গত কয়েকদিনের টানা বন্যায় মৌলভীবাজার জেলায় কৃষি, মৎস্য ও গ্রামীণ অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। রাস্তা-ঘাট বসত বাড়ি থেকে পানি নামায় ক্ষত চিহৃ ভেসে উঠছে। এছাড়াও বন্যার তোড়ে তলিয়ে গেছে ফসলের মাঠ, ভেসে গেছে শত শত পুকুরের মাছ এবং বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থা। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণে মাঠপর্যায়ে কাজ করছেন সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তারা। তবে পূণাঙ্গ ক্ষয়ক্ষতির হিসাব নিরুপন করতে সময় লাগবে। এখনো অনেক নিচু এলাকায় রাস্তাঘাট থেকে পানি নামেনি। আজ সোমবার (১৩ জুলাই) সন্ধ্যায় জেলা সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তারা আংশিক ক্ষয়ক্ষতির তথ্য জানিয়েছেন।
কৃষিখাতে ক্ষয়ক্ষতির চিত্র
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বন্যায় কৃষিখাত ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. জালাল উদ্দিন জানান, জেলায় ৩৮,৫৩০ হেক্টর জমিতে আউস আবাদ হলেও ২৪৮ হেক্টর আক্রান্ত হয়েছে। এছাড়া ৩,০৭৯ হেক্টর আমন বীজতলার মধ্যে ৮৬.৫০ হেক্টর এবং ২৩৬ হেক্টর খরিফ-২ সবজি আবাদের মধ্যে ৬৪.৫০ হেক্টর এলাকা প্লাবিত হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, ‘মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে আক্রান্ত এলাকাগুলো সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দ্রুত ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। কৃষি বিভাগের পরামর্শ মেনে চললে কৃষকরা বড় ধরনের লোকসান থেকে রক্ষা পাবেন বলে আশা করছি।’
মৎস্য খাতে কোটি টাকার ক্ষতি
বন্যায় জেলার মৎস্য চাষিরা পড়েছেন চরম বিপাকে। জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. মো. আরিফ হোসেন জানান, বন্যায় জেলার প্রায় ৪০৫টি পুকুর ও জলাশয় প্লাবিত হয়েছে। এতে ভেসে গেছে বিপুল পরিমাণ মাছ। প্রাথমিক হিসাবে এই খাতে প্রায় এক কোটি ১৬ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে তিনি নিশ্চিত করেছেন।
কৃষিখাতের পাশাপাশি জেলার গ্রামীণ সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থায় নেমে এসেছে বিপর্যয়। বন্যার তোড়ে অনেক স্থানে রাস্তাঘাট ভেঙে বা তলিয়ে গিয়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। মৌলভীবাজার এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী আহমেদ আব্দুল্লাহ জানান, ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের তালিকা তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। পুরো পরিস্থিতির চিত্র স্পষ্ট হতে আরও ৩-৪ দিন সময় লাগবে। জরিপ শেষেই দ্রুততম সময়ের মধ্যে সড়ক মেরামতের কাজ শুরু হবে বলে তিনি আশ্বাস দিয়েছেন।
গবাদিপশুর খাদ্য ও চিকিৎসাসেবা নিয়ে উদ্বেগ
বন্যায় চারণভূমি ও খামারের গোখাদ্য তলিয়ে যাওয়ায় গবাদিপশুর মালিকরা পড়েছেন চরম সংকটে। জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আশরাফুল আলম খান জানিয়েছেন, প্রতিটি উপজেলায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণে কাজ চলছে। তিনি বলেন, “খামারিরা বর্তমানে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া মাত্রই সরকারি সহায়তা এবং জরুরি ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে।’
উল্লেখ্য যে, উজানে বৃষ্টিপাত না হওয়ায় মৌলভীবাজার জেলায় বন্যা পরিস্থিতির সার্বিক উন্নতি হচ্ছে। মনু, ধলাই, জুড়ী ও কুশিয়ারা নদীর পানি বিপদ সীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। আশ্রয় কেন্দ্র বা উঁচু স্থানে আশ্রয় নিয়েছেন তারা বাড়ি ফিরেছেন। বন্যা কবলিত এলাকায় সরকারি ও ব্যক্তি উদ্যোগে দেয়া হচ্ছে শুকনো খাবার।
রাজনগর উপজেলার টেংরা ইউনিয়নের বন্যায় আক্রন্ত রফিক মিয়া ও জসিম মিয়া , আছিয়া বেগম বলেন, গত ৩ দিন পানির নিচে থাকার পর গতকাল শনিবার রাত থেকে ঘর বাড়ি থেকে পানি নামা শুরু করেছে। ঘরে খাবার নেই , অনেকে সরকারী সাহায্য পাচ্ছে আমরা এখনো পাইনি। এছাড়াও আমাদের পরিবারের বাচ্চাকাচ্চার জ্বর উঠেছে আবার কারো ডায়রিয়া আক্রান্ত।
মৌলভীবাজারের সিভিল সার্জন ডা. মো. মামুনুর রহমান বলেন, ‘বন্যা কবলিত এলাকায় পানি বাহিত রোগে আক্রান্ত মানুষের চিকিৎসা সেবায় মেডিক্যাল টিম গঠন করা হয়েছে। একই সাথে পর্যাপ্ত ওষুধ মজুত করা আছে। নিচু এলাকায় অনেক স্থানে পানি রয়েছে।’
মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল বলেন, ‘বন্যার্তদের জন্য ইতোমধ্যে খাবার, চাল ও টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বন্যা কবলিত প্রতিটি এলাকায় মেডিক্যাল টিম গঠন করা হয়েছে। আমরা মনিটারিং করছি। তবে বাড়ি ঘর থেকে পানি নেমে গেছে।’




