kalerkantho


শার্শার রাজনৈতিক অঙ্গণ এখন নীরব

শার্শায় আওয়ামী লীগ-বিএনপি অভ্যন্তরীণ বিরোধ তুঙ্গে

জামাল হোসেন, বেনাপোল (যশোর) প্রতিনিধি   

১৮ নভেম্বর, ২০১৮ ২২:১০



শার্শায় আওয়ামী লীগ-বিএনপি অভ্যন্তরীণ বিরোধ তুঙ্গে

যশোর-১ (শার্শা) আসনের জন্য আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর সম্ভাব্য মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মনে এখন চলছে ‘টেনশন’। যেকোনো সময় দলীয় মনোনয়ন চূড়ান্ত হবে। বিএনপি জামায়াতের প্রার্থীরা এলাকায় না থাকলেও গত ৬ মাস যাবৎ আওয়ামী লীগের কয়েকজন মনোনয়ন প্রত্যাশী শার্শা উপজেলায় মোটরসাইকেল শোভাযাত্রা, পথসভা ইত্যাদির মাধ্যমে নৌকার পক্ষে ও সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের বিবরণ তুলে ধরেছেন লিফলেট ও বক্তব্যের মধ্য দিয়ে। এতে বেশ ভালোই সরগরম ছিল রাজনীতির মাঠ।

গত তিন মাস প্রার্থীদের এই তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়ে পরিবেশ এমনই হয়েছিল যে সহজেই সাধারণ মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। কে কতো মোটরসাইকেল আর শোভাযাত্রায় কত কর্মী অংশ নিয়েছে এসব ছিল প্রতিযোগিতা। কোনো প্রার্থীর সাথে কেন্দ্রীয় নেতাদের সম্পর্ক ভালো। মনোনয়ন ১০০ ভাগ আমিই পাবো এরূপ কর্থাবার্তায় নেতাকর্মীরা উজ্জীবিত ছিল।

কিন্তু গত এক সপ্তাহ এসব তৎপরতা থেমে গেছে। কারা মনোনয়ন পাবেন না দলীয় প্রধানের বক্তব্যে অনেকে মুষড়ে পড়েছেন। এখন সবাই এক হয়ে চেষ্টা করছেন যেন অমুক মনোনয়ন না পাক সেই কাজে মনোনিবেশ করছেন। আর সে কারণে কে হচ্ছেন ‘নৌকার মাঝি’ তা বলা সম্ভব নয়। আর এ নিয়ে শার্শার রাজনৈতিক অঙ্গণ এখন নীরব। সকল নেতা এখন ঢাকায় কেন্দ্রে যোগাযোগে ব্যস্ত।

শার্শার আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দের মধ্যে মনোনয়ন ফরম কিনে জমা দিয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ও বর্তমান সাংসদ শেখ আফিল উদ্দিন, জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও বেনাপোল পৌর মেয়র আশরাফুল আলম লিটন, পাসপোর্ট ও ইমিগ্রেশনের সাবেক মহাপরিচালক মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মাবুদ, জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য আব্দুল মান্নান মিন্নু, জেলা আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক মুজিবুদ্দৌলাহ সরদার কনক, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট এর অ্যাডভোকেট ড. এ কে এম আখতারুল কবীর ও শাহাজান গোলদারের পক্ষে তাদের সমর্থক নেতাকর্মীরা দলীয় মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করে জমা দিয়েছেন।

ইতোমধ্যেই শার্শা-বেনাপোল এলাকায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে একজন নতুন মুখ। বর্তমান সংসদ সদস্য ও বেনাপোল পৌর মেয়র এই দুইজন এখন দলীয় কোন্দলে দু’মেরুতে অবস্থান। দ্বন্দ্বের এই টানা পোড়নে কেউ কারো মুখ দেখতে পর্যন্ত চায় না। এই অবস্থায় আওয়ামী ঘরানার বহু কর্মী-সমর্থকরা মনে করছে আগামী নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসাবে তৃতীয় কোনো ব্যক্তি নতুন করে নৌকার হাল ধরবে। সেই হিসেবে মাঠে নামেন সাবেক এডিশনাল আইজিপি ও ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্টের সাবেক মহা-পরিচালক মো. আব্দুল মাবুদ।

এ দিকে আফিল ও লিটনের দ্বন্দ্বের অবসান না হলে এই আসনে নৌকা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা তৃণমূল আওয়ামী লীগের। স্থানীয় কয়েকজন নেতা জানান, আফিলের লোকজন লিটনের লোকজনকে সহ্য করতে পারেন না। ঠিক লিটনের সমর্থক নেতাকর্মীরাও আফিলের নেতাদের দেখতে পারেন না। দু’নেতার সমর্থকদের বিবাদে এই আসন হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে বলেও আশঙ্কা তাদের।

অপরদিকে বিএনপির মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করে জমা দিয়েছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় বিএনপির সাবেক দপ্তর সম্পাদক মফিকুল হাসান তৃপ্তি, কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক দলের সহসাধারণ সম্পাদক আলহাজ্ব মহসিন কবির, শার্শা উপজেলা বিএনপির সভাপতি আলহাজ্ব খায়রুজ্জামান মধু, সাধারণ সম্পাদক ও শার্শা সদর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আবুল হাসান জহির, যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নুরুজ্জামান লিটন।

