kalerkantho


সংকটে দেবীদ্বার উপজেলার স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, দেখার কেউ নেই!

দেবীদ্বার (কুমিল্লা) প্রতিনিধি   

২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ২১:২৬



সংকটে দেবীদ্বার উপজেলার স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, দেখার কেউ নেই!

নানা সংকট আর সমস্যার আবর্তে কুমিল্লার দেবীদ্বার উপজেলার স্বাস্থ্য ব্যবস্থা। দেখার যেন কেউ নেই! সীমাহীন অনীয়ম-দুর্নীতি-স্বজনপ্রীতি আর অব্যবস্থাপনায় উপজেলার স্বাস্থ্য ব্যবস্থা মুখ থুবরে পড়েছে। রোগীদের চিকিৎসা সেবা দেওয়ার পূর্বে মানবিক মূল্যবোধ থেকে বিচ্যুত অর্থলোভী চিকিৎসক, নার্স, আয়াদের মানসিকতার পরিবর্তন এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটির জরুরি চিকিৎসার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভুগীরা।

২০০৬ সালের ১৮ জুন ৩১ শয্যার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি ৫০ শয্যায় উন্নিত করা হলেও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, আসবাবসামগ্রী, আবাসন, যন্ত্রপাতি ও প্রয়োজনীয় জনবলের অভাবে বিগত ১২ বছরেও স্বাস্থ্যসেবার উপযোগী হয়ে উঠতে পারেনি। উপরন্তু স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি প্রাইভেট কার, মাইক্রো বাস, এ্যম্ব্যুলেন্স, ট্রাক্টরের গেরেজ, হকারদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, মাদকসেবী, ছিনতাইকারী, প্রতারক, প্রেমিক-প্রেমিকাদের অভারণ্যে পরিণত হয়েছে।

এ ছাড়াও অর্ধশতাধিক খ্যাত-অখ্যাত ঔষধ কোম্পানির শতাধিক প্রতিনিধি, সরকারি হাসপাতাল ঘিরে এবং হাসপাতালের চিকিৎসকদের উপর নির্ভর করে ব্যাঙের ছাতার ন্যায় গড়ে ওঠা ২৯টি প্রাইভেট হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়গনস্টিকের শতাধিক দালালের নিয়ন্ত্রণে থাকায় উপজেলার ৫ লক্ষাধিক জনগোষ্ঠির বাহিরে মুরাদনগর, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে আগত রোগীরা জিম্মি হয়ে আছেন।

আগত রোগীরা বাস, টেম্পু, সিএনজি, রিকশা থেকে নামার সাথে সাথেই দালালদের টানা-টানির খপ্পরে পড়তে হয়। তাদের পছন্দের চিকিৎসকের কাছে না যেতে চাইলেও রোগীদের লাঞ্ছিত হতে হচ্ছে। দালালদের দৌরাত্মে প্রতিদিন দূরদূরান্ত থেকে চিকিৎসাসেবা নিতে আসা গরিব-অসহায় ও সাধারণ রোগীরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্তই নয়, লাঞ্ছিত হওয়াসহ সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

সরকারি হাসপাতালে অভিজ্ঞ টেকনেশিয়ান থাকার পরও কমিশনলোভী চিকিৎসকদের ব্যবস্থাপত্রে এক্সরেসহ নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরামর্শ থাকে নির্দিষ্ট কিছু প্রাইভেট হাসপাতাল, ক্লিনিকে। ফলে গরিব ও সাধারণ রোগীরা অনভিজ্ঞ টেকনিশিয়ানদের পরীক্ষা-নিরীক্ষায় অনেক সময় ভুল চিকিৎসাসেবা নিয়ে প্রতারিত হচ্ছে। সরকারি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে তিনজন প্রশিক্ষিত ও অভিজ্ঞ টেকনেশিয়ান, এক্সরে অপারেটর শুধুমাত্র কফ পরীক্ষা করে অলস সময় কাটান।

দালালদের চাপে চিকিৎসকরা অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ডিব্বা কোম্পনির ঔষধসহ নানা বাজে কোম্পানির ঔষধ ব্যবস্থাপত্রে লিখতে বাধ্য হচ্ছেন। না লিখলে দালাল ও ঔষধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের হাতে চিকিৎসকরা লাঞ্ছিত হতে হচ্ছে। কর্তব্যরত চিকিৎসক কর্তৃক ব্যবস্থাপত্র প্রদানকালে দালালরা পাশে দাঁড়িয়ে ঘারের উপর হুমড়ি খেয়ে দেখেন মসোহারা ও কমিশনভোগী চিকিৎসকরা কোন কোন কোম্পানির ঔষধ কতবেশী লিখেন এবং কোন কোন প্রাইভেট হাসপাতাল, ডায়গনেস্টিক ও ক্লিনিকের জন্য কতবেশী পরীক্ষা-নিরীক্ষা বরাদ্ধ রেখেছেন।

