kalerkantho


ধামরাইয়ে নতুন থানা চান এলাকাবাসীসহ বিশিষ্টজনরা

ধামরাই (ঢাকা) প্রতিনিধি   

১৮ আগস্ট, ২০১৮ ২০:৫৭



ধামরাইয়ে নতুন থানা চান এলাকাবাসীসহ বিশিষ্টজনরা

ঢাকার অদূরে ধামরাই উপজেলা। ঢাকা থেকে এর দূরত্ব প্রায় ৪০ কিলোমিটার। আয়তনের দিক থেকে ঢাকা জেলার পাঁচটি উপজেলার মধ্যে সবচেয়ে বড়। এর আয়তন ৩০৭.৪০ বর্গকিলোমিটার। উপজেলাটি বংশী, ধলেশ্বরী ও গাজীখালী নদী দ্বারা বেষ্টিত। এতে ১৬টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভায় ৪৩৬টি গ্রাম নিয়ে ঢাকা-২০ আসন গঠিত। এর জনসংখ্যা প্রায় ৬ লাখ। এটির উত্তরে কালিয়াকৈর ও মির্জাপুর উপজেলা, দক্ষিণে সিঙ্গাইর, পূর্বে সাভার, পশ্চিমে সাটুরিয়া, মানিকগঞ্জ ও নাগরপুর।  এই বিশাল আয়তন ও জনসংখ্যার দিক থেকে ধামরাইয়ে একটি নতুন থানা করা এখন সময়ের দাবি বলে মনে করছেন এলাকাবাসীসহ বিশিষ্ট জনেরা।
 
উপজেলার বিভিন্ন দপ্তর থেকে জানা গেছে, উপজেলার মধ্যে দিয়ে চলে গেছে এশিয়ান হাইওয়ে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক। এই মহাসড়ক দিয়ে দক্ষিণবঙ্গের যানবাহন চলাচল করে থাকে। এর সাথে কালামপুর থেকে আঞ্চলিক মহাসড়কটি সাটুরিয়া ও বালিয়া হয়ে টাঙ্গাইলের নাগরপুর ও মির্জাপুরে মিলিত হয়েছে। আঞ্চলিক মহাসড়ক দিয়ে বর্তমানে উত্তরবঙ্গের দূরপাল্লার যাত্রীবাহী পরিবহনসহ বিভিন্ন ধরনের যানবাহন চলাচল করছে। এই দুটি মহাসড়ক বর্তমানে যানবাহনের চাপে দিনরাত ব্যস্ত হয়ে পড়ছে। এতে প্রায়ই ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা। এছাড়া দুটি মহাসড়কের পাশে গড়ে উঠেছে প্রায় পাঁচ শতাধিক ছোট-বড় শিল্প-কারখানা। রয়েছে রপ্তানিমুখী কয়েকটি পোষাক কারখানা, কয়েকটি ওষধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দি একমি ল্যাবরেটরিজ, ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যাল ,আলট্রা ফার্মা ও ন্যাশনাল ড্রাগ। গাড়ি প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ইফাদ অটোস, পল্লী বিদ্যুতের দুটি জোনাল অফিস, বিসিক শিল্পনগরী, আন্তর্জাতিক জুতার কারখানা বাটা সু কম্পানি , আন্তর্জাতিক মানের সিরামিক কারখানার মধ্যে মুন্নু ও প্রতীক সিরামিকসহ কয়েকটি জুট মিল রয়েছে। রয়েছে প্রায় আড়াইশত ইটভাটা। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রায় লক্ষাধিক কর্মচারী-কর্মকর্তা চাকরি করেন। শুধু তাই নয় ধামরাই পৌরশহরসহ জয়পুরা ও কালামপুর এলাকায় ভাড়া বাসায় থেকে সাভারের ঢাকা রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণের (ডিইপিজেড)  বিভিন্ন পোষাক কারখানায় চাকরি করে থাকেন শত শত শ্রমিক। রয়েছে ৭টি কলেজ, ৩০টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ১৭১টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ১২০টি কিন্ডার গার্টেন, ১১টি দাখিল মাদ্রাসা, ১টি কামিল, ১টি ফাজিল ও একটি কওমী মাদ্রাসা, ১৭১টি মন্দির, ৫৯৫টি মসজিদ, ৯৫টি ফোরকানিয়া মাদ্রাসা, ১৬টি ব্যাংক। ৫০ শয্যাবিশিষ্ট একটি সরকারি হাসপাতালসহ ব্যক্তি মালিকানায় রয়েছে প্রায় ১৫টি ক্লিনিক। হাট-বাজার ৪০টির মধ্যে সরকারিভাবে ইজারা দেওয়া হয় ১৬টি। এছাড়া দিনদিন শিল্প-কারখানা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এছাড়া প্রতি বছর সনাতন ধর্মাবলম্বীদের উপমহাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শ্রী শ্রী যশোমাধবের রথযাত্রা ও রথমেলা হয়ে থাকে প্রায় মাসব্যাপী। রথযাত্রা ও উল্টোরথে প্রায় লক্ষাধিক লোকের সমাগম ঘটে প্রতি বছর।  গ্রামাঞ্চলের ভিতর দিয়ে ২৭২.৮২ কিলোমিটার পাকা ও ৫৮৯.৫৬ কিলোমিটার কাচা সড়ক রয়েছে। এ ছাড়াও উপজেলার কুল্লা ইউনিয়নের ফোর্ড নগর থেকে চৌহাট ইউনিয়নের মকিমপুর পর্যন্ত প্রায় ৪৮ কিলোমিটার পাড়ি দিতে সময় লাগে প্রায় দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা। সঙ্গত কারণে এসব বিবেচনায় আরেকটি নতুন থানা করার যৌক্তিকতা এখন সময়ের দাবি হয়ে উঠছে ধামরাইবাসীর কাছে। সরকারি পর্যায়ে কয়েকবার এ ব্যাপারে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। কিন্তু বাস্তবায়ন কত দূর তা বলা যাচ্ছে না। 

