kalerkantho


আজ সত্যিই ফেরানো গেল না সুরের জাদুকরকে...

সত্যজিৎ কাঞ্জিলাল   

২১ এপ্রিল, ২০১৭ ২১:৪০



আজ সত্যিই ফেরানো গেল না সুরের জাদুকরকে...

'আমায় ডেকোনা… ফেরানো যাবে না… ফেরারী পাখিরা… কুলায় ফেরে না'- আজ থেকে প্রায় ৩৩ বছর আগে এই গান কণ্ঠে তুলে বাংলা গানের জগতে রাজসিক আবির্ভাব ঘটেছিল তাঁর। ১৯৮৪ সালে সারগামের ব্যানারে প্রকাশিত সেই অ্যালবামটির গানগুলো আজও মানুষের মুখে মুখে ফিরে।

'এই নীল মণিহার', 'মামুনিয়া', 'আগে যদি জানতাম' কিংবা 'রীতিনীতি জানি না' গানগুলো কালের পরিক্রমায় বাংলা গানের অমরত্বের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে। আজ সত্যিই ফেরানো গেল না কিংবদন্তি গীতিকার-সুরকার-শিল্পী লাকী আখন্দকে। অসংখ্য মানুষের ভালোবাসা আর চিকিৎসকদের আপ্রাণ চেষ্টা- সব হার মানল নিয়তির অমোঘ বিধান মৃত্যুর কাছে।

বাংলা গানের জগতে লাকী আখন্দের পদচারণার শুরুতে একান্ত সঙ্গী ছিলেন ছোটভাই গুণী শিল্পী তথা গিটার বাদক হ্যাপি আখন্দ। 'আবার এল যে সন্ধ্যা', 'কে বাঁশি বাজায় রে', খোলা আকাশের মতো তোমাকে হৃদয় দিয়েছি, 'নীল নীল শাড়ি পরে' কিংবা 'পাহাড়ি ঝরনা'র মত বিখ্যাত গানগুলো হ্যাপির গাওয়া। দুই ভাইয়ের জনপ্রিয়তা যখন তুঙ্গে তখনই হঠাৎ নেমে আসে অন্ধকার! ১৯৮৭ সালের ২৮ ডিসেম্বর সবাইকে স্তব্ধ করে দিয়ে পরলোকে পাড়ি জমান হ্যাপি। ভাইয়ের এই অকাল মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেননি লাকী আখন্দ। শোকে, দুঃখে সঙ্গীতাঙ্গন থেকে অনেকটাই স্বেচ্ছা নির্বাসনে চলে যান তিনি। চলে যায় এক দশক।

এক দশক অনেক দীর্ঘ সময়। কিন্তু যে শিল্পী জন্মেছেন গানের ভুবনে রাজত্ব করবেন বলে, তাকে কি এত সহজে হারিয়ে যেতে দেওয়া যায়? লাকী আখন্দ অন্তরালে থাকলেও মানুষের মন থেকে হারিয়ে যায়নি তার বিখ্যাত গানগুলো। মানুষের এই ভালোবাসার টানেই আবারও ফিরে আসেন লাকী। ১৯৯৮ সালে গানের সুরে সুরে সবাইকে জানিয়ে দেন ভাই হারানোর শোকে নিজের বিতৃষ্ণার জীবনের কথা। সেদিন ফেরানো গিয়েছিল লাকী আখন্দকে। ঐ বছরের এপ্রিল মাসে প্রথমবারের মত ঢাকায় কনসার্ট করতে এসেছিলেন ওপার বাংলার জনপ্রিয় জীবনমুখী গানের শিল্পী অঞ্জন দত্ত। জাতীয় জাদুঘর মিলনায়তনে লাকী আখন্দের সঙ্গে এক মঞ্চে মাতিয়েছিলেন দর্শক-শ্রোতাদের।

সেদিন দর্শকরা যতটা না মেতেছিল, তার চেয়েও বেশি মেতেছিলেন অঞ্জন দত্ত। তার অভিভূত হওয়ার কারণ ছিলেন লাকী আখন্দ। লাকীকে দেখে নিজের মুগ্ধতার কথা মিডিয়ায় বলেছিলেন অঞ্জন। বলেই ক্ষান্ত হননি, বাংলা গানের কিংবদন্তিকে নিয়ে একটা গানও আছে তার।

দুজনে থাকে দুটো দেশে

দুজনেই গান বেচে খায়

গানে গানে কোন এক মঞ্চে

হঠাৎ দেখা হয়ে যায়

একজন বাজায় গিটার

আরেকজন কীবোর্ড

একজন গান গেয়ে চলে

আরেকজন দেয় সঙ্গ

মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় গান

সেদিনের সেই জলসায়

একাকার হয়ে যায় ঠিকানা

কলকাতা কিংবা ঢাকায়

লাকী আখন্দ ছিলেন সুরের জাদুকর। যেখানেই তিনি হাত দিয়েছেন সেখানেই সোনা ফলেছে। গোলাম মোর্শদের কথায় আর লাকী আখন্দের সুরে নগর বাউল জেমসের কণ্ঠে 'লিখতে পারিনা কোন গান আজ তুমি ছাড়া। কিংবা কুমার বিশ্বজিতের 'যেখানেই সীমান্ত তোমার'; সামিনা চৌধুরীর কণ্ঠে 'কবিতা পড়ার প্রহর এসেছে রাতের নির্জনে' বাংলা গানের জগতে কিংবদন্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে লাকী আখন্দকে। সেই কিংবদন্তিকে আজ আর ফেরানো গেল না। আর কখনও তাকে ফেরানো যাবে না। প্রিয় শিল্পী চলে গেছেন না ফেরার দেশে…।


মন্তব্য