kalerkantho

অবশেষে স্থানান্তর হচ্ছে এমএনএ আব্দুল হকের সমাধিস্থল

ছাতক (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি   

২৫ মার্চ, ২০১৯ ১১:৪৩ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



অবশেষে স্থানান্তর হচ্ছে এমএনএ আব্দুল হকের সমাধিস্থল

দীর্ঘদিন অবহেলায় পড়ে থাকা উত্তর-পূর্ব বাংলাদেশের সুপ্রসিদ্ধ ব্যবসাকেন্দ্র ও শিল্পাঞ্চল ছাতকের অবিসংবাদিত নেতা ও প্রগতিশীল রাজনীতির ক্ষণজন্মা পুরুষ সাবেক এমএনএ, মহান মুক্তিযুদ্ধের ৫ নম্বর সেক্টরের বেসামরিক উপদেষ্টা মরহুম আব্দুল হকের সমাধিস্থল অবশেষে স্থানান্তর হচ্ছে। 

১৯৭১ সালের ১৯ ডিসেম্বর সিলেট-সুনামগঞ্জ রোডে মর্মান্তিক এক সড়ক দুর্ঘটনায় এমএনএ আব্দুল হক চলে যান না ফেরার দেশে। সিলেট সার্কিট হাউজে সংগ্রাম কমিটির সভা থেকে প্রাইভেট কারযোগে সুনামগঞ্জে ফেরার পথে সিলেটের টুকেরবাজার এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় তিনি নিহত হন। এ সময় ছাতক শহরে তাকে সমাধিস্থ করার দাবি ওঠে স্থানীয়ভাবে। ২০ ডিসেম্বর বিশাল জানাজা শেষে ছাতক শহরের কোর্ট পয়েন্ট এলাকায় প্রবাসী কবরস্থানের পাশে তাকে চিরশায়িত করে রাখা হয়। 

দীর্ঘদিন তার সমাধিস্থলটি অযন্তে-অবহেলায় ঝোপ-ঝাড়ে ঢাকা পড়ে ছিল। চতুর্দিকে বাসাবাড়ি, ময়লা-আবর্জনার স্তূপ ও দোকানপাট তৈরি হওয়ায় মানুষের নজরের আড়ালে চলে গিয়েছিল তার কবরস্থানটি।

অবশেষে সুনামগঞ্জ ৫ আসনের সংসদ সদস্য মুহিবুর রহমান মানিকের প্রচেষ্টায় মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত বাঁশতলায় বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ এই সহচরের সমাধিস্থলটি আনুষ্ঠানিক স্থানান্তর করা হবে আগামীকাল ২৬শে মার্চ।

এমএনএ আব্দুল হক ১৯৩০ সালে তৎকালীন সিলেট জেলার সুনামগঞ্জ মহকুমার ছাতক থানাধীন ভাতগাঁও গ্রামের একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা মৌলভী আব্দুল ওয়াহিদ ও মাতা মাহেবুন নেছার অত্যন্ত  স্নেহভাজন ছিলেন তিনি। তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন পরিবারে জ্যেষ্ঠ সন্তান। তার মেজো ভাই মরহুম আবুল হাসনাত আব্দুল হাই ছিলেন স্বাধীনতাপরবর্তী সময়ে ছাতক-দোয়ারা নিয়ে গঠিত সুনামগঞ্জ ৫ আসন থেকে পরপর তিনবার নির্বাচিত সংসদ সদস্য। 

এমএনএ আব্দুল হক ১৯৫১ সালে সুনামগঞ্জ সরকারি জুবিলী হাই স্কুল থেকে মেট্টিক পাস করে উচ্চশিক্ষার জন্য সুনামগঞ্জ কলেজে ভর্তি হন। তিনি আইএ পাস করার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ ও এলএলবি ডিগ্রি লাভ করেন। এ সময় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিম উল্লাহ হলে জিএস নির্বাচিত হন। পরে হাইকোর্টে আইন পেশায়ও নিযুক্ত হন তিনি। 

১৯৬৮ সাল পর্যন্ত ওয়েস্ট এন্ড হাই স্কুলে তিনি কয়েক বছর শিক্ষকতাও করেছেন। সুনামগঞ্জের ছাত্রসমাজকে সংগঠিত করে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে আব্দুল হক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। 

১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের একজন সক্রিয় কর্মী হিসেবে কাজ করেছেন। ১৯৫৫ সালে তিনি গ্রেপ্তার হন এবং দীর্ঘ ১৩ মাস কারাভোগ করেন। রাজপথের অগ্রসৈনিক আব্দুল হক ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে বৃহত্তর ছাতক (ছাতক-দোয়ারাবাজার-কোম্পানীগঞ্জ) ও জগন্নাথপুর থানা নিয়ে গঠিত পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ আসনে এমএনএ নির্বাচিত হন। 

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আস্থাভাজন হিসেবে ১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে ৫ নম্বর সেক্টরের বেসামরিক উপদেষ্টা ও ছাতক-জগন্নাথপুর-দিরাই এর প্রধান সমন্বয়কারীর দায়িত্ব পালন করেন আব্দুল হক। 

মরহুম এমএন এ আব্দুল হককে স্মরণীয় করে রাখতে ১৯৭২ সালে ছাতকের গোবিন্দগঞ্জে প্রতিষ্ঠা করা হয় আব্দুল হক স্মৃতি ডিগ্রি কলেজ। ৭২ পরবর্তী ২৫ বছর ছাতকের এ মহান নেতার নামে উল্লেখযোগ্য কিছু করতে দেখা যায়নি। দীর্ঘ ২৫ বছর ছাতকের কিংবদন্তি পুরুষ আব্দুল হক এবং মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অবদানকে রাখা হয়েছে প্রচারবিমুখ। 

১৯৯৬ পরবর্তী সময়ে আওয়ামী সরকারের আমলে মুহিবুর রহমান মানিক এমপি মুক্তিযুদ্ধের ৫ নম্বর সেক্টর হেড কোয়ার্টার বাঁশতলায় প্রতিষ্ঠা করেন এমএনএ আব্দুল হকের নামে হকনগর ও স্মৃতিসৌধ। ও জাউয়া বাজার ডিগ্রি কলেজে আব্দুল হক স্মৃতি ভবন নির্মাণ করেন। বর্তমানে বাঁশতলা-হকনগর একটি পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এই পর্যটনকেন্দ্রেই তার সমাধিস্থল স্থানান্তর হওয়ায় দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আগত পর্যটকরা তার বীরত্বগাথা ইতিহাস জানতে পারবেন বলে স্থানীয়দের ধারণা।

মন্তব্য