kalerkantho


৮ হাজার টাকা করে না দিলে বসবে না বিদ্যুতের খুঁটি!

কুদ্দুস বিশ্বাস, কুড়িগ্রাম (আঞ্চলিক)   

২২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ১৭:১৬



৮ হাজার টাকা করে না দিলে বসবে না বিদ্যুতের খুঁটি!

বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ১০টি বিশেষ উদ্যোগের মধ্যে ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেয়া অন্যতম। এ কর্মসূচির আওতায় কুড়িগ্রামের রৌমারী ও রাজীবপুর উপজেলা শতভাগ বিদ্যুৎ সংযোগ আটকে আছে ঠিকাদারদের কারণে। বিদ্যুৎ সংযোগ লাইন নির্মাণে কয়েকটি এলাকায় দেড় বছর আগে কার্যাদেশ প্রদান করা হলেও ঠিকাদারের গাফিলতি ও স্বেচ্ছাচারিতার কারণে এখন পর্যন্ত কাজ শুরু করা হয়নি। 

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, রৌমারী উপজেলার বাইটকামারী, তিনতলি, ধনারচর টাঙ্গারী পাড়া, লালকুড়া, বিকরিবিল এবং রাজীবপুর উপজেলার শিবেরডাঙ্গী গ্রামে নতুন লাইন নির্মাণ বা খুঁটি স্থাপনে দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকাদাররা তালবাহানা শুরু করেছে। ওইসব গ্রামে নতুন লাইন নির্মাণের জন্য ২০১৭ সালের জুন মাসে কাজ শুরু করার কার্যাদেশ দেয়া হলেও ঠিকাদাররা গত দেড় বছরেও কাজ শুরু করেননি। নতুন সংযোগের আওতায় গ্রাহকরা অভিযোগ করেন, খুঁটিপ্রতি ঠিকাদারদের ৮ হাজার টাকা ঘুষ না দেয়ার কারণে কাজ শুরু করা হচ্ছে না। 

জামালপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি সূত্রে জানা গেছে, কুড়িগ্রামের রৌমারী ও রাজীবপুরে জামালপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতায় নতুন সংযোগ লাইন নির্মাণ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে পল্লী বিদ্যুতের উপদেষ্টা প্রতিষ্ঠান টিসিএল (টেকনিক্যাল সার্ভিস লিমিটেড)। 

টিএসএল সূত্রে জানা গেছে, রৌমারী উপজেলার বাইটকামারী ও তিনতলি গ্রামে প্রায় ৪ কিলোমিটার বিদ্যুৎ সংযোগ লাইনের ৮৮ খুঁটি স্থাপনের দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে দায়িত্ব দেয়া হয় মোফাজ্জল হোসেন নামের ঠিকাদারকে। কাজ শুরু করার জন্য গত ২০১৭ সালের ১৭ জুন কার্যাদেশ (ওয়ার্ক অর্ডার) প্রদান করা হয়। 
এছাড়াও উপজেলার ধনারচর টাঙ্গারী পাড়া গ্রামে দুই কিলোমিটার লাইন নির্মাণের জন্য আব্দুর রাশেদ ও লালকুড়া গ্রামে আড়াই কিলোমিটার লাইন নির্মাণে ছানোয়ার হোসেন নামের ঠিকাদারকে দায়িত্ব দেয়া হয়। অপরদিকে ওই একই ঠিকাদারকে রাজীবপুর উপজেলার শিবেরডাঙ্গী গ্রামে পৌনে এক কিলোমিটার লাইনের ১৫ খুঁটি স্থাপনের দায়িত্ব দেয়া হয়। ওই কাজের কার্যাদেশ প্রদান করা দেয়া হয় ২০১৭ সালের ২৩ অক্টোবর তারিখে।
 