এও জানা গেছে, গত বছরের ৯ আগষ্ট তৎকালীন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিন প্রস্তাবিত থানার ভবন নির্মাণের ৯৮ শতাংশ খাস জায়গাও পরিদর্শন করে গেছেন। কিন্তু তা এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। 

নতুন থানার যৌক্তিকতা তুলে ধরে বতর্মান সংসদ সদস্য এম এ মালেক বলেন, বৃটিশ আমলের থানাটির বর্তমান অবস্থান যেখানে সেটি উপজেলার এক কিনারে (এক কর্নারে)। সেখান থেকে বিশাল আয়তনের মধ্যে জনগণকে দ্রুত সেবা দেওয়া পুলিশের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে। কুশুরাতে আরেকটি নতুন থানা হলে জনগণ দ্রুত সেবা পাবে এবং আইনশৃঙ্খলা ভাল থাকবে। কোনো ঘটনা ঘটলে তাৎক্ষণিক কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে সুবিধা হবে পুলিশের। চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি যাতে এ  রকারের আমলে বাস্তবায়ন করতে পারি। 

এ বিষয়ে সাবেক সংসদ সদস্য ও ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি বেনজীর আহমদ বলেন, আমি যখন এমপি ছিলাম তখন থেকেই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি একটি নতুন থানা করার। এখনো বিভিন্ন দপ্তরে যোগাযোগ করে চলছি। এ সরকারের আমলেই যাতে বাস্তবায়ন করা তা প্রত্যাশা করছি। 
 
এদিকে এ প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক আবু ছালেহ মোহাম্মদ ফেরদৌস খান বলেন, এ বিষয়ে আমি কিছু জানিনা তবে যৌক্তিকতা না বুঝে কিছু বলা ঠিক হবে না। 

