kalerkantho


ঠাকুরগাঁওয়ে অনুমোদিত ডিলার ছাড়াই বিক্রি হচ্ছে এলপি গ্যাস!

ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি   

২১ জুলাই, ২০১৮ ১১:২৫



ঠাকুরগাঁওয়ে অনুমোদিত ডিলার ছাড়াই বিক্রি হচ্ছে এলপি গ্যাস!

ঠাকুরগাঁওয়ে প্রশাসনের চোখকে ফাঁকি দিয়ে অনুমোদিত ডিলার ছাড়াই পৌর শহরসহ জেলার বিভিন্ন উপজেলা ও থানার হাট বাজারে বিক্রি হচ্ছে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস সিলিন্ডার। সামান্য কিছু টাকা লাভের আশায় ব্যবসায়ীরা আইন অমান্য করে প্রকাশ্যে বিক্রি করছেন এসব দাহ্য পদার্থ। ফলে যেকোনো সময় প্রাণহানীসহ ঘটে যেতে পারে মারাত্বক বড় ধরনের দুর্ঘটনা।

এসব রোধে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাঝে মধ্যে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে অভিযান চালিয়ে অর্থদণ্ড করা হলেও তেমন একটা সুফল লক্ষ্যকরা যায়নি। জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা মনে করেন ব্যবসায়ীরা নিজেরাই সচেতন না হলে আইন করে বাধ্য করা সম্ভব নয়।

ঠাকুরগাঁও জেলায় হাতে গোনা কয়েকটি অনুমোদিত ডিলার রয়েছে। যারা নিয়মিত সরাসরি কোম্পানির কাছ থেকে গ্যাস নিয়ে স্থানীয় বাজারে বিক্রয় করেন। তাদের অনেকেই জানেন না এ গ্যাস সংরক্ষণের ব্যবহার ও বিক্রয়ের নিয়মনীতি। অধিকাংশ ডিলারের শোরুম ও গোডাউনে নেই পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র। শুধু তাই নয় কেউ কেউ হাজার হাজার গ্যাস সিলিন্ডার রাখার গোডাউন করেছেন আবাসিক এলাকায়, যা জনজীবনে খুবই ঝুঁকিপূর্ণ।

ঠাকুরগাঁও জেলা শহরের শুধু ডিলাররাই নয়, অন্যান্য উপজেলা ও থানা পর্যায়ের বিভিন্ন হাটবাজারে প্রায় দুই শতাধিক অনুমোদনবিহীন পান দোকান, মুদির দোকান, টিনের দোকান, কীটনাশক দোকান, সিমেন্টের দোকান, মনোহারী, ক্রোকারিজ, ভ্যারাইটিজ স্টোর, মোটরসাইকেল গ্যারেজেসহ ছোট ছোট অনেক দোকানে গ্যাস সিলিন্ডার প্রকাশ্যে বিক্রয় করা হচ্ছে। দোকানিরা ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে দোকানের ভিতরে ও রাস্তার পাশে গ্যাস সিলিন্ডারের পসরা সাজিয়ে রেখেছেন ক্রেতাদের দৃষ্টি পড়ার জন্য, যা সম্পূর্ণ অবৈধ।

নিয়ম অনুযায়ী গ্যাস সিলিন্ডার সংরক্ষণ ও বিক্রি করতে স্থানীয় পৌরসভা ও ফায়ার সার্ভিসের লাইসেন্স করতে হয়। কিন্তু এই জেলায় অধিকাংশ ব্যবসায়ী তা প্রয়োজন মনে করেন না। স্থানীয় এসব ব্যবসায়ীর কারোরই নেই বিক্রয়ের লাইসেন্স। আবার অনেকের এই বিষয়ে কোনো ধারনা নেই। এসব দোকানিদের গ্যাস সিলিন্ডার সংরক্ষণ ও বিক্রির উপযুক্ত পরিবেশ নেই। নেই বিস্ফোরণ অধিদপ্তরের অনুমোদন ও অগ্নি নির্বাপক যন্ত্র। 

