kalerkantho


পাবনা-৩ আসন

আওয়ামী লীগের আশা নতুন মুখ, বিএনপির আস্থা পুরাতনেই

চাটমোহর (পাবনা) প্রতিনিধি   

২১ অক্টোবর, ২০১৮ ১৬:২৮



আওয়ামী লীগের আশা নতুন মুখ, বিএনপির আস্থা পুরাতনেই

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পাবনা-৩ আসন (চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া ও ফরিদপুর) বর্তমানে প্রধান দুই দলেই চলছে একাধিক মনোনয়ন প্রত্যাশীর সরব প্রচার প্রচারণা। গ্রাম গঞ্জের তৃণমুল নেতাকর্মী ও দলীয় সমর্থকদের সাথে কুশল বিনিময়, উঠান বৈঠকসহ বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে নিজ নিজ দলীয় প্রচারণায় ব্যস্ত সময় পার করছেন এ এলাকার আওয়ামী লীগ ও বিএনপিপন্থী অন্তত দেড় ডজন নেতা। শুধু কুশল বিনিময় নয় তারা এই পাবনা-৩ এলাকার উন্নয়ন ও আধুনিকায়নে দিচ্ছেন নানা প্রতিশ্রুতি।

তথ্য অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পাবনা-৩ আসনকে এলাকার মানুষ ও নেতাকর্মীরা লক্ষ্মী আসন হিসেবেই মনে করে। এর কারণ হিসেবে স্বাধীনতার পরে এই আসনে যে দলের সংসদ নির্বাচিত হয়েছেন সেই দলই সরকার গঠন করেছে। আর এখানে সংসদ নির্বাচনে চাটমোহর উপজেলার ভোটারদের ভূমিকাই অগ্রাধিকার পায় একজন সংসদ নির্বাচিত হওয়ার ক্ষেত্রে।

পাবনা-৩ আসনে মূলত তিনটি উপজেলা, তিন পৌরসভা ২৩টি ইউনিয়নের সমন্বয়ে প্রায় ৪ লক্ষ ভোটার রয়েছে। যার মধ্যে চাটমোহর উপজেলায় ভোটার সংখ্যা চলতি হিসেব অনুযায়ী ২ লক্ষ ১৫ হাজার, ভাঙ্গুড়া উপজেলায় ৯০ হাজার ও ফরিদপুর উপজেলায় ৯১ হাজার ভোটার। ভোটার সংখ্যা গরিষ্ঠতায় অপর দুই উপজেলা মিলে যে ভোট শুধু চাটমোহর উপজেলাতেই অনেক বেশি ভোট রয়েছে।

বর্তমানে ক্ষমতাসীন দল আ’লীগ সর্বশেষ পর পর দুই মেয়াদে সরকার গঠন করলে এই আসনেও দুই বারই নির্বাচিত হয়েছেন বর্তমান সংসদ ও কৃষি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি আলহাজ মকবুল হোসেন। তবে এবারের সংসদীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এ আসনে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে শুরু হয়েছে তুমুল বাকযুদ্ধ ও মাঠ দখলের লড়াই।

বর্তমান সংসদ মকবুল হোসেনের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ উত্থাপন করে সভা সমাবেশ করছেন প্রায় এক ডজন মনোনয়ন প্রত্যাশী। তারা এই তিন উপজেলার গ্রাম গঞ্জে সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের প্রচারণার সাথে সাংসদ মকবুলের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ উত্থাপন করে জনমত নিজেদের পক্ষে নেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। তারা বর্তমান সংসদের মনোনয়ন প্রাপ্তির ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছেন। তাদের একটাই দাবী সংসদ মকবুল বাদে নতুন প্রার্থীর প্রত্যাশা কেন্দ্রের কাছে।

