kalerkantho


‘নওয়াজ-মরিয়ম ফিরেছেন রাজনৈতিক প্রয়োজনেই’

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

১৫ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



‘নওয়াজ-মরিয়ম ফিরেছেন রাজনৈতিক প্রয়োজনেই’

নওয়াজ শরিফ ও মরিয়ম শরিফের ছবিটি প্রকাশ করেছে পিএমএল-এন। ছবি : সিএনএন

দেশে ফিরলে প্রথমেই জেলে যেতে হবে, এ ছাড়া অন্য কোনো রাস্তা নেই জেনেও কেন নওয়াজ শরিফ ও তাঁর মেয়ে মরিয়ম নওয়াজ পাকিস্তানে পা রাখলেন? এর জবাবে বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশে ফেরা ছাড়া এ দুজনের আর কোনো রাস্তা ছিল না। আইনিপ্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক জীবন রক্ষার জন্য তাঁদের সামনে শুধু এই একটি পথই খোলা ছিল।

কথিত পানামা পেপারস কেলেঙ্কারির জেরে পাকিস্তান মুসলিম লীগ-নওয়াজের (পিএমএল-এন) সর্বেসর্বা নওয়াজ প্রধানমন্ত্রিত্ব খুইয়েছেন এবং আদালতের আদেশে দেশের রাজনীতি থেকে আজীবন নিষিদ্ধ হয়েছেন। আর সব শেষে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের মালিক হওয়ার দায়ে তাঁকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই অপরাধে তাঁর মেয়ে মরিয়মের সাত বছরের জেল হয়েছে।

কারাদণ্ডের রায় ঘোষণার সময় তাঁরা দুজনই লন্ডনে ছিলেন। চাইলে তাঁরা সেখানে কিংবা অন্য কোনো দেশে রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়ে থেকে যেতে পারতেন। সে সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তাঁরা স্বেচ্ছায় পাকিস্তানে ফিরেছেন এবং নওয়াজ স্পষ্ট জানিয়েছেন, গ্রেপ্তার হওয়া নিয়ে তাঁর কোনো ভয় নেই। দেশের ভাগ্য পরিবর্তন করার লক্ষ্যে তিনি সব কিছু জেনেই দেশে ফিরেছেন।

নওয়াজ ও মরিয়মের দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত প্রসঙ্গে বিশ্লেষক আদনান রসুল বলেন, ‘নওয়াজ ও মরিয়মের জন্য দেশে ফেরার সিদ্ধান্তটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল।’ কারণ ব্যাখ্যায় তিনি জানান, সেনা শাসনামলে ১৯৯৯ সালে নওয়াজ কারাবন্দি হওয়ার পর সুযোগ পাওয়ামাত্র দেশ ছেড়েছিলেন। সেটা তাঁর রাজনৈতিক জীবনে একটা কালো দাগ হয়ে আছে। সেই কালো দাগ মুছে ফেলার জন্য এবার তাঁর দেশে ফেরাটা জরুরি ছিল।

আর মরিয়মের ব্যাপারে এই বিশ্লেষক বলেন, (আততায়ীর হামলায় নিহত) বেনজির ভুট্টোর মতো ব্যক্তিত্ব হিসেবে মরিয়ম তাঁর ক্যারিয়ার গড়ে তুলছেন, বৈধভাবে সেটা তুলে ধরতে চাইলে এটাই তাঁর জন্য শ্রেষ্ঠ সময়।

আর পিএমএল-এনের বর্তমান দলীয় প্রেক্ষাপট সম্পর্কে আদনান মনে করেন, দলটি রাজনীতির বাইরে এসে এখন একটি সামাজিক পরিচিতি গড়ে তুলছে। তা ছাড়া পাকিস্তানের শক্তিশালী সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মতো রাজনৈতিক দল বলতে শুধু পিএমএল-এনই আছে—এমন ভাবমূর্তিও গড়ে উঠেছে। দলের এ ভাবমূর্তি রক্ষার জন্য নওয়াজের দেশে ফেরা জরুরি ছিল।

নওয়াজ-মরিয়মের সিদ্ধান্তের ব্যাপারে বিশ্লেষক আরিফা নূর একবাক্যে বলেন, ‘আমি মনে করি, এটা ছিল রাজনৈতিক প্রয়োজন।’ তাঁর মতে, দেশে না ফিরলে আইন ও রাজনীতি উভয় প্যাঁচে পড়ে যেতেন তাঁরা। নওয়াজ যেহেতু মেয়ে মরিয়মকে উত্তরসূরি করতে চান, সে ক্ষেত্রে দেশের বাইরে থেকে গেলে তাঁদের দুজনকেই সব কিছু হারাতে হতো।

