kalerkantho


ডুবে যাওয়ার আশঙ্কা

মধুমতি নদীতে ফুটো ফেরি দিয়ে চলছে যানবাহন পারাপার!

গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি   

১৬ আগস্ট, ২০১৮ ২০:০৭



মধুমতি নদীতে ফুটো ফেরি দিয়ে চলছে যানবাহন পারাপার!

আবারো মধুমতি নদীতে ফেরি ডুব যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। কালনা ঘাটের ৪ নম্বর ফেরিটির তলদেশে ছিদ্র ও উপরের অংশ ফেটে যাওয়ায় গোপালগঞ্জের কালনা ফেরির ড্রাইভার ও ইজারাদার এ আশঙ্কা করছেন। অনেকটা জোড়াতালি দিয়ে প্রতিনিয়ত পানি সেচ করে ফেরিটি চালানো হচ্ছে। ঘাটে ১৬ নম্বরের আরো একটি ফেরি থাকলেও তার ইঞ্জিনের শক্তি কম থাকার কারণে চালানো যাচ্ছে না ওই ফেরিটি। তাই বাধ্য হয়ে ঝুঁকির মধ্যে দিয়ে পারাপার করানো হচ্ছে কালনা ঘাটের শত শত যানবাহন।

জানা গেছে, প্রতিদিন নড়াইল, যশোর, সাতক্ষীরা ও বেনাপোলসহ বেশ কয়েকটি রুটের আড়াইশ থেকে তিনশ যানবাহন কালনা ঘাটের ৪ নম্বর ফেরি দিয়ে মধুমতি নদী পাড়ি দিচ্ছে। ঝুঁকির মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের পুরাতন এই ফেরি দিয়ে এসব যানবাহন পারাপার হয়ে থাকে। 

এ বিষয়ে কালনা ফেরি ঘাটের ইজারাদার মঞ্জুর হাসান কালের কণ্ঠকে বলেন, ঘাটে দুইটি ফেরি রয়েছে। ১৬ নম্বর ফেরির ইঞ্জিনের শক্তি কম থাকায় যানবাহন পারাপারের জন্য অযোগ্য হয়ে পড়েছে ফেরীটি। অন্য ৪ নম্বর ফেরীটির তলদেশের বিভিন্ন স্থানে ছিদ্র দেখা দিয়েছে। প্রতিদিন দুই-তিনবার পাম্প মেশিন দিয়ে সেচ দিতে হয়। বিগত ২০১৪ সালের ১৯ জুন রাতে একই কারণে ১৪ নম্বর ফেরীটি ডুবেছিল। এটির অবস্থাও তাই। এভাবে চলতে থাকলে আবারও যে কোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। 

তিনি আরো বলেন, ১৬ নম্বর ফেরীটি ইঞ্জিনের পাওয়ার আছে মাত্র ১৫০ হর্স পাওয়ার। বর্তমানে নদীতে যে স্রোত আছে তাতে ৪ থেকে সাড়ে ৪শ হর্স পাওয়ারের দুইটি ইঞ্জিন প্রয়োজন। তা না হলে এই ফেরীটি দিয়ে বর্তমান সময়ে কোনো কাজ হবে না। সামনে কোরবানী ঈদ। গাড়ির চাপ বাড়বে। এই অবস্থায় একমাত্র ভরসা ৪ নম্বর ফেরীটি। তাও আবার ছিদ্র ও ফাটা। চার নম্বরটি যদি কোনো কারনে ফেল করে বা দুর্ঘটনা ঘটে তাহলে ফেরী চলাচল বন্ধ হয়ে যাবে। এমনিতেই ঘাটে যখন গাড়ির চাপ হয় তখন যাত্রীরা ও চালকরা আমাদের গালাগালি করে। ঘাট সাভাবিক করতে দ্রুত একটি নতুন ফেরী ও ১৬ নম্বরের জন্য বেশী পাওয়ারের দুইটি ইঞ্জিন প্রয়োজন। তা না হলে যে কোনো সময় কালনা ঘাটে দুর্ঘটনা ঘটবে। বন্ধ হয়ে যাবে যানবাহন পারাপার।

এ প্রসঙ্গে ফেরি চালক (ড্রাইভার) নজরুল ইসলাম বলেন, ৪ নম্বর ফেরীটির বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখা দিয়েছে। তলদেশে ছিদ্র রয়েছে। ঘাটে একটি মাত্র ফেরী চালু থাকায় ধারণ ক্ষমতার চেয়ে বেশী লোড দিতে হয়। এসব কারণে ফেরীর তলদেশে আরো বেশী ছিদ্র হচ্ছে ও চালায় (উপরিভাগে) ফাটল দেখা দিয়েছে। বৃষ্টি হলে সব পানি ভিতরে ঢুকে পড়ে। দিনে দুই-তিনবার সেচ দিয়ে ফেরী চালাতে হচ্ছে। এখন ঘাটে একটি নতুন ফেরী দরকার। আর যে ১৬ নম্বর ফেরিটি রয়েছে তাতে ৩২৪ থেকে ৪৫০ হর্স পাওয়ারের ইঞ্জিন প্রয়োজন। দ্রুত ৪ নম্বরটি মেরামত করা না হলে আবারও যে কোন সময় দ–র্ঘটনা ঘটার আশংকা রয়েছে।

