানের এমন অনেক বিষয় আছে যা আপত্তিকর, যা হয়তো সে আপনার সঙ্গে শেয়ার করেনি, অথচ আপনি কোনোভাবে জানতে পেরে কিছু না জিজ্ঞেস করেই মারধর বা বকুনি শুরু করলেন, তা হলে তার মধ্যে বিদ্রোহী মনোভাব দেখা দিতে পারে।

 

পুরনো ধ্যান-ধারণা

টিনএজ সন্তান কলেজে ওঠার পর থেকেই বাইরের পরিবেশের সঙ্গে মিশতে শুরু করে। নিজেকে সেভাবেই মানিয়ে নেয়। সে তার আশপাশের পরিবেশ, মানুষ ও বন্ধুর দ্বারা প্রভাবিত হতে শুরু করে। এই প্রভাবটা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বর্তমান সময়োপযোগী। ফলে পুরনো ধ্যান-ধারণা বা সংস্কার ধরে রাখলে টিনএজ সন্তানের সঙ্গে সহজভাবে মিশতে পারবেন না।

 

পারিবারিক সময়

সন্তানের বন্ধু না হলে বাইরে ঘুরতে বা কোনো অনুষ্ঠানে যাওয়া অপছন্দ করবে। রহস্যময় নির্জনতা বয়ঃসন্ধিকালে সন্তানের মনে উঁকি দেয় হাজার রকমের অনুভব। এর মধ্যে একটি যৌনতা। তখন যৌনতাকেন্দ্রিক বিষয়গুলোর সঙ্গে সে জড়িয়ে পড়ে। নাওয়া-খাওয়া, পড়াশোনা ভুলে এই রহস্যময় জগতে ডুবে থাকে। হয়ে পড়ে মাদকাসক্ত। সে খুঁজতে থাকে নির্জনতা। রাত জেগে মোবাইল ফোনে কথা বলে। পরিবার থেকে নিজেকে আলাদা ভাবতে থাকে। এই বয়সে সে একটু লাগামছাড়া চলতে চায়। তাকে এই আচরণ মোকাবেলা করতে শেখাতে হবে। মা-বাবাকে বোঝাতে হবে, তাঁরাই সন্তানের একমাত্র নিরাপদ আশ্রয়।

 

বন্ধু হই সবার আগে

সন্তানের সঙ্গে বন্ধুত্ব তৈরি করতে হবে। আগে দেখতে হবে, সন্তান কার সঙ্গে বেশি মেশে বা কার সঙ্গে সব কিছু শেয়ার করে, সে অনুযায়ী বাবা অথবা মা যেকোনো একজনের উচিত সন্তানের দায়িত্ব নেওয়া। সন্তানকে একটু আর্থিক স্বাধীনতা দিন। প্রতি মাসে একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের পকেটমানি দিন। তবে কোথায় খরচ করল, কী কিনল—এ নিয়ে বেশি প্রশ্ন করবেন না। তবে প্রথমেই বলে দিন, এর বেশি টাকা ও চাইতে পারবে না। অনেক সময় মা-বাবা নিজেদের অজান্তেই সন্তানদের সঙ্গে এমন ব্যবহার করে ফেলেন, যার ফলে তারা অপমানিত বোধ করে। তাই সব সময় ওর আচরণ, পোশাক-আশাক, পড়াশোনা ইত্যাদি নিয়ে নিন্দা না করে মন খুলে প্রশংসা করুন। মা-বাবাকে এগিয়ে আসতে হবে ভালোবাসা নিয়ে।

 

কতটা বলব? কিভাবে বলব?

সন্তানের বয়ঃসন্ধিতে মা-বাবা শারীরবৃত্তীয় বিষয়গুলোর ব্যাপারে একটু লাজুক থাকেন। কত প্রশ্ন দেখা দেয়, শেষে কিছু ঠিক করতে না পেরে বেশির ভাগ মা-বাবাই চুপ থাকেন। ফলে সন্তান বন্ধু-বান্ধবের থেকে না বুঝেই ভুল কিছু একটা শিখে ফেলে বিভ্রান্ত হতে থাকে। এবং জীবনের পদে পদে ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। তাই আগে থেকেই আপনার টিনএজার সন্তানকে চারপাশের বদলে যাওয়া জগতের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ করে দিন।


মন্তব্য