kalerkantho


বৃহস্পতিবার থেকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু

প্রতিদিন দেশে ফিরবে দেড় শ রোহিঙ্গা

তোফায়েল আহমদ, কক্সবাজার ও জাকারিয়া আলফাজ, টেকনাফ   

১৪ নভেম্বর, ২০১৮ ০১:৪৬



বৃহস্পতিবার থেকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু

ছবি: কালের কণ্ঠ

আগামীকাল বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হচ্ছে বহুল প্রত্যাশিত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন। প্রতিদিন ১৫০ জন করে রোহিঙ্গা দেশে ফিরে যাবেন। এ জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত রয়েছে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে নিয়োজিত কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার কার্যালয়ের কর্মকর্তারা। প্রত্যাবাসনের কাজ সম্পন্ন করতে ইতিমধ্যে নাফনদ তীরে স্থাপন করা হয়েছে ২টি প্রত্যাবাসন পয়েন্ট।

এদিকে কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফ সীমান্তে প্রত্যাবাসনকে কেন্দ্র করে রোহিঙ্গাদের মাঝে মিশ্র প্রতিক্রিয়া বিরাজ করছে। রোহিঙ্গাদের অনেকেই স্বেচ্ছায় ফিরে যেতে ইচ্ছুক নিজের ফেলে আসা বাপ-দাদার পোড়া ভিটায়। আবার অনেকেই মিয়ানমার বাহিনীর অত্যাচার-নির্যাতনের ভয়ে এ মুহূর্তে দেশে ফিরতে অনিচ্ছুক।

অপরদিকে রোহিঙ্গাদের স্বদেশে ফিরিয়ে দেয়ার তোড়জোড় দেখে স্থানীয়দের মধ্যে স্বস্তির ভাব লক্ষ্য করা গেছে। স্থানীয় সীমান্ত এলাকাবাসী সরকারের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে স্বাগত জানিয়েছে।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের কাজে জড়িত কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) ও সরকারের অতিরিক্ত সচিব আবুল কালাম আজাদ মঙ্গলবার নিশ্চিত করেন যে, আগামীকাল বৃহস্পতিবার অপরাহ্ন থেকে শুরু হবে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের কাজ। তিনি জানান, মিয়ানমার-বাংলাদেশের ঘুংধুম সীমান্ত দিয়ে আপাতত রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন করা হবে। পরবর্তীতে রোহিঙ্গাদের স্বদেশে ফেরৎ পাঠানো হবে টেকনাফ সদরের নাফনদ তীরের কেরুনতলী প্রত্যাবাসন ঘাট (ডিপারচার পয়েন্ট) দিয়েও।

রোহিঙ্গা ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) আবুল কালাম আজাদ এ প্রসঙ্গে আরো বলেন- ‘আমরা পুরোপুরি প্রত্যাবাসনের জন্য প্রস্তুত। প্রতিদিন ১৫০ জন করে রোহিঙ্গা ফিরে যাবেন তাদের দেশে।’ তিনি জানান, নাফনদের ওপারে মিয়ানমারের রাখাইনেও প্রত্যাবাসিত রোহিঙ্গাদের জন্য খোলা হয়েছে ২টি রিসিভিং সেন্টার। এপাড় থেকে প্রত্যাবাসিত রোহিঙ্গাদের ওপারের রিসিভিং সেন্টারে দুইদিন রাখা হবে। এরপর রোহিঙ্গাদের নিয়ে যাওয়া হবে তাদের পুনর্বাসন কেন্দ্রে।

এদিকে প্রত্যাবাসনকে কেন্দ্র করে রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে অস্থির ভাব বিরাজ করছে। রোহিঙ্গাদের অনেকেই স্বদেশে ফিরে যাবার ব্যাপারে অনীহা ভাব দেখালেও তারা সেখানে কেবল নিরাপত্তাটুকুর দাবি জানিয়েছেন। সাধারণ রোহিঙ্গারা বলছেন, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হলে বাপ-দাদার ভিটায় ফিরতে কোনো আপত্তি নেই। 

