kalerkantho


কক্সবাজার সৈকতে বঙ্গবন্ধুর চিত্র প্রদর্শনী

‘সাগরের মতোই ছিল বঙ্গবন্ধুর হৃদয়’

তোফায়েল আহমদ, কক্সবাজার   

১৪ আগস্ট, ২০১৮ ২৩:০২



‘সাগরের মতোই ছিল বঙ্গবন্ধুর হৃদয়’

ছবি: কালের কণ্ঠ

কিশোরী ছাত্রী ফাহিন্না খাইরাতুন সোহা’র আদি বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। বাবা কক্সবাজারে চাকরি করেন এক হোটেলে। এই সূত্রে কন্যা সোহা সপ্তম শ্রেণিতে লেখাপড়া করছে কক্সবাজার শহরে। কিশোরী ছাত্রী সোহা প্রথম দর্শনে জাতির জনকের পবিত্র কোরান শরীফ এবং জায়নামাজের ছবি দেখেই হতবাক হয়ে বললো আমাদের গ্রামে এসব কি শুনানো হচ্ছে?  আর বাস্তবে এখানে কি দেখছি? এরকম করে মিথ্যা অপপ্রচার ওরা কিভাবে চালিয়ে যায়- জানতে চায় সোহা।

কক্সবাজার ইসলামিয়া মহিলা কামিল (অনার্স মাষ্টার্স) মাদরাসার দশম শ্রেণির ছাত্রী নুসরাত জাহান সারি সারি একের পর এক ছবি দেখে বলে- ‘এসব ছবি দেখে অনেকেরই ভুল ভাঙ্গার কথা। তবে অপপ্রচারে আমি কোনোদিন আস্থা আনিনি। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কুৎসারটনাকারী ও অপপ্রচারকারীদের বিরুদ্ধে শাস্তির দাবি জানায় নুসরাত।’ 

কক্সবাজার সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী জিনান রাওয়া জানায়- ‘আমার গ্রামের বাড়ি কক্সবাজার সদরের ঈদগাঁও এলাকায়। আমাদেরই গ্রামে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কতইনা বিভ্রান্তিমূলক অপপ্রচার চালাত কতিপয় লোক। অথচ এই লোকগুলো কি জানে না পরকালে একজন গীবতকারীর কঠিন শাস্তির বিধান রেখেছেন সৃষ্টিকর্তা।’ ছাত্রী জিননা রাওয়া বলে-বঙ্গবন্ধুর ছবি নিয়ে গ্রামে গ্রামে প্রদর্শনীর আয়োজন করা দরকার। 

জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর ছবি নিয়ে কক্সবাজারে বিশ্বের দীর্ঘতম সৈকতে মঙ্গলবার থেকে শুরু হওয়া তিন দিনব্যাপী চিত্র প্রদর্শনীতে দর্শনার্থী হিসাবে উপস্থিত কিশোরীরাই এসব প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। এত অল্প বয়সের কিশোরীদের এমনসব কথা শুনে উপস্থিত সুধীজনই হতবাক হয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর শৈশব থেকে টুঙ্গিপাড়ার সেই চির শায়িত কবরকে ঘিরে গড়ে তোলা স্মৃতি ভবনটির ছবি দেখে আবাল-বৃদ্ধ বণিতাও নিঃশ্বাস ফেলছে। এ প্রদর্শনী আগামীকাল বৃহস্পতিবার শেষ হবে।

কক্সবাজার সাগর পাড়ের লাবণী পয়েন্টের বালুচরে আয়োজন করা হয়েছে চিত্র প্রদর্শনীর। বুধবার ১৫ আগস্ট জাতির জনকের ৪৩তম শাহাদত বার্ষিকী উপলক্ষে কক্সবাজার জেলা প্রশাসন ও বীচ ম্যানেজমেন্ট কমিটি এ প্রদর্শনীর আয়োজন করে। আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন চিত্র সাংবাদিক পাভেল রহমানের নিজের তোলা ৪০টিসহ বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে শতাধিক ছবি স্থান পেয়েছে প্রদর্শনীতে। কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক ও বীচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির সভাপতি মো. কামাল হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন- ‘কক্সবাজার সৈকতে এই প্রথম এরকম ব্যতিক্রম একটি আয়োজন করা হলো। ১৯৭৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু জীবনের শেষবারের মতো এসেছিলেন কক্সবাজারে। তিনি সেই সময় সাগরের ভাঙন রোধ ও সৈকতের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য ঝাউবিথী বনায়নের নির্দেশ দিয়েছিলেন।’ 

