kalerkantho


রাণীনগরের ৯ বীরাঙ্গনার স্বীকৃতি মেলেনি আজো

শাহরুখ হোসেন আহাদ, আত্রাই-রাণীনগর (নওগাঁ)    

১৮ জানুয়ারি, ২০১৯ ১৭:২৪



রাণীনগরের ৯ বীরাঙ্গনার স্বীকৃতি মেলেনি আজো

মহান স্বাধীনতার ৪৭ বছর পেরিয়ে গেলেও নওগাঁর রাণীনগর উপজেলার মিরাট ইউনিয়নের আতাইকুলা পালপাড়া গ্রামের ৯ বীরাঙ্গনার ভাগ্যে আজো মেলেনি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও আর্থিক কোনো সুযোগ সুবিধা।

মুক্তযুদ্ধ চলাকালে নিজেদের স্বজন, প্রতিবেশীদের জীবন, সম্ভ্রম ও সম্পদ রক্ষা করতে গিয়ে রাজাকার আলবদরদের সহযোগিতায় পাক হানাদার বাহিনী দিনভর নির্যাতন, খুন, লুটপাট, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগসহ নানা ধরনের নির্যাতন চালায়। তারা ৫২ জন মুক্তিকামী মানুষকে প্রকাশ্য দিবালোকে এক ঘরের বারান্দায় ব্রাশ ফায়ারে হত্যা করে।

১৯৭১ সালে দেশ মাতৃকার টানে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে এসব নারী বীরত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও আজ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় সম্মান হিসেবে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাননি তাঁরা।

উপজেলার আতাইকুলা পালপাড়া গ্রামের প্রয়াত বাণী রানী পাল, রেনু বালা, মায়া সূত্রধরসহ ৯ জন বীরাঙ্গনা। একাত্তরের সেই দুর্বিসহ যন্ত্রণা, সামাজিক বঞ্চনার পাশাপাশি অভাব অনটন, আর অসুস্থতার মধ্যেই চলছে তাঁদের জীবন সংগ্রাম। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার প্রধান শেখ হাসিনা সারা দেশে বেশ কয়েকজন বীরাঙ্গনাকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও সেই তালিকায় উত্তর জনপদের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক প্রয়াত আব্দুল জলিলের জন্মভূমি নওগাঁর রাণীনগরে ৯ জন বীরাঙ্গনার নাম তালিকাভুক্ত হয়নি আজো। এতে হতাশাগ্রস্ত পরিবার ও স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা।

সরেজমিনে মঙ্গলবার সকালে আতাইকুলা পালপাড়া গ্রামে গিয়ে খোঁজ নিতে যখন কালীদাশি পালের বাড়িতে উপস্থিত তখন তিনি বাড়িতে ছিলেন না। প্রতিবেশী একজন তাঁকে খবর দেওয়ার পর পাশের একটি চাতালে কাজ ফেলে বাড়িতে ছুটে আসেন তিনি। কিছুক্ষণের জন্য কথা হয় তাঁর বাড়ির আঙ্গিনায় বসে। ১৯৭১ সালে এই গ্রামে পাকবাহিনীর নির্যাতন প্রসঙ্গে আলাপকালে ৯ বীরাঙ্গনার মধ্যে কালীদাশি পাল (৭৫) বলেন, ওই দিন সকালে আমাদের গ্রাম পাঞ্জাবীরা নদী পার হয়ে চারদিক ঘিরে ফেললে আমার স্বামীসহ সবাই বাড়ির দরজা লাগিয়ে আত্মগোপনের চেষ্টা করি। কিন্তু স্থানীয় রাজাকারদের সহযোগিতায় গেইটের দরজা ভেঙে আমার স্বামীকে টেনে হিঁচড়ে পাঞ্জাবিরা রাইফেল দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে গুরুতর আহত করে প্রতিবেশী যোগেন্দ্রনাথের বাড়ির বারান্দায় নিয়ে হাত বেঁধে ফেলে রাখে। স্বামীর প্রাণ ভিক্ষা চাইতে গিয়ে কোনা কথা না শুনে চোখের সামনে পাক হায়েনারা আমার স্বামীসহ ৫২ জনকে ব্রাশ ফায়ারে  হত্যার পর আমার ওপর চালায় পৈশাচিক নির্যাতন। এক মুঠো ভাতের তাগিদে এবাড়ি ওবাড়ি কাজ করি। আবার কখনো ধান কুড়িয়ে, বয়লারে কাজ করে, দু'মুঠো ডাল ভাত খেয়ে কোনো মতো বেঁচে আছি।