পাবনা-৩ আসনের তিন উপজেলার আ’লীগের অধিকাংশ সভাপতি-সম্পাদক সংসদ মকবুলের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য অবস্থানে থাকলেও ইউনিয়ন পর্যায়ের অধিকাংশ সভাপতি ও চেয়ারম্যানরা তার পক্ষে রয়েছেন। তবে হেবি ওয়েট এক ডজন মনোনয়ন প্রত্যাশী ও তৃণমূল আ’লীগের সংখ্যা গরিষ্ঠ নেতাকর্মীরা এ আসনে নতুন মুখের চমকের অপেক্ষায় আছে এমন আলোচনা সমালোচনা এখন গ্রাম-গঞ্জের সর্বত্র।

পাবনা-৩ এলাকায় প্রচার প্রচারণায় ও তৃণমুল নেতাকর্মীদের মতামতের ভিত্তিতে যাদের নাম আ’লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন তারা হলেন- বর্তমান সংসদ সদস্য আলহাজ্ব মকবুল হোসেন, পাবনা জেলা আ’লীগের সহ-সভাপতি আলহাজ্ব আব্দুল হামিদ মাস্টার, কেন্দ্রীয় আ’লীগ নেতা ও রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক ছাত্রলীগের সা. সম্পাদক ইঞ্জি. মো. আব্দুল আলীম, চাটমোহর উপজেলা আ’লীগের সভাপতি এ্যাড. সাখাওয়াত হোসেন সাখো, পাবনা জেলা আ’লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক বাকি বিল্লাহ, পাবনা জেলা আ’লীগের উপদেষ্টা আ.স.ম আব্দুর রহিম পাকন, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপকমিটির সাবেক সহসম্পাদক আতিকুর রহমান আতিক, এ্যাড. শাহ আলম, বিএমএ পাবনা জেলা শাখার সভাপতি ডা. গোলজার হোসেন, ফরিদপুর উপজেলা আ’লীগের সভাপতি খলিলুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক আলি আশরাফুল কবির।

এ ছাড়াও আরো ২/১ জন নেতা মনোনয়ন প্রত্যাশার ব্যাপারে আশাবাদী থাকলেও মাঠে কিংবা নেতাকর্মীদের সাথে তেমন কোনো যোগাযোগের খবর পাওয়া যায়নি।

অপরদিকে বিএনপির এ আসনে সরব কোনো প্রচার প্রচারণা না থাকলেও সম্প্রতি কেন্দ্র ঘোষিত কর্মসূচীগুলো স্থিমিত আকারে পালন করছেন নেতাকর্মীরা। তিন উপজেলায় গ্রুপিং থাকলেও দলের চরম দুর্দিনে নেতাকর্মীরা সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছেন।

তিন উপজেলায় বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশীর তালিকা লম্বা নয়। নতুন পুরাতন মিলে জোড়ালো মনোনয়ন প্রত্যাশী রয়েছেন ৩/৪ জন। সকল দলের অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে মূলত আ’লীগের সাথে বিএনপির তুমুল হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

বিএনপির সাবেক সাংসদ, চাটমোহর উপজেলা বিএনপির সভাপতি, প্রবীণ রাজনীতিবিদ আলহাজ্ব কে এম আনোয়ারুল ইসলাম দলের এই চরম দুর্দিনে নেতাকর্মীদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন এবং কেন্দ্র ঘোষিত সকল দলীয় কার্যক্রম পালন করছেন। তিনিই মূলত এ আসনে বিএনপির অন্যতম মনোনয়ন প্রত্যাশীর তালিকায় রয়েছেন।

এ ছাড়া চাটমোহর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা চেয়ারম্যান হাসাদুল ইসলাম হীরা সভাপতির সাথে মিলে মিশে দলীয় কার্যক্রম পরিচালনা করলেও ত্যাগী নেতা, জেল জুলুমের শিকার হয়ে ইনি কর্মীদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন। দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশা তিনিও করছেন।

এ ছাড়াও বিএনপি থেকে এ আসনে আরো যারা মনোনয়ন প্রত্যাশী হিসেবে প্রচারণায় আছেন তারা হলো, কেন্দ্রীয় জিয়া সাংস্কৃতিক জোটের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি বিশিষ্ট শিল্পপতি হাসানুল ইসলাম রাজা, জেলা বিএনপির সহসভাপতি এ্যাড. মাসুদ খন্দকার।

