kalerkantho


পাকিস্তানে নির্বাচন

রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ সেনাবাহিনীর পুরনো অভ্যাস

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

২০ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



এবার আগেভাগেই পাকিস্তানের সেনাবাহিনী জানান দিয়েছে যে আগামী ২৫ জুলাই অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে ‘প্রত্যক্ষ ভূমিকা’ রাখার খায়েশ তাদের নেই। ইতিহাস অবশ্য তাদের এই সাধু ভাষণের পক্ষে সাক্ষ্য দিচ্ছে না। পাকিস্তানের অভ্যুত্থান এবং স্বৈরশাসনের যে দীর্ঘ পরম্পরা, তাতে সামরিক-বেসামরিক ক্ষমতায় ভারসাম্য থাকবে কি না, তা নিয়ে অনেকের মধ্যেই তীব্র আশঙ্কা রয়েছে। সেনা শাসনের ছায়া নিয়ে হোঁচট খেতে খেতে চলছে পাকিস্তানের গণতন্ত্র। দেশটির জন্ম থেকে নৈরাজ্য আর সেনা শাসনের সংক্ষিপ্ত বিবরণ নিয়েই এ প্রতিবেদন।

১৯৪৫ সালে ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে পাততাড়ি গোটায় ব্রিটেন। মুসলমানদের জন্য পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তান আত্মপ্রকাশ করে। এর এক বছরের মধ্যেই মৃত্যু হয় পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর। এরপর এক দশকের মধ্যে সাতজন প্রধানমন্ত্রী এসেছেন আর গেছেন। ১৯৫৮ সালে প্রথমবারের মতো পাকিস্তানে সামরিক অভ্যুত্থানের ঘটনা ঘটে। ক্ষমতায় আসেন জেনারেল আইয়ুব খান। তাঁর উত্তরসূরি হিসেবে ১৯৬৯ সালে ক্ষমতা হাতে নেন জেনারেল ইয়াহিয়া খান। ওই বছর থেকেই পাকিস্তানে গণ-অসন্তোষ শুরু হয়। ১৯৭১ সালে পাকিস্তান ভেঙে জন্ম নেয় বাংলাদেশ।

সে বছরই ক্ষমতায় আসেন জুলফিকার আলী ভুট্টো। পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) প্রতিষ্ঠাতা তিনি। ১৯৭৬ সালে তিনি নতুন সেনাপ্রধান হিসেবে জেনারেল জিয়া-উল-হককে নিয়োগ করেন। সম্ভবত তিনি আশা করেছিলেন, জিয়াকে এই পদোন্নতি দেওয়ার মধ্য দিয়ে নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে। তবে তাঁর ধারণা কতটা ভুল ছিল তা স্পষ্ট হয়ে যায় এক বছরের মধ্যেই। পাকিস্তানের ইতিহাসে দ্বিতীয় অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে জিয়া শুধু ভুট্টোকে ক্ষমতাচ্যুত করে জেলেই ঢোকাননি, দুই বছরের মধ্যে তাঁকে ফাঁসিতেও ঝুলিয়ে দিয়েছেন। জিয়ার মৃত্যুও স্বাভাবিকভাবে হয়নি। ১৯৮৮ সালে এক রহস্যময় বিমান দুর্ঘটনায় তিনি নিহত হন।

জিয়ার মৃত্যুর পর ক্ষমতায় আসেন ভুট্টোকন্যা বেনজির। মুসলিমবিশ্বের প্রথম নারী রাষ্ট্রপ্রধান তিনি। দুই বছর ক্ষমতায় থাকার পর দুর্নীতির অভিযোগে চেয়ার ছাড়তে হয় তাঁকে। ক্ষমতায় আসেন পাকিস্তান মুসলিম লীগ-নওয়াজের (পিএমএল-এন) নওয়াজ শরিফ। এই বেসামরিক শাসন ব্যবস্থা চলতে থাকে বেশ কয়েক বছর। এরপর সেনাবাহিনীর ধৈর্যচ্যুতি ঘটে। ১৯৯৯ সালে আবার সেনা অভ্যুত্থান হয় পাকিস্তানে। প্রেসিডেন্ট হয়ে ক্ষমতা দখল করেন জেনারেল পারভেজ মোশাররফ। একই সঙ্গে সেনাপ্রধানের পদটিও তিনি নিজের দখলেই রেখে দেন। ২০০৮ সালে বেনজির ভুট্টো সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হওয়ার পর পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়। নির্বাচনের মাধ্যমে পিপিপি ক্ষমতাসীন হয়। জোট সরকারে ইউসুফ রাজা গিলানি হন প্রধানমন্ত্রী। যদিও মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেননি তিনি। আদালত অবমাননার অভিযোগে তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করা হলে দায়িত্ব নেন রাজা পারভেজ আশরাফ।

২০১৩ সালে পাকিস্তানে প্রথমবারের মতো গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের পালাবদল হয়। তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতায় আসেন নওয়াজ। এ দফায়ও তাঁর সঙ্গে সেনাবাহিনীর দ্বন্দ্ব শুরু হয়ে যায়। চিরশত্রু ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করতে চাইলে সেনাবাহিনীর সঙ্গে তাঁর দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে চলে আসে। ২০১৭ সালে তাঁর বিরুদ্ধে চলমান একটি দুর্নীতির তদন্তের কারণে ক্ষমতাচ্যুত করা হয় নওয়াজকে। রাজনীতিতে আজীবন নিষিদ্ধও করা হয়। পরে দুর্নীতির মামলায় তাঁর ১০ বছরের কারাদণ্ড হয়। এরই মধ্যে তাঁকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। পাকিস্তানের রাজনীতিতে নেতৃত্বের এই শূন্যতার সুযোগটিই সম্ভবত নিতে যাচ্ছেন পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) প্রধান ইমরান খান। নওয়াজের সঙ্গে সেনাবাহিনীর সম্পর্ক যতটা বৈরী বলা হয়ে থাকে ইমরানের সঙ্গে ঠিক ততটাই মধুর। পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে সদ্য ক্ষমতা ছাড়া পিএমএল-এনকে সেনাবাহিনী নীরব অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিয়েছে বলেই দাবি গণমাধ্যম, মানবাধিকারকর্মী ও বিশ্লেষকদের। যদিও সেনাবাহিনী এই দাবি নাকচ করে দিয়েছে। সূত্র : এএফপি।



মন্তব্য