এ ছাড়া বিশ্লেষক জাহিদ হুসেইন বলেন, ‘আমি মনে করি, তাঁর (নওয়াজের) আর কোনো পথ ছিল না। (কারাদণ্ডের রায়ের বিরুদ্ধে) আপিল করার জন্য তাঁর হাতে মাত্র ১০ দিন সময় ছিল। সম্ভবত তিনি আশা করেছেন, আপিল করলে তাঁর সাজা স্থগিত হয়ে যেতে পারে।’ সব বিবেচনায় দেশে ফেরাই তাঁর জন্য ‘সর্বোত্তম রাস্তা’ ছিল—এমন মন্তব্য করেন জাহিদ।

নওয়াজের অসুস্থ স্ত্রী কুলসুম ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে বর্তমানে লন্ডনে চিকিৎসাধীন। কোমায় চলে যাওয়া স্ত্রীকে দেখতে আদালতের অনুমতি সাপেক্ষে মেয়েকে নিয়ে লন্ডনে গিয়েছিলেন এই নেতা। গত বৃহস্পতিবার রাতে তিনি মেয়েকে নিয়ে পাকিস্তানের পথে রওনা হন। গত শুক্রবার লাহোরে স্থানীয় সময় পৌনে ৯টায় আল্লামা ইকবাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামেন তাঁরা। তাঁদের বহনকারী ইতিহাদ এয়ারওয়েজের বিমানটি অবতরণ করার সঙ্গে সঙ্গে কয়েক ডজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা বিমানে উঠে অন্য সব যাত্রীকে নামিয়ে দেন। বিমানের ভেতরেই নওয়াজ ও মরিয়মের পাসপোর্ট জব্দ করা হয়। ইমিগ্রেশনের সব প্রক্রিয়া বিমানের ভেতর শেষ করে সেখান থেকে তাঁদের রাজধানী ইসলামাবাদে নেওয়া হয়। সেখান থেকে বাবা-মেয়েকে আলাদা করে ফেলা হয় এবং রাওয়ালপিণ্ডিতে কেন্দ্রীয় আদিয়ালা কারাগারে নেওয়া হয়। সেখানে ম্যাজিস্ট্রেট ও ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে তাঁদের শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে কারা মেডিক্যাল বোর্ড সিদ্ধান্ত দেয়, কারাগারে স্থানান্তরের মতো উপযুক্ত শারীরিক অবস্থা নওয়াজ ও মরিয়মের আছে। এরপর তাঁদের সিহালা পুলিশ প্রশিক্ষণ কলেজের রেস্টহাউসে স্থানান্তর করা হয়। রেস্টহাউসটিকে উপকারাগার ঘোষণা করে সেখানে তাঁদের রাখা হয়েছে। কারাবন্দি হিসেবে তাঁরা ‘বি’ শ্রেণিভুক্ত হয়েছেন।

দুই বন্দিকে যেন সংশ্লিষ্ট দুর্নীতি মামলায় আদালতে হাজিরা দিতে না হয়, সে জন্য বিচারকের অনুমতি আদায় করেছে পাকিস্তানের দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা জাতীয় জবাবদিহি ব্যুরো (এনএবি)। সংস্থা যুক্তি দেখিয়েছে, দুই বন্দিকে আদালতে হাজির করার ক্ষেত্রে উচ্চমাত্রার নিরাপত্তা ঝুঁকি রয়েছে।

বিশ্লেষকদের অভিমত, কারাদণ্ড মাথায় নিয়ে নওয়াজ ও মরিয়ম আগামী ২৫ জুলাইয়ের নির্বাচনের আগে দেশে ফেরায় পিএমএল-এনের কর্মীরা নতুন করে উজ্জীবিত হয়েছে। এতে একদিকে নওয়াজ যেমন বিরোধী পক্ষের লোকজনের সমালোচনার উচিত জবাব দিতে পেরেছেন, অন্যদিকে দলের ক্ষমতায় ফেরার সম্ভাবনা প্রবল করে তুলেছেন। সূত্র : ডন, টাইমস অব ইন্ডিয়া।

 



মন্তব্য