kalerkantho


শিবালয়: পর্যটন সম্ভাবনাময় এক উপজেলা

মারুফ হোসেন, শিবালয় (মানকিগঞ্জ) প্রতিনিধি   

২৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ১৬:০৪



শিবালয়: পর্যটন সম্ভাবনাময় এক উপজেলা

মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার তেওতা জমিদার বাড়ি। ছবি: কালের কণ্ঠ

মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলা পর্যটন সম্ভবনার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। প্রতিদিন শত শত দর্শনার্থীদের পদচারণায় মুখরিত হচ্ছে এই এলাকা। উপজেলাটির পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া পদ্মা-যমুনা নদী দিয়েছে বাড়তি প্রাকৃতিক নৈসর্গিক দৃশ্য। যমুনা নদীর পাশে অবস্থিত তেওতায় কয়েক শ বছরের পুরোনো কারুকার্য খচিত সৌন্দর্যমণ্ডিত নজর কারা জমিদার বাড়ি সবার আকর্ষণে পরিণত হয়েছে।

এ ছাড়া জমিদার বাড়ির তিন কিলোমিটার উত্তরে জাফরগঞ্জে যমুনা নদীর পাড়ে দুই কিলোমিটার দীর্ঘ বেড়ি বাঁধে বসে নদীর অপরূপ দৃশ্য অবলোকন করার জন্য প্রতিদিন হাজার হাজার দর্শনার্থী  ভিড় জমান এখানে। পাশাপাশি বিলের স্বচ্ছ জলরাশির মাঝ দিয়ে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে বোয়ালী এলাকায় প্রতিদিন বিকালে এক মূহুর্ত কাটানোর জন্য দর্শনার্থীদের ভিড়ে মুখোরিত হয় এসব জায়গা।

শিবালয় সদর থেকে দুই কিলোমিটার উত্তরে যমুনা নদীর তীরে প্রায় আট একর জায়গা জুড়ে আঠারো শতকের শেষের দিকে গড়ে উঠেছিল তেওতা জমিদার বাড়িটি। পঞ্চায়ন রায় চৌধুরী এ বিশাল জমিদার বাড়িটি নির্মাণ করেছিলেন। এক সময়ে জমিদার আমলে মানিকগঞ্জ জেলার শাসন ব্যবস্থা, জমিদারী কর, সব কিছুই এখান থেকে নিয়ন্ত্রিত হত। জমিদার বাড়িরটি পূর্ব পাশে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামেরপত্মী প্রমিলাদেবীর জন্ম ভিটা থাকায় এখানে পর্যটকদের কাছে বাড়তি খোড়াক যোগ করেছে।

বিশাল জমিদার বাড়িটির পশ্চিমে যমুনা তীর ঘেঁষে রয়েছে শান বাঁধানো ঘাটসহ বিশাল একটি পুকুর। পুকুরটির বিশেষ আর্কষণীয় দৃশ্য হল পুরো জমিদার বাড়িটি দৃশ্য পুকুরের পানিতে প্রতিফলিত হয়ে পানির নিচে আরেকটি জমিদার বাড়ি মনে হয়। পুকুরের চারপাশে চার মাথাওলা কয়েকটি তাল গাছ পর্যটকদের আগ্রহী করে তোলে। পুরো বাড়িটি নয়টির মতো পোড়া মাটির ইট ও চুনামাটি দিয়ে তিন তলা বিশিষ্ট অট্রালিকা রয়েছে। প্রতিটি ভবনে কাঠ, লোহা চিনা মাটির দিয়ে নিপুণ হাতে গড়া বিভিন্ন কারুকার্য খচিত নকশা দিয়ে তৈরি দরজা–জানালা, ছাদের নিচের অংশ।