মফিকুল হাসান তৃপ্তিকে দলে নেওয়ায় মনোনয়ন ঠেকাতে মরিয়া একটি পক্ষ। আবার জামায়াতের অস্তিত্ব নিয়েও রয়েছে বিএনপিতে ভয়। তবে চার প্রার্থী আতঙ্কে আছেন বিএনপির সাবেক কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক মফিকুল হাসান তৃপ্তিকে নিয়ে। তাকে দলে ফিরিয়ে নেওয়া ও প্রার্থী হিসেবে নাম আসার এমন গুঞ্জনে শার্শা বিএনপির রাজনীতিতে বেশ ঝড় উঠেছে। তারা চাচ্ছে তৃপ্তিকে বাদ দিয়ে এ আসনে জামায়াতের শূরা সদস্য মাওলানা আজীজুর রহমানকে প্রার্থী করে তাকে সমর্থন করা হোক।

এদিকে, জামায়াত ঐক্যফ্রন্টে যোগ না দিলেও বিএনপি-জামায়াত কয়েকটি আসনে জোটগত নির্বাচন করবে। সে রকম একটি তালিকা দিয়েছে বিএনপিকে। সেক্ষেত্রে বিএনপির অবস্থান কি হবে তা নিয়েও তৃণমূলে নানা প্রশ্ন ঘুরছে। কারণ ইতোপূর্বে এখানে জোটগতভাবে জামায়াত বিজয়ী হয়েছে। তবে এবার জামায়াতের নিজের ব্যানারে ভোট করার সুযোগ নেই। সেক্ষেত্রে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় জামায়াত বিএনপির ঘাড়ে ভর করে স্বতন্ত্র প্রার্থী মনোনয়ন চেয়েছেন এ আসনে।

সাধারণ ভোটারদের ধারণা সর্বশেষ জোটগত নির্বাচনে এ আসনে প্রার্থী ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় শূরা সদস্য যশোর জেলার সাবেক আমীর মাওলানা আজিজুর রহমান। তিনি সামান্য ভোটে পরাজিত হন। ফলে বিএনপির জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে আজিজুর রহমানকে ভাবছেন তৃণমূলের অনেকে।

জাতীয় পাটির মনোনয়ন পেতে জাতীয় পার্টির যশোর জেলা সাংগঠনিক সম্পাদক ও শার্শা উপজেলা সভাপতি ডা. মো. আক্তারুজ্জামান একমাত্র কান্ডারি হিসাবে ফরম সংগ্রহ করে জমা দিয়েছেন। তবে এ আসনে আওয়ামী লীগের সাথে জোট হবে জাতীয় পার্টির। সে ক্ষেত্রে এ আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী থাকছে না।

স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে উপজেলা থেকে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন জামায়াতে ইসলামীর শূরা সদস্য মাওলানা আজীজুর রহমান। জামায়াত ইসলামী একাদশ জাতীয় সংসদে যে ক‘টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার কথা বিএনপিকে জানিয়েছে তার মধ্যে যশোর ১ আসনটি রয়েছে। এ ক্ষেত্রে বিএনপি জামায়াতকে ছেড়ে দিতে পারে এ আসনটি।

যশোরের শার্শা উপজেলার ১১টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভা নিয়ে যশোর ১ আসন গঠিত। দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোল এই আসনে অবস্থিত। এই নির্বাচনী এলাকার মোট ভোটার সংখ্যা ২ লাখ ৫৩ হাজার ৪৮১ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটারের সংখ্যা ১ লাখ ২৬ হাজার ১৮১ জন। আর নারী ভোটারের সংখ্যা ১ লাখ ২৭ হাজার ৩০০ জন। এ আসনে নারী ভোটার বেশি। সব দলের জন্য এই আসনটি মর্যাদার। বিগত ১০টি সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ৫ বার, বিএনপি ৩ বার, জাতীয় পার্টি ও জামায়াত একবার করে বিজয়ী হয়েছে।

মাঠ পর্যায়ের তথ্য ও বিভিন্ন সময়ে অনুষ্ঠিত ভোটের হিসাব-নিকাশে দেখা যায় একক রাজনৈতিক দল হিসেবে এই আসনে আওয়ামী লীগের রিজার্ভ ভোটের সংখ্যা ৪০-৪৫ শতাংশ। বিএনপির একক ভোটের সংখ্যা ৩৫-৪০ শতাংশ। বিএনপি জোটের শরীক জামায়াতে ইসলামীর একক ভোটের সংখ্যা ১৫-২০ শতাংশ। এক্ষেত্রে জোটগত হিসাবে আওয়ামী লীগের তুলনায় বিএনপি-জামায়াত জোটের ভোটের সংখ্যা প্রায় ৬০ শতাংশ। যা কিনা আওয়ামী লীগ জোটের চেয়ে ১০-১৫ শতাংশ বেশী। অপরদিকে এই আসনে ২-৩ শতাংশ ভোট পায় জাতীয় পার্টি। বাকী অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর কোনো অস্তিত্ব নেই। সেই হিসেবে বিএনপি জামায়াতের প্রার্থীর বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের যোগ্য প্রার্থী না দিলে এ আসনটি হারাবে আওয়ামী লীগ।



মন্তব্য