kalerkantho


মনে পড়ে মিনার মাহমুদ

আক্কাস মাহমুদ   

২৮ মার্চ, ২০১৬ ১৮:৪০



মনে পড়ে মিনার মাহমুদ

তারুণ্যদীপ্ত বিবেচনাহীন জীবনযাপনের লাল মোরগের টুঁটির মতো লাল হোন্ডা দাবড়ানো মিনার মাহমুদ। মফস্বল ফরিদপুর থেকে গল্পকার হওয়ার স্বপ্নে আসা ‘মনে পড়ে রুবি রায়’ খ্যাত মিনার মাহমুদ সাপ্তাহিক বিচিত্রায় খোঁচান ক্যান? কিসের বিতর্কিত আমি...? দিয়ে সাংবাদিকতায় নিজের আগমন জানান দিয়েছিলেন মিনার।

১৯৮৭ সালে নিজেই প্রকাশ করেন তারুণ্যের সাপ্তাহিক বিচিন্তা। হাজারো তারুণ্যের মানসিক তৃপ্তি সাপ্তাহিক বিচিন্তার পাঠকপ্রিয়তা দাউ দাউ করে বাড়তেই থাকে। দেশে প্রথাবিরোধী সাহসী সাংবাদিকতার পথিকৃৎ ছিলেন মিনার মাহমুদ।

সবার নিকট সোজা মিনারের নিকট তা বিপরীত। জীবনটা উল্টে-পাল্টে দেখেছেন। বাংলাদেশে সাংবাদিকতার প্রথম সুপারস্টার মিনার মাহমুদ। আন্ডারগ্রাউন্ড অপরাধচক্র, ছাত্রসন্ত্রাস আর চোরাচালান জগতের মুখোশ উন্মোচন করেছিলেন তিনি।

লেখনীতে নির্ভীক মন, আত্মবিশ্বাসী ও রংচটা জিন্সের স্মার্ট সংবাদপত্রের 'মাসুদ রানা' মিনার মাহমুদের বিচিন্তায় প্রবল তারুণ্যে বন্যতা আর আধুনিকতা ছিল। প্রচলিত রাজনীতি আর সমাজব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করা আর নির্মোহভাবে ইতিহাস পূর্ণপাঠ করার দুঃসাহস ছিল মিনার মাহমুদের।

মিনার মাহমুদের বিচিন্তায় তিনটি ইনিংস। রাজকীয় প্রথম ইনিংসটি ছিল কাব্য ও গতিময়। স্বৈরাচার আর রাজাকারের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে জেল-ঝুলুম সহ্য করে দেশে এলো গণতান্ত্রিক (!) সরকার। নতুন বোতলে পুরনো...

শুরু হলো দ্বিতীয় ইনিংস- একের পর এক মামলায় হাজিরা দিতে দিতে ক্লান্ত মিনার। তার ওপর নববধূ তসলিমা নাসরিনের সাথে 'সুখের অসুখ' এ আক্রান্ত মিনার মাহমুদ বিচিন্তার দ্বিতীয় ইনিংস বিরতি দিয়ে দেশ ত্যাগ- আমেরিকার ডিজিটাল কুন্তা-কিন্তে ১৮ বছরের দাসত্বের জীবন শেষ করে ২০০৯ এর এক সন্ধ্যায় প্রিয় জন্মভূমিতে প্রত্যাবর্তন।

এসেই ধাক্কা! সাংবাদিকতা বদলে গেছে। শুরু করলেন বিচিন্তার তৃতীয় ইনিংস। করপোরেট ও বাণিজ্যিক সাংবাদিকতা দেখে মিনার মাহমুদের স্নায়ুচাপ বাড়ে। বিজ্ঞাপনের জন্য সম্পাদককে যেতে হবে এটা ছিল তার কাছে অকল্পনীয়। বিজ্ঞাপন ছাপা হলে ওই কম্পানির বিরুদ্ধে কিছু লেখা যাবে না- এই আপসকামী সাংবাদিকতা মিনার কখনও করেননি। তৃতীয় ইনিংসে সরাসরি বোল্ড।

মিনার মাহমুদের হাতেগড়া সাংবাদিকদের অনেকেই এখন মহাতারকা। কেহ সম্পাদক, কেহ প্রধান নির্বাহী, কেহ হেড অব নিউজ- আহ কী থোকা থোকা পদের বাহার। এদের নিয়ে মিনার মাহমুদের গর্বের শেষ ছিল না। এককালের সহকর্মীদের নিকট মিনার মাহমুদের প্রত্যাশা ছিল একটা চেয়ার টেবিলের। কিন্তু মিনারকে সামলানের ঝুঁকি কে নেবে?

মিনার মাহমুদের বন্ধুদের কেউ কেউ টাকা দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মিনার মাহমুদের টাকার চেয়ে প্রয়োজন বেশি ছিল একটা চেয়ার টেবিলের।

২০১২ সালের ২৯ মার্চ মিনার মাহমুদ নিজেই নিজের জীবনের ইতি টানলেন। কোনোকিছুতেই আপস করেননি কখনো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কী আপস করেই গেলেন নয় কী? আপস মেনে নিলেন?

না ফেরার ঘুমের দেশে ভালো থাকুন মিনার মাহমুদ।

লেখক : সাংবাদিক, আলোকচিত্রি


মন্তব্য