kalerkantho

শোকের মধ্যেই সবার মুখে সাহসীদের বীরত্ব

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

১৮ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



শোকের মধ্যেই সবার মুখে সাহসীদের বীরত্ব

আজিজকে (বাঁয়ে) বাহবা দিচ্ছেন স্থানীয় এক ব্যক্তি। ছবি : এএফপি

দুই মসজিদে শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদী অস্ট্রেলিয়ান ব্রেন্টন টারান্টের হত্যাযজ্ঞের পর এখন শোকে স্তব্ধ নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চ শহর। এত এত শোকের মধ্যেও শহরের মানুষের মুখে মুখে ঘুরছে বিয়োগান্তক ওই দিনে কিছু সাহসী মানুষের বীরত্বের গল্প। নিজেদের জীবন তুচ্ছ জ্ঞান করে এ ‘বীরেরা’ সেদিন বাধা দিয়েছেন হামলাকারীকে, বাঁচিয়েছেন অসংখ্য প্রাণ।

আবদুল আজিজের গল্প :

এই বীরদের একজন ৪৮ বছর বয়সী আবদুল আজিজ। চার ছেলেকে নিয়ে লিনউড মসজিদে নামাজ পড়তে গিয়েছিলেন তিনি। একটি ক্রেডিট কার্ড মেশিন নিয়ে বন্দুকধারী ব্রেন্টন টারান্টকে ধাওয়া করেছিলেন আবদুল আজিজ।

পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, আফগানিস্তানে জন্ম নেওয়া আজিজের সেদিনের প্রতিরোধ টারান্টের দ্বিতীয় আক্রমণকে অনেকখানিই খর্ব করেছিল। আবদুল আজিজ জানান, হঠাৎ প্রচণ্ড শব্দ শুনে তিনি মসজিদের বাইরে বের হয়ে আসেন। প্রথমে আতশবাজির শব্দ ভাবলেও সামরিক কায়দায় পোশাক পরা এক সশস্ত্র ব্যক্তিকে দেখে হতভম্ব হয়ে যান। ওই ব্যক্তির উদ্দেশ্য ভালো নয় বোঝার সঙ্গে সঙ্গে কাছে থাকা একটি ক্রেডিট কার্ড মেশিন হাতে তুলে নেন আজিজ এবং সেটি নিয়েই হামলাকারীকে ধাওয়া দেন।

আজিজ বলেন, ‘তার গায়ে ছিল সামরিক পোশাক। আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না, সে ভালো না খারাপ মানুষ। কিন্তু যখন সে আমার দিকে ফিরে অভিশাপ দিচ্ছিল, তখনই আমি বুঝতে পারি যে সে ভালো মানুষ নয়।’

টারান্ট আবদুল আজিজের দিক গুলি ছুড়লে তিনি দুই গাড়ির মাঝখানে মাথা নিচু করে আশ্রয় নেন। এ সময় টারান্ট বন্দুকের গুলি শেষ হয়ে যাওয়ায় তা ফেলে তার গাড়ির কাছে যায় আরেকটি বন্দুক নিতে। আজিজ ফেলে দেওয়ার বন্দুকটি তুলে নেন এবং সেটি নিয়ে বুঝতে পারেন, সেটি শূন্য।

আবদুল আজিজ বলেন, ‘আমি তার দিকে তাকিয়ে চিৎকার করছিলাম। বলছিলাম, এদিকে আসো, এদিকে আসো। আমি চেষ্টা করেছিলাম, তার মনোযোগ যেন আমার দিকে থাকে।’

টারান্ট এরপর মসজিদে ঢুকলে তাকে ধাওয়া করে সেখানে গিয়েও মুখোমুখি হন আজিজ। ‘যখন সে শটগান হাতে আমাকে দেখতে পায়, সে তার বন্দুক ফেলে দিয়ে গাড়ির দিকে দৌড় দেয়। আমিও তাকে ধাওয়া করি। সে তার গাড়িতে বসলে আমি হাতের শটগান তার গাড়ির জানালা বরাবার তীরের মতো ছুড়ে মারি। সে আমাকে শাপশাপান্ত করতে করতে চলে যায়’, বলেন তিনি।

প্রাণ বাঁচাতে তখন মসজিদের ভেতর আশ্রয় নিয়েছিল আজিজের চার সন্তানসহ প্রায় একশ মুসল্লি। হামলাকারীকে ‘কাপুরুষ’ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন,‘ হামলাকারীকে আমি মানুষ বলতেই রাজি নই। কোনো মানুষের পক্ষে এভাবে অন্যকে আঘাত করা সম্ভব নয়।’       

নাঈম রশিদ :

পঞ্চাশোর্ধ্ব নাঈম রশিদ ও তাঁর ২১ বছর বয়সী ছেলে তালহা নিউজিল্যান্ডে বাস করছিলেন ২০১০ সাল থেকে। আল নুর মসজিদে গুলিবিদ্ধ হওয়ার আগে হামলাকারীকে তিনি বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেন, যেটি ভিডিওতে দেখা গেছে। রশিদের এই তৎপরতা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে, তাঁকে সবাই বীর হিসেবে দেখছে। উত্তর পাকিস্তানের শহর অ্যাবোটাবাদে থাকা তাঁর ভাই বিবিসির সংবাদদাতার কাছে বলেন যে তিনি তাঁর ভাইয়ের কাজে গর্বিত। খুরশিদ বলেন, তিনি ছিলেন একজন সাহসী ব্যক্তি। আমি সেখানকার লোকজনের কাছে শুনেছি, সেখানে থাকা প্রত্যক্ষদর্শীদের কয়েকজন বলেছেন যে তিনি সেই হামলাকারীকে থামানোর চেষ্টা করে কয়েকজনের জীবন বাঁচান।’

কিন্তু খুরশিদ এ কথাও বলেন যে যদিও তাঁর ভাইকে অনেকেই বীর হিসেবে দেখছে তার পরও ঘটনাটি তাঁর জন্য খুবই শোকের। তিনি বলেন, ‘এটি আমাদের জন্য গর্বের; কিন্তু সেই সঙ্গে চরম ক্ষতিরও—এটা সত্যি নিজের হাতের আঙুল কেটে ফেলার মতো।’ খুরশিদ বলেন যে এই হামলার ঘটনায় তিনি খুবই খেপে আছেন। ‘সন্ত্রাসীর কোনো ধর্ম নেই,’ তিনি বলেন। সেই সঙ্গে এমন ‘খ্যাপাটে মানুষদের’ প্রতিরোধ করার কথাও দাবিও জানান। সূত্র : বিবিসি, এএফপি।

মন্তব্য