kalerkantho


প্রান্ত হত্যা: আদালতে সুমনের স্বীকারোক্তি, কারাগারে পাঁচ আসামি

বড়লেখা (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি   

১৪ নভেম্বর, ২০১৮ ১৭:৩৩



প্রান্ত হত্যা: আদালতে সুমনের স্বীকারোক্তি, কারাগারে পাঁচ আসামি

ছবি: কলেজছাত্র প্রান্ত দাস

মৌলভীবাজারের বড়লেখায় কলেজছাত্র প্রান্ত দাস (১৮) হত্যার অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া পিসাতো (ফুফাতো) ভাই সুমন দাস গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। মামলাটির তদন্তকারী ও বড়লেখা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. ইয়াছিনুল হক এ তথ্য স্থানীয় সাংবাদিকদের জানিয়েছেন।

গ্রেপ্তারকৃত সুমন বর্ণি ইউনিয়নের মিহারী নয়াগ্রামের মৃত করুণাময় দাসের ছেলে। বড়লেখা আদালতের জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম হরিদাস কুমারের খাস খামরায় ১৬৪ ধারায় তার স্বীকারোক্তিমূলক এ জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়।

পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তারকৃত সুমন দাস ১৬৪ ধারায় তার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবব্দিতে কলেজছাত্র প্রান্ত হত্যার কথা স্বীকার করেছে। নারী-সংক্রান্ত ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে। আসামি আদালতে হত্যার বিবরণ দিয়েছে। গত ২৯ অক্টোবর রাতে পিসাতো ভাই সুমন দাস বাজার থেকে বাড়ি ফিরলে পরিবারের এক নারী সদস্যের সাথে আপত্তিকর অবস্থায় প্রান্ত দাসকে দেখতে পেয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। সুমন প্রান্তকে ধাওয়া দিয়ে এক পর্যায়ে বাড়ির রাস্তায় গিয়ে ধরে ফেলেন।

এরপর মুখ চেপে ধরলে প্রান্ত অজ্ঞান হয়ে পড়েন। তখন প্রান্তর হাত-পা ও মুখ বেঁধে পরিত্যক্ত রান্না ঘরের খাটের নিচে রেখে দেন। পরে প্রান্তের বড় ভাই শুভ দাসকে ফোন দিয়ে জানান, প্রান্তকে পাওয়া যাচ্ছে না। খবর পেয়ে শুভ সুমনদের বাড়িতে আসেন। তারা একসাথে বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি করেন। এর পরদিন ৩০ অক্টোবর রাত পর্যন্ত প্রান্তকে না পেয়ে শুভ তার মামার বাড়ি একই উপজেলার (বড়লেখা) গাজীটেকা চলে যান। ওই রাতেই পরিত্যক্ত রান্না ঘরের খাটের নিচ থেকে প্রান্তকে বের করে আনা হয়। তখনও প্রান্ত জীবিত ছিলেন। মুখ বাঁধা থাকায় কথা বলতে পারেননি। পরে রাত আনুমানিক তিনটার দিকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। এরপর লুঙি দিয়ে মুখ ও গলা বেঁধে সুমনের কাকাতো ভাই নিকেশের পরিত্যক্ত রান্নাঘরের জানালার গ্রিলের সঙ্গে দাঁড় করিয়ে রেখে দেন। ঘটনাটি আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দিতে প্রান্তের মুঠোফোন থেকে কয়েকটি ক্ষুদেবার্তা প্রান্তের সহপাঠী, স্বজন ও ভাইয়ের কাছে পাঠানো হয়। খুনিই ক্ষুদেবার্তা পাঠায়। হত্যার আগে ও পরে ওই ক্ষুদেবার্তা পাঠানো হয়। হত্যার ঘটনাটি সন্দেহের বাইরে রাখতে লাশের প্যান্টের পকেটে মুঠোফোন রেখে দেন সুমন।

গত ৩১ অক্টোবর সকালে বড়লেখা উপজেলার বর্ণি ইউনিয়নের মিহারী নয়াগ্রামের পিসির (ফুফুর) বাড়ির একটি পরিত্যক্ত রান্নাঘরের জানালার গ্রিলের সাথে মুখ বাঁধা ও দণ্ডায়মান অবস্থায় প্রান্ত দাসের লাশ পাওয়া যায়। প্রান্ত উপজেলার সুজানগর ইউনিয়নের বাঘমারা গ্রামের সনত দাসের ছেলে। তিনি পিসির বাড়িতে থেকে এম মন্তাজিম আলী কলেজে লেখাপড়া করতেন। ওই দিন স্থানীয়ভাবে খবর পেয়ে পুলিশ লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে প্রেরণ করে। এই ঘটনায় লাশ উদ্ধারের দিনই একটি অপমৃত্যু মামলা হয়েছিল। পরবর্তীতে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে প্রান্তকে হত্যার বিষয়টি উঠে আসায় পুলিশ সুমন দাস, তাঁর স্ত্রী নিভা রানী দাস, চাচাতো ভাই নিরেশ দাস, নিকেশ দাস ও ভাতিজা চন্দন দাসকে আটক করে।

পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আটক সুমন দাস প্রাথমিকভাবে হত্যার বিষয়টি স্বীকার করেন। একইভাবে সুমন মঙ্গলবার বিকেলে আদালতেও স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। জবানবন্দি শেষে সুমনকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক হওয়া আরো চারজন এজাহার নামীয় আসামি হওয়ায় পুলিশ তাদেরকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে প্রেরণ করেন। আদালত তাদেরকেও কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

এ ঘটনায় গত সোমবার (১২ নভেম্বর) বিকেলে প্রান্তের বড় ভাই শুভ দাস বাদী হয়ে সুমনকে ১ নম্বর আসামি করে থানায় ৮জনের নাম উল্লেখ ও ৬জনকে অজ্ঞাতনামা রেখে হত্যা মামলা করেন। মামলা নম্বর-০৯।

প্রান্তের বড়ভাই মামলার বাদী শুভ দাস বলেন, আমি আমার ভাইয়ের হত্যার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের গ্রেপ্তারসহ দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। প্রধান আসামি সুমন একা নয় তার আরো অনেক সহযোগী আছেন। কারণ হত্যা করে এসব কাজ করা সুমনের পক্ষে একা সম্ভব নয়।

মামলাটির তদন্তকারী ও বড়লেখা থানার অফিসার ইনচার্জ মো. ইয়াছিনুল হক জানান, সুমন আদালতে হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দী দিয়েছে। সে একা হত্যার দায় স্বীকার করেছে। বলেছে, সে একাই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। কিভাবে হত্যা করা হয়েছে। তারও বিবরণ দিয়েছেন। তবে জবনবন্দিতে দেওয়া তার তথ্য আরো যাচাই-বাছাই করা হবে। ঘটনার সাথে আর কেউ জড়িত আছে কি-না তাও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। মামলাটি আমি নিজেই তদন্ত করছি। এজাহারনামীয় অন্য আসামিদের ঘটনার সাথে জড়িত থাকার বিষয়টি সুষ্পষ্টভাবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করছি।

তিনি বলেন, জবানবন্দি শেষে সুমন ও এজাহারনামীয় আরো ৪ আসামিদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে। আসামিদের রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আবেদন করা হবে।

গত মঙ্গলবার (১৩ নভেম্বর) দৈনিক কালের কণ্ঠে ‘আত্মহত্যা নয়, হত্যা’ শিরোনামে এ সংক্রান্ত সংবাদ প্রকাশ হয়।  



মন্তব্য