চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলায় পুকুর সংস্কারের অনুমতিকে 'ঢাল' হিসেবে ব্যবহার করে প্রকাশ্যে চলছে মাটি বিক্রির মহোৎসব। দিন-রাত সমানতালে স্ক্যাভেটর দিয়ে কাটা হচ্ছে পুকুর, ফসলি জমি ও টিলা। প্রশাসনের শর্ত মানা তো দূরের কথা, অনেক ক্ষেত্রে অনুমতি ছাড়াই চলছে মাটি উত্তোলন। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষিজমি, নষ্ট হচ্ছে সরকারি সড়ক-মহাসড়ক আর স্থানীয়দের মধ্যে বাড়ছে উদ্বেগ ও আতঙ্ক।
স্থানীয়দের অভিযোগ, উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে গড়ে উঠেছে শক্তিশালী 'মাটি খেকো সিন্ডিকেট'। তারা রাজনৈতিক প্রভাব, অর্থবল ও স্থানীয় কিছু অসাধু ব্যক্তির সহযোগিতায় দীর্ঘদিন ধরে অবাধে মাটি কেটে বিক্রি করছে। বিষয়টি এখন এলাকাবাসীর কাছে ওপেন সিক্রেট হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, উপজেলার ধলঘাট, কেলিশহর, হাইদগাঁও, মোজাফরাবাদ, শোভনদন্ডী, খরনা, বড়লিয়া, আশিয়া ও কাশিয়াইশ ইউনিয়নে একযোগে চলছে মাটি কাটার উৎসব। বিশেষ করে পটিয়া সীমান্তের ধলঘাট এলাকার প্রভা স্টোরের পশ্চিম পাশে বীরকন্যা প্রীতিলতা সড়ক ঘেঁষা একটি বড় পুকুরে সংষ্কারের আড়াঁলে ব্যাপকভাবে মাটি বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। প্রতিদিন শত শত ট্রিপ মাটি বহনকারী পিকআপ ও ডাম্পার চলাচলের কারণে গুরুত্বপূর্ণ প্রীতিলতা সড়কের বিভিন্ন অংশ ভেঙে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. জসিম উদ্দিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘দিনে তো মাটি কাটছেই, এখন রাতেও ঘুমানো যায় না। ভারী গাড়ির শব্দে শিশু ও বৃদ্ধরা অতিষ্ঠ। রাস্তাদর অবস্থা এত খারাপ হয়েছে যে চলাচল করাই কষ্টকর।’
আরেক বাসিন্দা তৃষ্ণা দাশ বলেন, ‘ফসলি জমি কেটে শেষ করে ফেলছে। কেউ প্রতিবাদ করলে নানা ধরনের চাপ আসে। আমরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি।’
এদিকে, মাটি কাটা কেন্দ্র করে গত ১১ মে বড়লিয়া ইউনিয়নে যুবদলের দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। এ ঘটনায় চারজনের বিরুদ্ধে মামলাও হয়েছে বলে জানা গেছে।
স্থানীয়রা জানান, মাটি ব্যবসাকে কেন্দ্র করে এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতা দিন দিন বাড়ছে। যে কোন দিন, যে কোন সময় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আশংকা রয়েছে।
অপরদিকে, পরিবেশ সচেতন মহল মনে করছেন এভাবে অপরিকল্পিতভাবে মাটি কাটার ফলে কৃষি উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি পরিবেশগত ভারসাম্যও হুমকির মুখে পড়ছে। আইন অনুযায়ী অনুমতি ছাড়া মাটি উত্তোলন ও বিক্রি সম্পূর্ণ অবৈধ। এ ক্ষেত্রে বালু মহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন-২০১০ এবং ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন-২০১৩ প্রযোজ্য। কৃষিজমি বা পরিবেশের ক্ষতি করে মাটি বিক্রি করলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে।
এ বিষয়ে কেলিশহর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের ভূমি সহকারী কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাখাওয়াৎ হোসেন বলেন, ‘পুকুর সংস্কারের জন্য শর্তসাপেক্ষে অনুমতি নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই শর্ত ভঙ্গ করে মাটি বিক্রির সত্যতা পাওয়া গেছে রবিবার দুপুরে। এজন্য সংশ্লিষ্টদের কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’
পটিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারহানুর রহমান বলেন, ‘ঘটনাস্থলে গিয়ে যদি শর্ত ভঙ্গের আলামত পাওয়া যায় তখন মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে জরিমানা আদায় বা কারাদন্ড বা উভয় দন্ডের বিধান রয়েছে।’
সংসদ সদস্য এনামুল হক এনাম বলেন, ‘মাটি খেকোদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে উপজেলা প্রশাসন ও থানা পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অবৈধভাবে মাটি কাটা কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না। তবে আগের তুলনায় কিছুটা কমেছে বলে আমার কাছে মনে হয়েছে।’
পটিয়া থানার ওসি মো. জিয়াউল হক বলেন, ‘পটিয়ায় মাটিকাটা কিছু দিন কমে গিয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে আবারো বেপরোয়া হয়েছে উঠেছে মাটি খেকোরা। খবর পেলে আমরা ঘটনাস্থলে টিম পাঠাচ্ছি। কিন্তু তার আগেই ঘটনাস্থল থেকেই তারা সটকে পড়ে।’
তবে স্থানীয়দের দাবি শুধু নির্দেশনার মধ্যে সীমাবদ্ধ চান না, প্রয়োজন দৃশ্যমান অভিযান ও কঠোর শাস্তির। অন্যথায় প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের কাছে প্রশাসনের অবস্থান প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে। প্রশাসনের কঠোর অবস্থান বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, নাকি পুকুর সংস্কারের আড়ালে চলতেই থাকবে মাটি বিক্রির এই অঘোষিত সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম।