kalerkantho


হাসিলের নামে জবরদস্তি

এমরান হাসান সোহেল, পটুয়াখালী   

১৮ আগস্ট, ২০১৮ ১২:৪১



হাসিলের নামে জবরদস্তি

২০০ টাকার হাসিল নেওয়া হচ্ছে ৫০০ টাকা

পটুয়াখালীর হাটে ইজারা, ঘাটে ইজারা। কিন্তু সরকারি নিয়মনীতি মানছে না ইজারাদাররা। নির্ধারিত ফির চেয়ে দ্বিগুণ, কোথাও তিন গুণ ইজারা আদায় করা হয়। এদিকে ইজারা দিয়ে ক্ষান্ত কর্তৃপক্ষ। তাদের কোনো তদারকি নেই। হাটে-ঘাটে কোনো মূল্যতালিকার বিলবোর্ড নেই। তাই ইজারা বাহিনীর দৌরাত্ম্য ও চাঁদাবাজিতে অসহায় সাধারণ মানুষ।

হাট-বাজার
পটুয়াখালী জেলা প্রশাসকের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জেলার সব পশুর হাট থেকে প্রতিটি গরু ও মহিষের জন্য সর্বোচ্চ ২০০, ছাগল কিংবা ভেড়ার জন্য ৭৫ টাকা হাসিল (খাজনা) আদায় করতে পারবে ইজারাদার। তা ছাড়া হাট-বাজারে প্রকাশ্যে হাসিলের তালিকা বিলবোর্ড আকারে টাঙিয়ে রাখতে হবে। কিন্তু এসব নিয়ম মানছে না ইজারাদাররা। তারা যার কাছ থেকে যা পারছে, তা-ই নিচ্ছে। পটুয়াখালীর বিভিন্ন পশুর হাট ঘুরে হাসিল নৈরাজ্যের মহা উৎসব দেখা গেছে। সদর উপজেলার পশ্চিম টাউন কালিকাপুর বাঁধঘাট (হেতালিয়া বাঁধঘাট) এলাকায় পশুর হাট বসেছে। ওই হাটে মঙ্গলবার গিয়ে দেখা গেছে, সরকার নির্ধারিত হাসিলের চেয়ে দ্বিগুণ টাকা আদায় করা হচ্ছে। কামাল হোসেন নামের এক ক্রেতা ১৩ হাজার টাকায় দুটি ছোট ছোট ছাগল কেনেন। তাঁর কাছ থেকে নির্ধারিত হাসিল ১৫০ টাকার পরিবর্তে ৫০০ টাকা নেওয়া হয়েছে। কোরবানিকে কেন্দ্র করে শহরে প্রতিবছর চার থেকে পাঁচটি পশুর হাট বসে। সব হাটেই নিয়ম না মেনে হাসিল উৎসব করে ইজারাদাররা।

জেলার সর্ববৃহৎ পশুর হাট বাউফল উপজেলার কালাইয়া হাট। সপ্তাহের প্রতি সোমবার এ হাট বসে। ছাইদুল ইসলাম নামের এক ক্রেতা এ হাট থেকে ৫৬ হাজার টাকায় একটি গরু কিনলে তাঁর কাছ থেকে এক হাজার টাকা হাসিল আদায় করা হয়। তা ছাড়া এ হাটে প্রতিটি ছাগল কিংবা ভেড়ার জন্য ১০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত হাসিল আদায় করা হয়। রাঙ্গাবালী উপজেলার গোহিনখালী হাটে গরু বা ছাগল বিক্রির ক্ষেত্রে হাজারে ১০০ টাকা হিসাব করে ইজারাদার হাসিল আদায় করে। এ বিষয়ে নান্নু চৌকিদার নামের এক গরু ক্রেতা বলেন, ‘ইজারাদার হাজারে ১০০ টাকা খাজনা চায়। আমি ৫০ হাজার টাকায় গরু কেনার পর আমার কাছে পাঁচ হাজার টাকা খাজনা দাবি করে।’