রোগীরা ব্যবস্থাপত্র নিয়ে চিকিৎসকের চেম্বার থেকে বের হওয়ার সাথে সাথে দালালদের রোগী ও ব্যবস্থাপত্র নিয়ে টানা হেঁচড়ার দৃশ্য যেন সায়েদাবাদ, গুলিস্থান, যাত্রাবাড়ির পরিবহন শ্রমিকদের যাত্রী হয়রানীর দৃশ্য। রোগী বাগাতে দালালে-দালালে মারামারি-হাতাহাতিও নিত্যদিনের ঘটনা।

স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এসিসহ অত্যাধুনিক তিনটি অপারেশন থিয়েটার থাকলেও জুনিয়র কনসালটেন্ট, এনেসথেসিয়া, সার্জারি চিকিৎসক, এনেসথেসিয়া এটেন্ডেন্টের অভাবে বিগত ১২ বছরে একদিনের জন্যও চালু করা সম্ভব হয়নি। ব্যবহারের অভাবে অপারেশন থিয়েটারের অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতিগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অপারেশন থিয়েটার চালু হলে দরিদ্র ও সাধারণ রোগীরা স্বল্প খরচে সিজারিং বা অপারেশনের সুযোগ পেত, তাতে গলাকাটা প্রাইভেট হাসপাতাল ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত খরচ আদায় থেকে বেঁচে যেত। যদিও সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকরাই অধিকাংশ প্রাইভেট হাসপাতালে অপারেশন বা সিজারিং করে থাকেন।

প্রায় পাঁচ লক্ষাধিক জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত ৫০ শয্যার দেবীদ্বার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২২ চিকিৎসক ও ১৮৬ অফিস কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ ২০৮ পদের জনবল থাকলে ও আট চিকিৎসক ও ৬৬ অফিস কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ ৭৪টি পদ শূন্য রয়েছে।

২২ চিকিৎসক পদের বিপরীতে একজন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা, একজন আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার, ১০ জন (কার্ডিওলজি, ইএনটি, অর্থপেটিক্স, শিশু, গাইনি, চর্ম ও যৌন, মেডিসিন চক্ষু, সার্জারি, এ্যানেসথেসিয়া) জুনিয়র কনসাল্টেন্ট, একজন করে সহকারী ডেন্টাল সার্জন, প্যাথলজি চিকিৎসক, ইউনানী চিকিৎসক, মেডিক্যাল অফিসার ইকুয়েভেলেন্ট, মেডিক্যাল অফিসার ইমার্জেন্সি, মেডিক্যাল অফিসার এ্যানেসথেটিস্ট, ইনডোর মেডিক্যাল অফিসার ও তিনজন মেডিক্যাল অফিসার রয়েছেন।

১০ জুনিয়র কনসাল্টেন্টের মধ্যে চর্ম ও যৌন, এ্যানেসথেসিয়ার পদসহ দুটি শূন্য। বাকী আট পদের তিনজনই প্রেষণে। এ ছাড়া ইনডোর মেডিক্যাল অফিসার, প্যাথলজি মেডিক্যাল অফিসার, এ্যানেসথেটিস্ট মেডিক্যাল অফিসার, সহকারী ডেন্টাল সার্জন, ইউনানী মেডিক্যাল অফিসার ও জেনারেল মেডিক্যাল অফিসারের পদসহ ছয়টি পদ শুণ্য এবং চলতি মাস থেকে মাতৃত্বকালীন ছয় মাসের ছুটিতে গেছেন আরো একজন। কর্মরত বাকী ১০জন চিকিৎসকের মধ্যে নাইট ডিউটি, টেনিং প্রোগ্রাম, ব্যক্তিগত ছুটি কারনে অনুপস্থিত থাকতে হয় ৩/৪জন। বাকীদের অনেকেই অফিস চলাকালে ব্যস্ত থাকেন প্রাইভেট প্রেক্টিস নিয়ে বাসায়, প্রাইভেট হাসপাতাল-ক্লিনিকে বা কোনো চেম্বারে।

উপজেলার পাঁচ লক্ষাধিক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি পার্শ্ববর্তী মুরাদনগর উপজেলা ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগরসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রতিদিন প্রায় ৮-৯শত রোগী সেবা নিতে আসেন। কর্তব্যরত চিকিৎসকগণ আউটডোরে সকাল ৯টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত চিকিৎসা সেবাদানে থাকার কথা থাকলেও প্রাইভেট হাসপাতাল-ক্লিনিক ও বাসায় প্রাইভেট রোগী দেখে অফিস করেন সকাল ১০টা থেকে সাড়ে ১১টায় আর সময় দেন সাড়ে ১২টা থেকে ১টা পর্যন্ত।