জেলা প্রশাসক জানান, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত সেই ঝাউবিথীর রজততটে বঙ্গবন্ধুর জীবনভিত্তিক ছবি প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে। রাজধানী ঢাকা থেকে কয়েক শ মাইল দুরের এই পর্যটন শহরে ছবি প্রদর্শনীর আয়োজন করায় দেশে-বিদেশের পর্যটকরা প্রদর্শনী দেখার সুযোগ পাবেন। তেমনি স্থানীয় প্রজন্মও এই ছবি প্রদর্শনীর মাধ্যমে বিগত দিনের বিভ্রান্তিকর ইতিহাস প্রকৃত ইতিহাস খুঁজে পাবেন।

সৈকতের বালুচরে লোহার পাইপ গেঁড়ে বসিয়ে দেয়া শতাধিক ঐতিহাসিক ছবির লাইনও অনেক দীর্ঘ। আজ সকালে জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন আনুষ্ঠানিকভাবে চিত্র প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন। অনুষ্ঠানে স্থানীয় সংসদ সদস্য সাইমুম সরওয়ার কমল, কক্সবাজার জেলা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কউক) চেয়ারম্যান লে. কর্নেল ফোরকান আহমদ, পুলিশ সুপার ড. এ কে এম ইকবাল হোসেন এবং কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট সিরাজুল মোস্তফা বক্তৃতা করেন।

অনুষ্ঠানে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিচারণ করে খ্যাতিমান চিত্র সাংবাদিক পাভেল রহমান বলেন-‘বঙ্গবন্ধুর গায়ে স্যান্ডো গেঞ্জি এবং মুখে পাইপের সেই বিখ্যাত ছবিটি তুলতে গিয়ে ১৯৭৩ সালে আমি বড্ড বিপদে পড়েছিলাম। তখন আমি নিজেই একজন কিশোর। ছবিটি তোলার সঙ্গে সঙ্গেই বঙ্গবন্ধু আমাকে ধমক দিয়ে বললেন- তুমি জানো আমি কে এবং তুমি কার ছবি তুলছ?’ পাভেল রহমান বলেন, এ সময় তিনি ভয় পেয়ে যান। এক পর্যায়ে সাহস নিয়েই বলে ফেললেন- ‘আপনি বঙ্গবন্ধু।’

বঙ্গবন্ধু প্রতিত্তোরে বললেন, আমি কেবল বঙ্গবন্ধু নই একজন প্রেসিডেন্টও- একজন প্রেসিডেন্টের লুঙ্গি এবং গেঞ্জি পরিহীত ছবি কি তোলা যায়? এ জন্য তোমাকে শাস্তি পেতে হবে। তখন এডিসি ক্যাপ্টেন শরীফ আজিজ (বর্তমানে এলিট ফোর্সের এমডি)কে ডেকে বঙ্গবন্ধু তাঁর শার্টটি আনতে বললেন। শার্ট গায়ে দিয়ে বঙ্গবন্ধু বললেন, এবার তুমি আমার ছবি তুলো। পাভেল বলেন, এই হচ্ছে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু। যিনি (বঙ্গবন্ধু) সাগরের গর্জনের মতোই  গর্জে উঠেছিলেন পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে। সাগরের মতোই ছিল তাঁর হৃদয়।

পাভেল রহমানের তোলা ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোর রাতে ঘাতকের গুলিতে নিহত শিশু শেখ রাসেলের একটি রক্তমাখা স্যান্ডো গেঞ্জির ছবি, বঙ্গবন্ধুর পানির গ্লাস এবং ব্যবহার্য অন্যান্য অপ্রকাশিত ছবিগুলো দেখে দর্শনার্থীদের অনেকেই চোখের পানি ফেলছেন। সেই সঙ্গে ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরে ১৫ আগস্ট ট্র্যাজেডি থেকে বেঁচে যাওয়া জাতির জনকের দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহেনার অনেকগুলো ছবি রয়েছে- যা অনেকেরই কাছে নতুন দেখা।

কক্সবাজার সৈকতে বেড়াতে আসা রাজধানী ঢাকার মোহাম্মদপুরের ব্যবসায়ী কলিমুল্লাহ জানান- ‘খোদ রাজধানী ঢাকার বাসিন্দা হয়েও ৩২ নম্বরে যাওয়া হয়নি বিধায় অনেকগুলো ছবি আমার কাছেও অদেখা। অন্তত কক্সবাজার সৈকত দর্শনে এসে এ বিরল ছবিগুলো দেখার ভাগ্য হলো।’ কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (পর্যটন সেল) সরওয়ার আলম বলেন, ‘সৈকতের লাবনী পয়েন্টের বালুচরে এরকম চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করে যথেষ্ট সাড়া মিলছে। আমরা শহর এলাকার প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের প্রদর্শনী দেখানোর ব্যবস্থা করেছি। যাতে তারা দেশ ও জাতির প্রকৃত ইতিহাস জানতে পারে।’



মন্তব্য