স্বদেশে ফিরে যেতে তালিকাভুক্ত রোহিঙ্গা নুরুল আলম (৩২) মঙ্গলবার কালের কণ্ঠকে বলেন- ‘দেশে ফিরে যাবার জন্য আমার পরিবারের নাম তালিকাভুক্ত হবার কথা আমি শুনেছি। স্বদেশে ফিরতে আমার কোনো আপত্তি নেই। আমরা এমনিতেও ফিরতে চাই। কিন্তু নিরাপত্তার বিষয়টুকু নিয়েই আমাদের যত উদ্বেগ।’ টেকনাফের উনচিপ্রাং শিবিরের রোহিঙ্গা নুরুল আলম রাখাইনের মন্ডু থানার বলিবাজার এলাকার বাসিন্দা।

একই শিবিরের অপর রোহিঙ্গা মোহাম্মদ আমিন (৪৫) জানান- ‘আমার শিবিরের শেড মাঝির নিকট আমি শুনেছি দেশে ফিরে যাবার তালিকাভুক্ত হয়েছে আমার পরিবার। আমরা ফিরতে চাই আমাদের পোড়া ভিটায়। সেখানে গিয়ে আমরা আবার নিজ ভিটায় গড়তে চাই নতুন ঘর-সংসার।’ তিনি বলেন, তার উদ্বেগ কেবল রাখাইনের সেনাবাহিনী নতুন করে অন্য কোনো অজুহাত তুলে তাদের ওপর আবারো হামলে পড়বে কিনা।

অপরদিকে রাখাইনের দেশত্যাগী স্বচ্ছল পরিবারের রোহিঙ্গারাই সবচেয়ে উদগ্রীব দেশে ফিরে যাবার জন্য। স্বচ্ছল পরিবারের রোহিঙ্গারা বলছেন, তারা শরণার্থী জীবন কাটাতে একেবারেই অভ্যস্ত নন। নিজ দেশে ফেলে আসা সহায় সম্পদ থেকেই প্রচুর আয় আসে এসব রোহিঙ্গাদের কাছে। তাই তারা এ মুহূর্তেই দেশে ফিরতে চান।

এদিকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরুর প্রাক্কালে শিবিরগুলোতে দেশি-বিদেশি কতিপয় এনজিও’র (বেসরকারি সংস্থা) ছদ্মাবরণে থাকা কুচক্রিমহল রোহিঙ্গাদের মাঝে প্রত্যাবাসন বিরোধী উস্কানি ছড়িয়ে দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ মহলটি সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত রোহিঙ্গাদের উত্তেজিত করে যেকোনো প্রকারে প্রত্যাবাসন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করতে অপতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে।

এমনকি গত ক’দিন ধরে মহলটি শিবিরে শিবিরে গিয়ে প্রত্যাবাসন বিরোধী অপপ্রচারণা চালানোরও অভিযোগ উঠেছে। এ ধরনের অপপ্রচারের মুখে দেশে ফিরতে তালিকাভুক্ত বেশ কিছু সংখ্যক রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন এড়ানোর জন্য এক প্রকার গা ঢাকা দিতে শুরু করেছে বলেও জানা গেছে। জামতলী শিবিরের ১ নম্বর ব্লকে কয়েকটি তালিকাভুক্ত রোহিঙ্গা পরিবারের সদস্যদের গত দু’দিন ধরে খোঁজে পাওয়া না গেলেও পরে তাদের সন্ধান মিলেছে এল শিবিরের শেড মাঝি জানিয়েছেন। 

রোহিঙ্গা শিবিরের এসব বিষয়ে উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. নিকারুজ্জামান চৌধুরী জানিয়েছেন, এসব বিষয় নিয়ে প্রশাসন সহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার সদস্যরা অবহিত রয়েছেন। তবুও প্রত্যাবাসনের কাজ যথারীতি সম্পন্ন করার ব্যাপারে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। 



মন্তব্য