তবে দলীয় নেতাকর্মীদের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা, প্রবীণ রাজনীতিবিদ অহিংশ রাজনীতিতে আনোয়ার সাহেবের বড় একটা গুণ রয়েছে। সে হিসেবে দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে তিন উপজেলার নেতাকর্মীরা তার উপরই আস্থা রাখতে চান বলে দলের নেতাকর্মীদের একাধীক সূত্রে জানা গেছে।

বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও দলীয় মনোনয়ন বিষয়ে চাটমোহর উপজেলা আ’লীগের সভাপতি এ্যাড. সাখাওয়াত হোসেন সাখো বলেন, আজ আমার মতো এই পাবনা-৩ আসনে অনেকগুলো প্রার্থী হয়েছেন। আমি দলের পিছনে দীর্ঘদিন শ্রম দিয়ে যাচ্ছি। আমি দল থেকে কি পেয়েছি। আজ এই আসনে যিনি সাংসদ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। গত দশ বছরে তিনি দলের কোনো মিটিংয়ে যোগদান করেননি। দলের প্রকৃত ত্যাগী নেতাকর্মীদের কৌশলে দূরে সরিয়ে দিয়ে কিছু চেয়ারম্যান নিয়েই তার এখন পথচলা। তার উপর আমাদের আর কোনো আস্থা নেই। আমরা আজ যারা প্রার্থী হয়েছি সবাই আমরা একটা বিষয় উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছি যে, দলকে বাঁচাতে, সংগঠনটাকে বাঁচাতে আগামী দিনে এই পাবনা-৩ আসনে আ’লীগকে রাখতে হলে বর্তমান যে সংসদ সদস্য আছেন তাকে বাদ দিতে হবে। তা না হলে দল মহা বিপর্যয়ে পড়বে।

এ বিষয়ে চাটমোহর উপজেলা বিএনপির সভাপতি সাবেক সংসদ আলহাজ্ব কে এম আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, দলের এই ক্রান্তি লগ্নে ও দলের তৃণমূল নেতাকর্মীদের সাথে সর্ব সময় যোগাযোগ রক্ষা করে চলার চেষ্টা করেছি। আমার নেত্রী দেশনেত্রী খালেদা জিয়া আজ কারাবন্দি। সম্প্রতি তারেক রহমানের বিরুদ্ধেও সাজানো মামলায় রায় প্রদান করা হয়েছে। আমি মূলত তাদেরকে নিয়েই চিন্তিত। তাছাড়া আগামী সংসদ নির্বাচনে সকল দলের অংশগ্রহণ মূলক নির্বাচন হলে আর দল যদি সে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে সেক্ষেত্রে আমি আশাবাদী। দলের নিবেদিত একজন কর্মী হিসেবে আমি বিএনপি থেকে মনোনয়ন পেলে এ আসনে দলকে বিজয় উপহার দিতে পারবো বলে বিশ্বাস করি।

এ বিষয়ে চাটমোহর পৌর আ’লীগের সভাপতি মো. নাজিম উদ্দিন বলেন, আমাদের এই পাবনা-৩ আসনে বর্তমান সংসদ মকবুল সাহেব তিনবার দলীয় মনোনয়ন পেয়ে দুইবার সংসদ নির্বাচিত হয়ে তার নেতৃত্বে এলাকায় ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। তিনি কখনো প্রতিহিংসার রাজনীতি করেন না। দল মত নির্বিশেষে কাউকে কখনই মিথ্যা মামলা দিয়েও হয়রানি করেন নি। আজ কিছু আ’লীগের জনবিচ্ছিন্ন নেতা ও কথিত মনোনয়ন প্রত্যাশীরা বিভিন্ন ধরনের মিথ্যাচার করে তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। মূলত এমপি মকবুল সাহেব কর্তৃক এলাকায় ব্যাপক উন্নয়ন হওয়ায় তারা সেটা মেনে নিতে না পেরে তার বিরুদ্ধচারণ করছেন। পাবনা-৩ এর উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে দল আবারো মকবুল সাহেবকে মনোনয়ন দিবে বলে আমাদের বিশ্বাস।



মন্তব্য