অনুমোদনবিহীন ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় বাড়তি কিছু অর্থ লাভের আশায় ব্যবসায়ীরা অবৈধভাবে এলপি গ্যাস সিলিন্ডার গ্যাস বিক্রি করছেন। আর ক্রেতারাও হাতের কাছে পাওয়ায় পরিবহনের বিড়ম্বনা এড়াতে অনুমোদনহীন এসব দোকান থেকে গ্যাস সিলিন্ডার সংগ্রহ করছেন। এতে যেকোনো সময়ে সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়ে বড় ধরণের দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে। যেন এই জেলায় বিক্রেতাদের নিরুৎসাহিত করার কেউ নেই। উল্টো ক্রেতাদের চাহিদা দেখে তা অবৈধভাবে গ্যাস বিক্রিতে উৎসাহিত হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।

ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা পৌরসভা এলাকার হাজি পাড়ার বাসিন্দা রাজিউর রহমান জানান, পৌর শহরের হাট-বাজার ও পাড়া মহল্লার বিভিন্ন ছোট ছোট দোকানের সামনে যেভাবে এই গ্যাস সিলিন্ডার সাজিয়ে রাখা হয়েছে তাতে যেকোনো সময় সূর্যের তাপমাত্রা বেড়ে গেলে ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। এ বিষয়ে সচেতনতার জন্য তিনি তার মহল্লার দুই একজন দোকান মালিককে অবগত করলেও কেউই তার এ উপদেশ কর্ণপাত করেন নাই।

পৌরসভা এলাকার হলপাড়ার বাসিন্দা শংকর সাহা জানান, বর্তমানে সূর্যের যে তাপমাত্রা তাতে মানুষ ছাতা ছাড়া রাস্তায় দুই মিনিটও দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। অথচ শহরের প্রায় অধিকাংশ এলাকার রাস্তায় প্রচণ্ড রোদে দোকানদাররা গ্যাস সিলিন্ডার সাজিয়ে রেখেছে। এতে যেকোনো সময় গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ হয়ে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

পৌরসভা এলাকার মুন্সিপাড়ার বাসিন্দা মোহাম্মদ সাজু বলেন, এই প্রখর রোদে রাস্তায় চলতে খুব ভয় হয়।  কারণ রাস্তার পাশে গ্যাস ব্যবসায়ীরা নিজেদের ইচ্ছা মতো যেভাবে সিলিন্ডার সাজিয়ে রেখেছে তাতে এই প্রচণ্ড গরমে বড় ধরনের বিস্ফোরণের সম্ভাবনা থেকে যায়।

ঠাকুরগাঁও ভোক্তা অধিকার আন্দোলনের আহ্বায়ক কামরুল হাসান জানান, রাস্তার সামনে সাজিয়ে রেখে প্রকাশ্যে গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রি বন্ধের বিষয়ে একাধিকবার গ্যাস ব্যবসায়ী ও প্রশাসনকে অবগত করা হয়েছে। কিন্তু এ বিষয়ে কঠোর ব্যাবস্থা গ্রহণ না করায় অনেক ব্যবসায়ী নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করেই ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। তাই জনস্বার্থে বিষয়টি জেলা প্রশাসনকে গুরুত্ব সহকারে নিয়ে এ ব্যাপারে খুব দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত।

অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র, প্রয়োজনীয় সামগ্রী ও নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করেই আবাসিক এলাকায় হাজার হাজার পিস গ্যাস সিলিন্ডার সংরক্ষণ করে ব্যবসা কতটা বৈধ এ ব্যাপারে ঠাকুরগাঁও পুরাতন বাসস্ট্যান্ড বিআরটিসি মোড় এলাকার ফরহাদ ট্রেডার্সের মালিক গ্যাস ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলমের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি কোনো সদুত্তোর দিতে পারেনি।