এর মধ্যে প্রাইভেট হাসপাতাল ক্লিনিকের ডাক পড়লে চলে যান। এ সুযোগে সেবা নিতে আসা রোগীদের ২/৩শত বাগিয়ে নেয় দালালরা। বহিঃর্বিভাগে বাকী ৫/৭শত রোগীর সেবায় থাকেন ৩/৪ জন চিকিৎসক। ৫০ শয্যার বিপরীতে গড়ে ভর্তি রোগী থাকেন ৫৫/৬০জন।

জানা যায়, ঢাকা ক্যান্সার ইনিস্টিটিউটসহ বিভিন্ন হাসপাতালে কাজের চাপ না থাকায় অধিকাংশ চিকিৎসক নানা তদবিরে প্রেষণে যাচ্ছেন। ওখানে কর্মরত দেখিয়ে বিভিন্ন প্রাইভেট হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ব্যাক্তিগত চেম্বারেই বেশিরভাগ সময় কাটাতে পারেন।

১৮৬ অফিস কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে ৫৮টি পদ শূন্য ও প্রেষণে রয়েছে। এদের মধ্যে প্রধান সহকারী, পরিসংখ্যানবিদ, স্টোরকিপার পদসহ তিনপদ শূন্য। আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর এসএসিএমও’র একজন এবং ১০ অক্টোবরে প্রধান সহকারী-কাম-হিসাব রক্ষক ও ক্যাশিয়ার অবসরে যাওয়ার পর শূন্য হবে আরো তিনটি পদ।

মিডওয়াফারী ২টি, মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট ল্যাব ২টি, ফার্মাসিস্ট ৫টি, এসএসিএমও’র ৪টি, অফিস সহকারী-কাম-কম্পিউটার অপারেটরের ২টি, স্বাস্থ্য সহকারী ৩২টি, ওয়ার্ড বয় একটিসহ প্রেষণে আছেন এ্যাম্বুলেন্স চালক, মেডিক্যাল টেকনেশিয়ান ফিজিও, ল্যাবরেটরি এ্যাটেন্ডন্সসহ ৪ জন।

এ ছাড়া ১৫ ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভার স্বাস্থ্য ব্যবস্থা আরো শোচনীয়। পাঁচ স্বাস্থ্য উপকেন্দ্রের ও ১১এইচএফডব্লিউ কেন্দ্রে কর্মরত মেডিক্যাল অফিসার ও সহকারী সার্জন একজনও নেই। চিকিৎসক না থাকায় সাধারণ রোগীরা চিকিৎসা সেবা থেকে শতভাগ বঞ্চিত। ধামতী উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রের মেডিক্যাল অফিসার প্রায় ৬ বছর ধরে নিরুদ্দেশ। ফতেহাবাদ এইচএফডব্লিউসি’র সহকারী সার্জন ডা. হোসনে আরা আফরোজ যোগদানের পর তিনবছর ধরে বিনা অনুমতিতে নিখোঁজ রয়েছেন।

৫ ইউনিয়নের এইচএফডব্লিউ সহকারী সার্জন এবং ৩ ইউনিয়ন স্বাস্থ্য উপকেন্দ্রের মেডিক্যাল অফিসারের পদসহ ৮টি পদই শূন্য। প্রেষণে আছেন এইচএফডব্লিউ’র পাঁচ সহকারী সার্জন এবং  এক স্বাস্থ্য-উপকেন্দ্রের মেডিক্যাল অফিসারসহ ৭ জন।

এ ব্যপারে দেবীদ্বার উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আহমেদ কবির চিকিৎসক সংকটসহ নানা সমস্যা, অনিয়ম এবং অব্যবস্থাপনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, কুমিল্লা জেলার সবচেয়ে বেশী রোগী চিকিৎসা সেবা নিতে আসেন দেবীদ্বারে। সেবাদানে চিকিৎসক সঙ্কট, পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা সংকটে সুইপর, জুনিয়র কনসালটেন্ট, এনেসথেসিয়া, সার্জারি চিকিৎসক, এনেসথেসিয়া এটেন্ডর অভাবে অপারেশন থিয়েটার চালু হচ্ছে না। তেল সংকটে জেনারেটর বিকল, মেরামতের অভাবে এ্যাম্বুলেন্সটিও দির্ঘদিন পড়ে আছে।

এ ছাড়া সব চেয়ে বড় সংকট উপজেলা সদরের ২৯টি প্রাইভেট হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়গনস্টিক সেন্টার ও ঔষধ কোম্পানির দালাল এবং রিপ্রেজেন্টেটিভ। হাসপাতালকে ঘিরেই প্রায় ২শতাধিক দালাল/রিপ্রেজেন্টেটিভ রয়েছে। যারা স্থানীয়, রাজনীতিসহ নানা পেশায় যুক্ত ছিল, ওদের পুনর্বাসন কেন্দ্র হিসেবে স্বাস্থ্যকমপ্লেক্সটি ব্যবহার হচ্ছে।



মন্তব্য