এ বিষয়ে ফেরির খালাসি মোঃ মোখলেচুর রহমান বলেন, কালনা ঘাটের ফেরি যানবাহন পারাপারের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। এছাড়া পল্টুন চরটির মধ্যে ৩টিই ছিদ্র। পানি ঢুকে কাত হয়ে পড়ে আছে। চারটি ঘাটের মধ্যে দুইপাশে দুইটি ভালো আর দুইটি খারাপ। গাড়ী ওঠা নামায় খুব সমস্যা হয়। কালনাঘাটে যে অবস্থা তাতে নতুন একটি ফেরী ও বেশী পাওয়ারের  ইঞ্জিন দরকার। তা না হলে যে কোনো সময় ঘাট বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

এ প্রসঙ্গে কালনা ফেরি ঘাটের সুপার ভাইজার বেল্লাল হোসেন, ড্রাইভার হাফিজুর রহমান, আলমগীর হোসেন, শ্রমিক সর্দার মোঃ  আকরাম সরদার, শ্রমিক রেজাউল শেখ, খালাসি ফায়েকুজ্জামান ফায়েক, কাজী মফিজুল ইসলামসহ বেশ কয়েকজনের সাথে কথা হলে তারা বলেন, তিন শিপটে আটজন ড্রাইভার, একজন সুপারভাইজার, দুইজন খালসিসহ মোট ২১ জন মানুষ ফেরীতে দায়িত্ব পালন করেন। এদের সবাইকে খুব কষ্ট করে ফেরী চালিয়ে রাখতে হচ্ছে। কর্তৃপক্ষকে বার বার জানানো হলেও তারা কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করছে না। এইভাবে ফেরী চালানো সম্ভব হচ্ছে না। তাই ঘাটের সমস্যা দ্রুত সমাধান করা প্রয়োজন।

কালনা ফেরি ঘাট দিয়ে প্রতিদিন পার হওয়া খান জাহান আলী পরিবহনের চালক মোঃ জিল্লুর রহমান বলেন, আমরা ভয়ে ভয়ে ফেরী পারাপার হই। ঘাটের অবস্থাও ভালো না। আর ফেরীতো ফুটো। পানি ফেলতে সেচ পাম্প বসিয়ে রাখতে হয়। নদীর স্রোতও বেড়েছে। এ অবস্থায় পারাপার হতে ভয় লাগে। কোনো বিপদ হলে গাড়িতো যাবেই। তার সাথে অসংখ্য মানুষের প্রাণও যাবে। তাই কালনা ঘাটে ফেরী সমস্যা সমাধানে কর্তৃপক্ষের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করি।  

এ ব্যাপারে সড়ক ও জনপথ বিভাগের ফেরি ডিভিশনের ফরিদপুর অঞ্চলের উপ-সহকারী প্রকৌশলী আবুল বাশার বলেন, ঘাটে যে ফেরী রয়েছে তার সব কয়টির ইঞ্জিন ভালো আছে। এখন নদীতে স্রোত বেশী হওয়ায় একটু সমস্যা হচ্ছে। ১৬ নম্বর ফেরীর জন্য বেশী শক্তির ইঞ্জিনের জন্য কর্তৃপক্ষকে বলা হয়েছে। ফেরীগুলো পুরাতন হওয়ায় একটু সমস্যা রয়েছে। তা রিপিয়ার করলে ঠিক হয়ে যাবে। তবে ফেরী ড্রাইভার, ইজারাদার ১৬ নম্বর ফেরীতে বেশী শক্তির ইঞ্জিন লাগানো এবং ৪ নম্বর ফেরীর পরিবর্তে নতুন ফেরী দেওয়ার  কথা বলেছে। বিষয়টি ফেরী বিভাগের উর্ধতন কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে। 

গোপালগঞ্জ সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ  শরিফুল আলম বলেন, ফেরী ডিভিশন ঢাকা ও ফরিদপুর বিষয়টি দেখভাল করেন। আমাদের কাজ ঘাটের দুই পাশের রাস্তা দেখা। তারপরও বিষয়টি ফেরী বিভাগে জানানো হয়েছে। আশা করি ফেরী বিভাগ সমস্যটি দ্রুত সমাধান করবেন। 

উল্লেখ্য, গত ২০১৪ সালের ১৯ জুন মাঝ রাতে বেশ কিছু গাড়ি নিয়ে ১৪ নম্বর একটি ফেরি পশ্চিম পাড়ের পল্টুনের কাছে ডুবে যায়। ডুবতে ডুবতে নেমে পড়ে যাত্রীবাহী দুই মাইক্রোবাস। অল্পের জন্য জীবনে রক্ষ পায় বেশ কয়েকজন যাত্রী। তার পর চালু করা হয় এই ১৬ নম্বর ফেরীটি। সেটির ইঞ্জিনের শক্তি কম হওয়ায় এখন সেটি বন্ধ বয়েছে। বাকী ৪ নম্বর ফেরী দিয়ে চলছে শত শত যানবাহন পারাপার।
                                                                                         



মন্তব্য