এ ব্যাপারে বাস টার্মিনাল এলাকার আরেক বড় ব্যবসায়ী মেসার্স সরকার প্রডাক্স ও ওমারা গ্যাস এর ডিলার সুদাম সরকারের গ্যাস বিক্রয় প্রতিষ্ঠান ও গোডাউনে গিয়ে কোনো অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র পাওয়া যায়নি। নেই নিয়ম অনুযায়ী গ্যাস রাখার সুব্যবস্থা। তার পরেও তিনি প্রশাসনের চোখকে ফাঁকি দিয়ে প্রকাশ্যেই তার ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন।

এ বিষয়ে তার কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি জানান, কোম্পানির কাছ থেকে লাইসেন্স করে নিয়েছেন তিনি। গ্যাগ সিলিন্ডারের তুলনায় অগ্নি নির্বাপক যন্ত্রের সংখ্যা অনেক কম, তাই  খুব তারাতারি আরো কিছু নির্বাপক যন্ত্র ক্রয় করবেন তিনি। তার দোকানে প্রতিদিন গড়ে দুই শ থেকে তিন শ পিস গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রয় হয়। জেলার বিভিন্ন জায়গার অনেক ছোট ছোট খুচরা ব্যবসায়ী তার দোকান থেকে গ্যাস সিলিন্ডার নিয়ে বিক্রয় করে। যেসব খুচরা ব্যবসায়ী পাঁচ দশ পিস নিয়ে গিয়ে বিক্রি করে তারা দোকানে অগ্নি নির্বাপক যন্ত্র রাখে কিনা তা তিনি জানেন না। খুচরা ব্যবসায়ীদের বিক্রয় লাইসেন্স আছে কিনা তাও তিনি জানেন না।

এ ব্যাপারে আদর্শ স্টিলের মালিক ও খুচরা গ্যাস ব্যবসায়ী রমজান আলীর কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি জানান, গ্যাস বিক্রি করতে আলাদা লাইসেন্স করতে হয় এই বিষয়টি তিনি জানেন না।

পৌর শহরের প্রাণকেন্দ্র চৌরাস্তার খুচরা ব্যবসায়ী আমিনুর ইসলাম জানান, বিভিন্ন জায়গায় অনেকেই বিনা লাইসেন্সে গ্যাস সিলিন্ডার  বিক্রি করছে তাই তিনিও বিক্রি করছেন।

শহরের রোড স্টেশন এলাকার খুচরা পান দোকনদার আব্দুর রশিদ বলেন, গ্যাস সিলিন্ডার প্রতি মাত্র বিশ থেকে ত্রিশ টাকা লাভ হয়। তাই তিনি মাঝে মধ্যে কয়েকটি করে নিয়ে এসে বিক্রি করেন।

ঠাকুরগাঁও জেলা ব্যবসায়ী কল্যাণ সোসাইটি’র সাধারণ সম্পাদক মামুনর রশিদ মামুন বলেন, জননিরাপত্তার স্বার্থে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বিধি বিধান মেনে এলপি গ্যাস বিক্রি করা উচিত। নইলে অসাবধানতাবশত বড় ধরনের দুর্ঘটনায় ঘটতে পারে। তাই এই বিষয়ে জেলার সকল গ্যাস ডিলারদের সরকারি নিয়ম মেনে ব্যবসা করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এরপরও যদি কেউ অবৈধ পন্থায় ব্যবসা করে তার দ্বায়দায়িত্ব তাকেই বহন করতে হবে। এ জন্য সংগঠন কোনোভাবেই দায়ী থাকবে না।

এ ব্যাপারে ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসক মো. আখতারুজ্জামান বলেন, যেসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে লাইসেন্স ছাড়া অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণভাবে গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রি করা হচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। সেই সাথে বিক্রেতারা যাতে অবৈধভাবে দাহ্য এ গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রি না করে সেজন্য সচেতনা বৃদ্ধিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি আরো জানান, এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও সাধারণ জনগণ সচেতন না হলে আইন করে বাধ্য করা সম্ভব নয়।



মন্তব্য