এ ব্যাপারে জেলা পুলিশ সুপার শাহ মিজান শাফিউর রহমান বলেন, ধামরাই উপজেলা অনেক বড়। লোক সংখ্যাও অনেক। প্রয়োজনের তুলনায় বর্তমানে পুলিশ সদস্য কম। তাই নতুন থানা করার বেশ জরুরী হয়ে পড়েছে। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। 

জানা গেছে, জানমালের নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ধামরাইয়ে একটি থানা ও একটি পুলিশ তদন্ত কেন্দ্র রয়েছে। এতে থানাসহ পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রে কর্মরত আছেন পরিদর্শক, উপপরিদর্শক, উপসহকারী পরিদর্শক ও কনস্টেবলসহ মোট ৮৭ জন পুলিশ সদস্য। 

এ বিষয়ে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান উপজেলা বিএনপির সভাপতি তমিজ উদ্দিন বলেন, ধামরাইয়ে জনসংখ্যার তুলনায় পুলিশের সংখ্যা অনেকগুণ কম। পুলিশের ইচ্ছা থাকা সত্বেও জনগণকে অল্প সময়ের মধ্যে সেবা দিতে পারছে না শুধুমাত্র একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্ত যেতে  সময় লাগে প্রায় দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা। ফলে নতুন থানা নির্মাণ করা হলে জনগণ দ্রুত সেবা পাওয়ার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা উন্নতিও হবে।  

এ প্রসঙ্গে পৌর মেয়র গোলাম কবির মোল্লা বলেন, মানুষ নিরাপত্তা চায়। এ নিরাপত্তা দিতে পারে পুলিশ। আরেকটি থানা হলে পুলিশের সেবা পেতে দেরি হবে না। ধামরাই থানা থেকে চৌহাটের মকিমপুর যেতে সময় লাগে প্রায় দুই থেকে আড়াই ঘন্টা। এ সুযোগে অপরাধীরা ওই এলাকায় অপরাধ করে দ্রুত সটকে পড়ে। কুশুরাতে নতুন থানা হলে অল্প সময়ের মধ্যে ঘটনাস্থলে গিয়ে পুলিশ দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারবে। এ কারণে নতুন থানা করার সময়ের দাবি।  

এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবুল কালাম বলেন, জনগণের সেবা নিশ্চিত ও শিল্প-কারখানার কথা বিবেচনায় রেখে নতুন থানার যৌক্তিকতা তুলে ধরে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে অনেক আগেই। জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত ও দ্রুত সেবা পেতে এখানে আরেকটি থানার বিশেষ প্রয়োজন ।  

নতুন থানা করার যৌক্তিকতা তুলে ধরে ধামরাই থানার অফিসার ইনচার্জ মোহাম্মাদ রিজাউল হক বলেন, চৌহাট ইউনিয়নের মকিমপুর, মুন্সিচর, মনোহরপুরসহ একাধিক গ্রাম থেকে একজন দিনমজুর কোনো ঘটনাক্রমে যদি একটি জিডি করতেও থানায় আসে তাহলে তার সারাটাদিন লেগে যায়। তাই জনগণের দোড়গোড়ায় পুলিশি সেবা পৌঁছে দিতে ধামরাইয়ে আরেকটি নতুন থানার বিশেষ প্রয়োজন।  

এ বিষয়ে উপজেলা দুর্নীতি দমন প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি ও আফাজ উদ্দিন স্কুল ও কলেজের অধ্যক্ষ তোফাজ্জল হোসেন বলেন, বর্তমানে জনগণ দ্রুত সেবার প্রত্যাশা করে। স্বাস্থ্য সেবার পাশাপাশি জনগণ জীবনের নিরাপত্তার বিষয়টি  প্রাধান্য দিয়ে থাকে। বর্তমানে ধামরাইয়ের জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও নতুন শিল্প-কারখানা গড়ে উঠায় উপজেলাটি এখন ব্যস্ত এলাকা হিসেবে পরিচিত। তাই নতুন থানা করলে জনগণ দ্রুত সেবা পাবে পুলিশের কাছ থেকে। 

  



মন্তব্য