টানা কয়েক দিনের ভারি বর্ষণ ও ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে খোয়াই নদী। বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে সাড়ে ৯টার দিকে হবিগঞ্জ সদর উপজেলার লস্করপুর ইউনিয়নের কালীগঞ্জ এলাকায় খোয়াই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করতে শুরু করে। এতে একে একে অন্তত ২৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়। পানির প্রবল স্রোতে নিম্নাঞ্চলের বসতবাড়ি, রাস্তাঘাট ও ফসলি জমি তলিয়ে গেছে। হঠাৎ পানি ঢুকে পড়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছে ২৫টি গ্রামের অন্তত অর্ধলক্ষাধিক মানুষ। গবাদি পশু ও আসবাব নিয়ে নিরাপদ স্থানে ছুটছে বন্যাদুর্গতরা। এর আগে একই দিন দুপুরে বানিয়াচং উপজেলার অন্তর্গত খোয়াই নদীর রাধাপুুর বাঁধ ভেঙে প্রবল বেগে হাওরে প্রবেশ করতে থাকে পানি।
এদিকে চুনারুঘাট উপজেলার নালমুখ বাজার সংলগ্ন এলাকায় নদীভাঙন আবারও তীব্র আকার ধারণ করেছে। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় ভাঙন দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে। এতে হরিজন সম্প্রদায়ের রবিদাস পাড়ার অন্তত ১৫টি পরিবার চরম ঝুঁকিতে পড়েছে। পাশাপাশি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি স্থাপনাও রয়েছে হুমকির মুখে। এ ছাড়া চরম ঝুঁকিতে রয়েছে খোয়াই নদীর মাছুলিয়া পয়েন্টের শহর রক্ষা বাঁধ।
স্থানীয় বাসিন্দারা দিন-রাত বাঁধ রক্ষায় কাজ করছেন। তারা বাঁশ দিয়ে অস্থায়ীভাবে বাঁধ টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন। একই অবস্থা সদর উপজেলা ভাদৈ বাঁধেরও। এলাকাবাসীর অভিযোগ, সময়মতো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নেওয়ায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের গাফিলতির কারণে ভাঙনের ঝুঁকি বেড়েছে।
জানা গেছে, খোয়াই নদীর কালীগঞ্জে বাঁধের একটি অংশ ভেঙে যাওয়ার পর দ্রুত বেগে নোয়াবাদ, চরহামুয়া, সুঘর, বনগাও, নতুন বাজার, বালিহাটা, কালীগঞ্জ, যাদবপুর, বিষ্ণরামপুর, দক্ষিনচর, রামনগর ও বনদক্ষিণ এলাকাসহ অন্তত ২৫টি গ্রামে পানি ঢুকে পড়ে। এসব এলাকার অনেক পরিবারের ঘরে কোমর সমান পানি ওঠে। পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠলে নারী, পুরুষ, শিশু ও বৃদ্ধরা গবাদি পশু, প্রয়োজনীয় আসবাব, কাপড়চোপড় ও মূল্যবান জিনিসপত্র ও গবাদি পশু নিয়ে নিরাপদ স্থানে চলে যেতে শুরু করেন। আবার কেউ কেউ আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে ও অনেকে স্থানীয় আশ্রয়কেন্দ্রে ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অবস্থান নিয়েছে। এ ছাড়া শহরের কামড়াপুর, দানিয়ালপুর ও যশেরআব্দা এলাকায়ও বাড়ি ঘরে পানি প্রবেশ করে।
অপরদিকে শুক্রবার পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় হবিগঞ্জ-মিরপুর সড়কের বিভিন্ন স্থানে পানি উঠে যায়। অনেক অংশ পানির নিচে চলে যাওয়ায় যানবাহন চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। পানি আরও বাড়লে সড়কটিতে সম্পূর্ণ যান চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এতে হবিগঞ্জ সদর উপজেলার সঙ্গে মিরপুর ও আশপাশের এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
স্থানীয়রা অভিযোগ করে বলেন, খোয়াই নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন ও মাটি কাটার কারণে নদী ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে এবং বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। হবিগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সায়েদুর রহমান বলেন, ‘পানি বৃদ্ধি পেলে জেলার নিম্নাঞ্চলে জলাবদ্ধতা ও বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রেখেছে স্থানীয় প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড। তবে বৃষ্টিপাত কমে আসলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে।
হবিগঞ্জ জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন বলেন, ‘বন্যার পরিস্থিতি তদারকি করতে কন্ট্রোলরুম খোলা হয়েছে। জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলায় ৫ লক্ষ টাকা, ১০০টন চাউল ও ১৮২০ প্যাকেট শুকনো খাবার মজুদ রয়েছে।’
হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসক ডা. জি এম সরফরাজ বলেন, ‘বন্যা পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রস্তুতি রাখা হয়েছে। বন্যাদুর্গতদের আশ্রয়ন কেন্দ্রে উঠার জন্য বলা হয়েছে।’