একইভাবে দশমিনা উপজেলার ঠাকুরের হাট, গলাচিপার গাজীপুর ও পইক্কার হাট, রাঙ্গাবালীর গহীনখালী গরুর হাটেও ইজারা আদায়ে নিয়ম মানা হচ্ছে না।

এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক ড. মো. মাছুমুর রহমান বলেন, ‘প্রতিটি উপজেলায় একটি করে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত হবে। খাজনার বিষয়ে প্রতিটি হাটে বিলবোর্ড লাগিয়ে দেওয়া হবে। এর পরও অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেলে সঙ্গে সঙ্গে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

লঞ্চ ও খেয়াঘাট
পটুয়াখালীর ৩৩টি লঞ্চঘাটে সরকারি নিয়মের তোয়াক্কা করা হয় না। একমাত্র পটুয়াখালী শহরের লঞ্চঘাটে পাঁচ টাকা, বাকি সব ঘাটে প্রবেশ ফি তিন টাকা। কিন্তু ৩২টি ঘাটেই যাত্রীদের কাছ থেকে আদায় করা হয় পাঁচ টাকা করে। যাত্রীদের অভিযোগ রয়েছে, ঈদুল ফিতর কিংবা ঈদুল আজহার মৌসুমে ৮-১০ টাকা করেও আদায় করা হয়।

সরেজমিনে জেলার গলাচিপা উপজেলার গলাচিপা লঞ্চঘাট, পানপট্টি লঞ্চঘাট, বাউফল উপজেলার নুরাইনপুর লঞ্চঘাট, দশমিনা উপজেলার বাঁশবাড়িয়া লঞ্চঘাট ও কালাইয়া লঞ্চঘাটে গিয়ে দেখা গেছে, কোথাও প্রবেশমূল্য লেখা নেই। কিন্তু নিয়মিত পাঁচ টাকা করে আদায় করা হচ্ছে। আর ঈদ ও কোরবানির মৌসুমে যাত্রীদের ভিড় বেশি থাকায় ৮-১০ টাকা আদায় করা হচ্ছে। এসব এলাকার যাত্রীরা অভিযোগ করে, ইজারাদাররা ইচ্ছামতো টাকা আদায় করে। যারা ঘাটের নিয়ম-কানুন সম্পর্কে অবগত আছে তারা প্রতিবাদ করতে গেলে তাদের শারীরিক ও মানুষিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়। এসব কারণে কেউ তাদের অপকর্মের ব্যাপারে কিছু বলে না। আর সংশ্লিষ্ট প্রশাসনও সব জেনে নীরব থাকে। ফলে দিন দিন অনিয়ম আরো বেড়েছে।

ইজারা আদায়ের একই চিত্র পটুয়াখালীর খেয়াঘাটগুলোতে। নৌকা দিয়ে যাত্রী পারাপারে নিয়ম থাকলেও তা মানা হয় না। পারাপারের ক্ষেত্রে যাত্রীদের নৌকা ভাড়া আলাদা ও প্রবেশ ফি আলাদা রাখা হয়। কোনো খেয়াঘাটে নির্দেশিকার বিলবোর্ড নেই। 

এ বিষয়ে বাউফল উপজেলার নুরাইনপুর লঞ্চঘাটের ইজারাদার মুনিয়া এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী ফরিদ হোসেন মোল্লা দম্ভ করে বলেন, ‘নুরাইনপুর লঞ্চঘাটের প্রবেশ মূল্য সরকারি রেট তিন টাকা, কিন্তু আমি নিই পাঁচ টাকা। সারা দেশের লঞ্চঘাটের ইজারাদাররা পাঁচ টাকা করে নেয়, তাই আমিও পাঁচ টাকা নিই।’ পটুয়াখালী বিআইডাব্লিউটিএর সহকারী পরিচালক খাজা ছাদিকুর রহমান বলেন, ‘পটুয়াখালী লঞ্চঘাট বাদে বাকি ৩২টি লঞ্চঘাটের প্রবেশ মূল্য তিন টাকা করে। এ বিষয়ে কোথাও অনিয়মের অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ 



মন্তব্য