kalerkantho

অবহেলিত মুক্তিসেনা

রাজাকারের নলকূপের পানি বীরাঙ্গনার মুখে!

শামস শামীম, সুনামগঞ্জ    

২৬ মার্চ, ২০১৯ ১২:১৯ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



রাজাকারের নলকূপের পানি বীরাঙ্গনার মুখে!

সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার উজানগাঁও গ্রামে বীরাঙ্গনা পিয়ারা বেগমের খুপরি। (ইনসেটে বাঁ থেকে) পিয়ারা বেগম, তাঁর নির্যাতিতা বোন মহিমা ও খালাতো বোন জাহেরা। ছবি : কালের কণ্ঠ

সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার উজানগাঁও গ্রামের বীরাঙ্গনা পিয়ারা বেগমের (৭২) দুঃখের শেষ নেই। ছোট একটি খুপরি ঘরে স্বামী-সন্তান নিয়ে বসবাস করেন তিনি। অভাবের কারণে ডাক্তার দেখাতেও পারছেন না। সম্প্রতি বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাওয়ার পর চরম আত্মগ্লানিতে ভুগছেন তিনি। তাঁর পরিবারের বিশুদ্ধ পানির চাহিদা মেটাতে হচ্ছে রাজাকারের বাড়ির নলকূপ থেকে। ফলে তাঁকে নিয়ে রাজাকার পরিবারের উপহাস আরো বেড়েছে। এ অপমানে তিনি এখন চুপসে আছেন। বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় বাধ্য হয়েই তাঁকে রাজাকারের বাড়ি থেকে বিশুদ্ধ পানি এনে খেতে হচ্ছে।

এ ব্যাপারে দুঃখ প্রকাশ করে পিয়ারা বেগম বলেন, ‘রাস্তাদি আইট্যা গেলে হ্যারা ছিড়ায় (উপহাস করে)। মুক্তি খইয়া (বলে) খাউরি (গালি) দ্যায়, টিটকারি মারে। বাবা রে, একটা বড় দুঃখ—রাজাকারের বারি তনি টিবলের (নলকূপ) পানি আইন্যা খাইতে অয়।’

পিয়ারা বেগম ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে বাবা-ভাই, চাচা-মামাসহ সাত স্বজনকে হারিয়েছেন। সম্ভ্রম হারিয়েছেন তাঁরা তিন বোন। এই বীরাঙ্গনা ও তাঁর  বোন মহিমাসহ সবাই চরম দুর্ভোগে আছেন।

পিয়ারা বেগমের বাবা শহীদ আফতর আলী ও ভাই মাখন মিয়া ছিলেন মুক্তিযোদ্ধাদের নৌকার মাঝি। এ কারণে ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর ভোরে এই পরিবারের ওপর বিভীষিকা নেমে আসে। পাশের দৌলতপুরের রাজাকার আব্দুল খালেক ও সুলতানপুরের রাজাকার শরাফতের নেতৃত্বে উজানগাঁওয়ের আফতর আলী ও তাঁর স্বজনদের ওপর অতর্কিত আক্রমণ করে রাজাকার বাহিনী। ওই দিন মাঝি মাখন মিয়ার বিয়ে ছিল। স্বজনরা জড়ো হয়েছিল বাড়িতে। এই সুযোগটিই নিয়েছিল রাজাকার খালেক বাহিনী। তারা আফতর আলীসহ এ পরিবারের সাতজনকে হত্যা করে। কিশোরী মহিমা ও খালাতো বোন জাহেরাকে বাড়িতেই শ্লীলতাহানি করে রাজাকারের দল। পরে বড় দুই বোন পিয়ারা বেগম ও মনোয়ারাকে চোখ বেঁধে ক্যাম্পে নিয়ে যায়। এরপর তাঁদের ওপর চালানো হয় অমানুষিক নির্যাতন। দুই দিন পর আলাদা স্থান থেকে তাঁদের উদ্ধার করা হয়। স্বাধীনতার পর অসহায় পরিবারের এই তরুণীদের কেউ বিয়ে করতে রাজি হয়নি। তাই আত্মীয়-স্বজনের মধ্যেই তাঁদের বিয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

মুক্তিযুদ্ধে সম্ভ্রম হারানো বোনদের মধ্যে এখনো বেঁচে আছেন পিয়ারা বেগম, তাঁর বোন মহিমা বেগম ও খালাতো বোন জাহেরা বেগম। মারা গেছেন তাঁদের বড় বোন মনোয়ারা বেগম। মনোয়ারা বেগমের এক ছেলে শেখ ফরিদকে কয়েক বছর আগে নির্মমভাবে খুন করেছে গ্রামেরই এক রাজাকারের সন্তান। এরও প্রত্যাশিত বিচার পাননি তাঁরা।

জানা গেছে, ২০১৫ সালে বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতির জন্য আবেদন করেন পিয়ারা বেগম। এর পর থেকেই দিরাই-শাল্লা উপজেলায় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোকজন তাঁদের খোঁজখবর নিতে শুরু করেন। গত বছরের ১২ নভেম্বর জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের (জামুকা) ৫৯তম সভায় পিয়ারা বেগমসহ এই গ্রামের মুক্তাবান ও জমিলা খাতুনকে বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দেওয়া হয়। একই বছর সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে বীরাঙ্গনা পিয়ারা বেগম ৫০ হাজার টাকা অনুদান পান। এটিই সরকারি প্রথম কোনো সহযোগিতা। পিয়ারা বেগম মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতির আবেদন করার পর থেকেই পাশের রাজাকারের বাড়ি থেকে নলকূপের পানি আনতে গেলে খোঁটা দেওয়া হচ্ছে। বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় সেই অপমান নিয়েই তাঁকে পানি এনে খেতে হচ্ছে।

বীরাঙ্গনা পিয়ারা বেগমের ছেলে শিমুল হাসান মুক্তি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধে আমার মা, খালারা নির্যাতিত হয়েছেন। মামা-নানা শহীদ হয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের সর্বোচ্চ অত্মত্যাগ আমাদের পরিবারের। মা অবশেষে সরকারি স্বীকৃতি পেয়েছেন। এখন আমি গর্ব করে নিজেকে মুক্তিযোদ্ধার সন্তান বলে পরিচয় দিচ্ছি। এটাই আমার বড় পাওয়া।’ তাঁদের পরিবারের অন্য বীরাঙ্গনাদেরও স্বীকৃতিদানের অনুরোধ জানান তিনি।

মন্তব্য