kalerkantho

মুসলিমদের প্রতি বিরল সংহতি নিউজিল্যান্ডে

কোরআন তেলাওয়াতে পার্লামেন্ট অধিবেশন শুরু

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

২০ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মুসলিমদের প্রতি বিরল সংহতি নিউজিল্যান্ডে

নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের বোটানিক গার্ডেনের সামনে নিহতদের স্মরণে ঝোলানো একটি পোস্টার; সহমর্মিতাই যে পোস্টারের মূল বাণী। পুরো নিউজিল্যান্ডই এখন এই এক সুরে গাইছে, ছবি বা কথায় যার অর্থ একটিই—সমবেদনা। গতকাল তোলা ছবি। ছবি : রয়টার্স

একটি হামলা বদলে দিয়েছে নিউজিল্যান্ড রাষ্ট্রের নিরাপত্তাকাঠামো। বদলে গেছে নিউজিল্যান্ড সম্পর্কে মুসলিম অভিবাসীদের মনও। কিন্তু সেই শান্তির নিউজিল্যান্ড ফিরিয়ে আনতে চেষ্টার কমতি নেই নিউজিল্যান্ডের সাধারণ মানুষ ও সরকারের। এর মধ্যে মুসলিম সম্প্রদায়ের মনে সাহস জোগাতে সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে হাকা নৃত্য। ‘আমি তোমাদের ভালোবাসি, তোমাদের জন্য মরি’সহ নানা স্লোগানে স্লোগানে চলছে এই হাকা। গত কয়েক দিনে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে এই ‘হাকা আন্দোলন’। উল্কি আঁকা তরুণ বাইকার থেকে শুরু করে ব্যাবসায়িক নির্বাহী কিংবা শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধরা পর্যন্ত যোগ দিয়েছেন এই হাকায়।

মুসলিমদের প্রতি সংহতি জানাতে গতকাল মঙ্গলবার নিউজিল্যান্ডের পার্লামেন্টে আরো অভূতপূর্ব এক ঘটনা ঘটাল সরকার। গতকাল এক শোকাবহ পরিবেশে একজন ইমামকে দিয়ে কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে পার্লামেন্ট অধিবেশন শুরু করা হয়। হামলার পর এটাই প্রথম অধিবেশন। তরুণ প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আরডর্ন কালো পোশাকে অধিবেশনে আবির্ভূত হন মুসলিমদের সম্বোধন রীতি ‘আসসালামু আলাইকুম’ বলে। পরে পার্লামেন্টে আসা ইমামের সালামের জবাবও দেন তিনি লম্বা আরবি বাক্যে। কোনো দেশে সন্ত্রাসী বা সাম্প্রদায়িক হামলার পর আক্রান্ত সম্প্রদায়ের প্রতিবেশীদের প্রতি এ ধরনের সংহতি প্রকাশ বিরল ঘটনা।

গত শুক্রবার ক্রাইস্টচার্চের আল নুর ও লিনউড মসজিদে হামলায় ৫০ মুসল্লি নিহত হওয়ার পর থেকেই শোকে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে শান্তির দেশ খ্যাত নিউজিল্যান্ড। এর পরের দিন শনিবার আল নুর মসজিদের বাইরে কয়েকজন স্কুলছাত্র তাত্ক্ষণিকভাবে হাকার (ঐতিহ্যবাহী মাওরি রণনৃত্য) মাধ্যমে নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধ জানাতে শুরু করে। ঐতিহ্য অনুযায়ী যুদ্ধক্ষেত্রে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো এবং যুদ্ধজয়ের জন্য সাহস সঞ্চার ও শক্তি প্রদর্শন করতে হাকার প্রচলন মাওরি আদিবাসীদের মধ্যে। ফলে হাকা একটি যুদ্ধনৃত্য হলেও এর মাধ্যমে বিদায়ী আত্মার প্রতি শ্রদ্ধাও জানানো হয়।

সেই দিকটি তুলে ধরে শান্তিময় নিউজিল্যান্ডে ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের জন্য নিহতদের প্রতি শোক ও মুসলিম প্রতিবেশীদের সাহস জোগাতে কলেজছাত্রীদের শনিবারের ওই কর্মসূচিতে মুহূর্তের মধ্যে যোগ দেয় সব বয়সী মানুষ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বদৌলতে এখন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে এই হাকা। এই ছড়িয়ে পড়ার পেছনে ‘ব্ল্যাক পাওয়ার’ নামের একটি সংগঠনের বড় ভূমিকাও রয়েছে। মুসলিমদের প্রতি সংহতি জানিয়ে, সন্ত্রাসের প্রতি ঘৃণা জানিয়ে দৃঢ় সংকল্প ব্যক্ত করা নানা স্লোগানে স্লোগানে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন স্থানের নৃত্যগুলো এখন ঘুরছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। এতে উদ্দীপ্ত হওয়ার কথা ব্যক্ত করেছে অনেক মুসলিমও।

চাকরিজীবী বা বেকার তরুণ, শিশু কিংবা বৃদ্ধ—সবাই যোগ দিচ্ছে চলমান হাকায়। তারা মাওরি ভাষায় চিত্কার করে শুরু করছে এই নৃত্য; যে চিত্কারের শব্দগুলোর সহজ অনুবাদ হলো ‘আমি তোমাদের ভালোবাসি, তোমাদের জন্য মরি।’ মাওরি আদিবাসীদের হাকা নৃত্য আধুনিককালের নিউজিল্যান্ডের রাগবি দলের ‘যুদ্ধের হাঁকডাক’ বলে বৈশ্বিক প্রতীক হিসেবে পরিচিত। কিন্তু সাম্প্রতিককালে এক ভিন্ন মাত্রা পেল হাকা।

সাধারণ জনগণের এই সংহতির মধ্যেই গতকাল নিউজিল্যান্ড সরকার বিরল এক সংহতি প্রকাশ করল। তারা একজন মুসলিম ইমামকে গতকাল পার্লামেন্ট অধিবেশনে আমন্ত্রণ জানায়। তাঁর ‘বিসমিল্লাহ’ বলে কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে গতকাল পার্লামেন্ট অধিবেশন শুরু করা হয়। এ সময় পার্লামেন্ট সদস্যদের প্রতি সালাম জানালে প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আরডর্ন আরবিতে ‘ওয়াআলাইকুম সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ’ বলে প্রতি-উত্তর দেন।

এরপর প্রধানমন্ত্রী পার্লামেন্টে তাঁর ভাষণে বেশ কড়া সুরে বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, হামলাকারী ব্রেন্টন টারেন্টকে আইনের পূর্ণাঙ্গ শক্তির মুখোমুখি হতে হবে। তিনি বলেন, ‘আপনারা আর আমার কাছ থেকে এই হামলাকারীর নাম শুনতে পাবেন না। সে একটি সন্ত্রাসী। সে একটি অপরাধী। সে একটি চরমপন্থী। আমি আপনাদেরও আহ্বান জানাচ্ছি এভাবে তাকে ডাকতে, যে মানুষের নাম ধারণের যোগ্যতা হারিয়েছে।’ সূত্র : এএফপি।

মন্তব্য