বাড়িটির উত্তর পাশে বিশাল বড় একটি নাট মন্দির। তারপর রাজাদের শাসন ব্যবস্থার ঘর, তারপর কয়েদিদের বন্ধি রাখার ঘর, মাঝ খানে অন্দর মহল। পূর্ব পাশে বিশাল অন্ধকুপ, একেবারে দক্ষিণ পাশে দুই অট্রালিকার মাঝখানে উপরে টিনের চালা দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল থিয়েটার করার জন্য বিশাল ঘর। জমিদার বাড়িটির সামনে টালির বিশাল একটি কাচারি ঘড় রয়েছে। কাচারি ঘরটির বিশেষ আর্কষণ হল, দূর থেকে মনে হয় ঘরটি দ্বিতল বিশিষ্ট কিন্তু ঘরের ভিতরে গেলে বোঝা যাবে এটি দ্বিতল না একতলা বিশিষ্ট।

জমিদার বাড়িটির সবচেয়ে আর্কষণীয় ও ভিন্নমাত্রা যোগ করেছে নবরত্ন দোলন মঞ্চ। নবরত্নটির  চার পাশে নয়টি মঠ দিয়ে প্রায় দুইশত ফিট উচু করে তৈরি করা হয়েছে। সম্ভবত এটি দেশের একমাত্র নবরত্ন। এই মঞ্চকে ঘিরে তৎকালীন জমিদাররা এক মাসব্যাপী দোলন যাত্রার আয়োজন করতেন। সর্বশেষ পূর্ব পাশে রয়েছে আরেকটি পুকুর।

এই বাড়ির তৎকালীন জমিদার বাবু হিমশংকর রায় চৌধুরী ও কিরণ শংকর রায় চৌধুরির আমন্ত্রণে কয়েক বার কবি নজরুল তেওতায় এসেছিলেন। জমিদার বাড়ির শান বাঁধানো ঘাটে বসে কবি একাধিক কবিতাও রচনা করে ছিলেন। পাশের বাড়ির বসন্ত সেন গুপ্তর মেয়ে আশালতা সেন গুপ্তা  বা প্রমিলা দেবীর সাথে কবির প্রথম পরিচয় ঘটে। এ কারনে কবি প্রেমিকরা প্রায় প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে এসে ভিড় জমান এই বাড়িটিতে।

প্রতিনিয়তই বিভিন্ন অঞ্চল থেকে স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা বনভোজন করার জন্য এ এলাকায় এসে থাকেন। তবে জমিদার বাড়িটি সংস্কারের অভাবে দিন দিন তার আসল সৌন্দর্য্য হারাতে বসেছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ বাড়িটির অধিগ্রহণ করলেও বাড়িটির সংস্কারের কোনো অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। শীত মৌসুমে জমিদার বাড়িটির পশ্চিমে যমুনা নদীর বিশাল চরে দর্শনার্থীদের বিশেষভাবে মুগ্ধ করে থাকে।

স্থানীয় জহিরুল ইসলাম রিপন কালের কণ্ঠকে জানান, আমাদের জমিদার বাড়িটি দেশের মধ্য বেশ পুরোনো একটি জমিদার বাড়ি। বিভিন্ন কারনে দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে পর্যটকরা এখানে  আসেন। তবে পর্যটকদের জন্য থাকা-খাওয়ার কোনো ভাল ব্যবস্থা না থাকায় দিন এসে দিনই চলে যেতে হয়। তাই আমরা সরকারের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি যে বাড়িটি দ্রুত সংস্কার করে পর্যটনের এই বিশাল জায়গাটিকে দেশের মাঝে তুলে ধরার জন্য।

শিবালয় উপজেলা নির্বাহী অফিসার মেহেদী হাসান জানান, আমরা আপাতত দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে আগত পর্যটকদেরকে নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করছি। পাশাপাশি জমিদার বাড়িটি প্রত্নতত্ত্ব বিভাগকে দায়িত্ব দিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া জাফরগঞ্জ বেড়ি বাঁধের পাশে সরকারিভাবে বেঞ্চ, ছাতা, রেস্টুরেন্ট নির্মাণসহ নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এ ব্যাপারে মানিকগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য এ এম নাঈমুর রহমান দুর্জয় জানান, আমরা ইতোমধ্য সাংস্কৃতিক মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাবনা পাঠিয়েছি। খুব শিগগিরই এখানে নজরুল ইনস্টিটিউট, নজরুল-প্রমীলা জাদুঘরসহ জমিদার বাড়িটি রক্ষণাবেক্ষণের কাজ শুরু হবে।



মন্তব্য