দীর্ঘ দেড় বছরেও ঠিকাদাররা বিদ্যুতের লাইন নির্মাণের কাজ শুরু করছেন না কেন?- এমন তথ্য জানতে অনুসন্ধান চালানো হয়। এতে গ্রাহকদের কাছ থেকে খুঁটি প্রতি ৮ হাজার টাকা করে দাবি করছে দায়িত্ব পাওয়া ঠিকাদার। খুঁটিপ্রতি ৮ হাজার করে টাকা নেয়া হলে বাইটকমারী ও তিনতলি গ্রামে ৮৮ খুঁটির জন্য আড়াই শ গ্রাহককে প্রায় ৭ লাখ টাকা দিতে হচ্ছে ঠিকাদারকে। ওই টাকা না দেয়ার কারণেই ঠিকাদার কাজ শুরু করছেন না। 

বাইটকামরী গ্রামের বাসিন্দা সাজু আহমেদ বলেন, ‘ঠিকাদার লোক পাঠিয়েছিল আমাদের গ্রামে। এতে খুঁটি প্রতি ৮ হাজার টাকা করে চাইছে। খুঁটির ওই টাকা পরিশোধ হওয়ার পর কাজ শুরু করা হবে বলে ঠিকাদারের লোক জানিয়ে দিয়েছে। আমরা বলে দিয়েছি অবৈধ ওই টাকা আমরা দিতে পারবো না।’ 
জাহিদুল ইসলাম নামের এক গ্রাহক বলেন, ‘তিনতলি গ্রামের মানুষ ১৯টি খুঁটির জন্য গ্রাহকের কাছ থেকে দুই লাখ টাকা তুলে ওই ঠিকাদারের হাতে দিয়েছি। এরপর তিনতলি গ্রামের লাইন নির্মাণের জন্য খুঁটি আনা হয়।’ একই অভিযোগ রাজীবপুর উপজেলার শিবেরডাঙ্গী গ্রামের গ্রাহকদেরও।

একই তারিখে কার্যাদেশ প্রদান করা হলেও উপজেলার লালকুড়া গ্রামে আড়াই কিলোমিটার বিদ্যুতের নতুন সংযোগ লাইন নির্মাণের ঠিকাদার ছানোয়ার হোসেন, ধনারচর টাঙ্গারী পাড়া গ্রামে লাইন নির্মাণের ঠিকাদার আব্দুর রাশেদ কাজ শুরু না করে বসে আছেন। এরাও খুঁটিপ্রতি ৮ হাজার টাকা করে ঘুষ চাইছেন। 

রৌমারী উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আব্দুল কাদের অভিযোগ করে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী মানুষকে খুঁজে খুঁজে বিদ্যুৎ সংযোগের নির্দেশ দিয়েছেন। সেখানে নতুন সংযোগের লাইন নির্মাণে ঠিকাদাররা প্রকাশে ঘুষ দাবি করছে।’ 

অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকাদার মোফাজ্জল হোসেন বলেন, ‘খুঁটি প্রতি ৮ হাজার টাকা করে ঘুষ চাওয়া হয়নি। লাইন নির্মাণের শ্রমিকদের থাকা খাওয়ার খরচটা চাওয়া হয়েছে।’ একই ধরনের কথা বলেন ঠিকাদার ছানোয়ার হোসেন ও আব্দুর রাশেদ নামের ঠিকাদার। এরা উল্টা অভিযোগ করেন, টিসিএল’র নির্বাহী প্রকৌশলী আমাদের কাছ থেকে ঘুষ নেন লাইন নির্মাণের খুঁটিসহ যাবতীয় সরঞ্জাম সরবরাহ করতে।’

এসব প্রসঙ্গে জানতে চাইলে নতুন সংযোগের লাইন নির্মাণ বাস্তবায়নকারি সংস্থা টিসিএল জামালপুর নির্বাহী প্রকৌশলী শেখ আহমেদ তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘ঠিকাদারদের বার বার তাগাদা দেয়া হচ্ছে। কিন্তু তারা কথা শুনছেন না।’ 



মন্তব্য