সুষমা পাল (৭৩) বলেন, ওই দিন সকাল ৯টার দিকে আমার স্বামী বাড়িতে কাজ করছিলেন। এ সময় যোগেন্দ্রনাথ পালের বাড়িতে পাঞ্জাবিরা আমার স্বামীকে ধরে নিয়ে লাইন করে রাখে। পাঞ্জাবিরা আমাদের পাড়ার বাড়ি বাড়ি গিয়ে লুটপাট ভাঙচুড় ও অগ্নিসংযোগসহ নানা ধরনের নির্যাতন চালায়। আমি ছোট্ট ছেলেকে নিয়ে পাশের বাড়ির এক বড় মাটির ডাবরের ভেতর  আশ্রয় নেই। বাচ্চার কান্না পাঞ্জাবিরা শুনতে পেয়ে আমাকে সেখান থেকে বের হওয়ার কথা বলে। তখন আমি পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি।

প্রয়াত বাণী পালের ছোট ভাই জয়ন্ত পাল বলেন, একাত্তরের ঘটনার কথা জানতে চাইলে লজ্জায়,  ঘৃণায় ও ক্ষোভে দুঃখে মাথা নিচু হয়ে যায়। ২৫ এপ্রিল সকাল ৯টার দিকে যমুনা নদী পার হয়ে স্থানীয় দোসরদের সহায়তায় পাক বাহিনী আমাদের পালপাড়ায় ঢুকে বাবা শ্রীমন্ত পালকে ধরে মারপিট শুরুকরে। সাথে সাথে বীরের মতো সেই সময়ের কিশোরী আমার বড় দিদি বাণী পাল পাঞ্জাবিদের রাইফেল ছিনিয়ে নিয়ে কূপে ফেলে দিয়ে হাতাহাতি শুরু করলে বাণী পালের ওপর নেমে আসে তাদের নির্মম নির্যাতন। স্বাধীনতার লাল সবুজের পতাকা বাতাসে উড়লেও দেশে সরকার আসে সরকার যায় ৪৭ বছর পরও আমাদের খোঁজ কেউ নিতে আসেনি।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে জয়ন্ত একপর্যায়ে বলেন, লজ্জা ঘৃণায় আমার দিদি বিবাহ না করেই জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে অর্থ সংকটের কারণে যথাযথ চিকিৎসা করতে না পেরে মারা যান। তবে অন্য বীরাঙ্গনা রেণু বালা, ক্ষান্ত বালা পাল, মায়া সূত্রধর, রাশমুনী সূত্রধর, সন্ধ্যা পাল, সুষমা সূত্রধর ও তাদের স্বজনরা লজ্জা ঘৃণা, ক্ষোভে স্বজন হারানোর বেদনায় আর মুখ খুলতে রাজি নয়।

আতাইকুলা গ্রামের শহীদ পরিবারের সদস্য গৌতুম পাল বলেন, স্বাধীনতার অনেক সময় পার হলেও মুক্তিযুদ্ধের বীরত্বগাঁথা রাণীনগর উপজেলার এই গ্রামের শহীদ ও বীরাঙ্গনা পরিবার রাষ্টীয় কোনো সুযোগ সুবিধা পাননি। এমনকি মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় তাঁদের নামও স্থান পায়নি। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকার পরও এ দপ্তর সে দপ্তর ঘুরেও আমাদের কোনো সুরাহা হয়নি।

রাণীনগর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার অ্যাড. ইসমাইল হোসেন বলেন, আতাইকুলার ৯ বীরাঙ্গনার ব্যাপারে যথাযথ প্রক্রিয়ায় যাচাই বাছাই শেষে রাষ্ট্রের সুযোগ সুবিধা পাওয়ার লক্ষ্যে তাঁদের তালিকা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এখন পর্যন্ত কোনো অগ্রগতির খবর আমাদের কাছে আসেনি।



মন্তব্য