kalerkantho


বল্লারটোপ আদর্শ কলেজ: এ যেন গোবরে পদ্মফুল

নড়াইল প্রতিনিধি   

২০ জুলাই, ২০১৮ ১৫:০৭



বল্লারটোপ আদর্শ কলেজ: এ যেন গোবরে পদ্মফুল

এই টিনশেড ভবনটিই তাদের একমাত্র ক্লাসরুম

যশোর বোর্ডে পাসের হার শতকরা ৬৬ ভাগ। নড়াইলে এবার এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। এবার জেলায় জিপিএ-৫ পেয়েছে মাত্র ৪৮জন। এর মধ্যে নড়াইল সরকারি ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে ৩৪জন জিপিএ-৫ পেয়েছে। অন্য দুটি সরকারি কলেজে জিপিএ-৫ শূন্য। বল্লারটোপ আদর্শ কলেজে বিজ্ঞান ও মানবিকে মোট ২ জন, গোবরা মিত্র কলেজে মানবিকে ২জন, মির্জাপুর কলেজে মানবিকে ২জন, নবগঙ্গা ডিগ্রি কলেজে বিজ্ঞানে ৩ জন, লক্ষ্মীপাশা মহিলা কলেজে মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষায় মোট ২ জন, শহীদ আব্দুস ছালাম ডিগ্রি কলেজে মানবিকে ১জন ও মুন্সি মানিক মিয়া ডিগ্রি কলেজে বিজ্ঞানে ১জন জিপিএ-৫ পেয়েছে।

ফলাফল বিপর্যয়ের মধ্যেও টানা ৫ বারে পাসের হারে জেলার সর্বোচ্চ কলেজটির নাম বল্লারটোপ আদর্শ কলেজ। ২০১৮ সালের এইচ এসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা মিলিয়ে মোট ৮৮ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিয়ে ৬৭ জনই পাস করেছেন। পাসের হার ৭৬.১৪ ভাগ, যা পাসের হারের দিক দিয়ে সর্বোচ্চ। ফলাফল বিপর্যয়ে সেরা কলেজগুলো যেখানে হিমশিম খাচ্ছে, বড় সরকারি কলেজ গুলোতে জিপিএ শূণ্য সেখানে নিভৃত গ্রামের বল্লারটোপ আদর্শ কলেজের বিজ্ঞান ও মানবিকে দুইজন ছাত্র জিপিএ ৫ পেয়েছে। গত ৫ বছর ধরেই পাসের হারে সেরা রয়েছে নিভৃত গ্রামের এই কলেজটি।

নিয়মিত ভালো ফল করে শিক্ষানুরাগী মানুষের দৃষ্টি আকর্ষনের কেন্দ্রবিন্দু তে থাকলে ও কলেজের নেই কোনো শিক্ষার পরিবেশ। মেয়েদের বাথরুম, শিক্ষকদের মিলনায়তন এমনকি নেই ছেলেমেয়েদের একসাথে বসে পাঠদানের সুযোগ। এতকিছুর মধ্যদিয়ে ও শিক্ষকদের আন্তরিকতা আর পাঠদানে কিছু নিয়মের মধ্যে রেখে অজপাড়াগায়ের এই কলেজটি এলাকায় শিক্ষার দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেও ১৬ বছরে পায়নি একটি একাডেমিক ভবন।

গ্রামের রাস্তায় কাদামাটি পেরিয়ে বিশাল মাঠের ওপারে নড়াইলের সদরের বল্লারটোপ আদর্শ কলেজ। মাঠের মধ্যে কাদামাটি পেরিয়ে ছাত্র-ছাত্রীরা কলেজের দিকে ছুটছে, ভিতরে এসে টিউবওয়েল থেকে পা ধুয়ে ক্লাসের দিকে যাচ্ছে। এখন ইংরেজি ক্লাস। হুড়মুড় করে প্রায় দেড়শ শিক্ষার্থী ঢুকে পড়লেন একটি কক্ষে, এটাই সর্ববৃহৎ শ্রেণিকক্ষ। ম্যাডাম সামিরা খানম ক্লাসরুমে ঢুকলেন, পাঠদান শুরু করলেন তখনও প্রায় ৩০/৩৫ জন শিক্ষার্থী দাঁড়িয়ে, বসার ব্যবস্থা নেই। এই অবস্থার মধ্যে শিক্ষক প্রত্যেক ছাত্রের কাছে গিয়ে পাঠ নিলেন আবার ব্লাক বোর্ডে ও শেখালেন।

কলেজে না আসলে ভালো লাগে না, ম্যাডাম আমাদের যত্ন করে পড়ান, তাই দাড়িয়ে ক্লাস করলে ও মজা লাগে-বললেন ১ম বর্ষের ছাত্র মিলন।

সামিরা খানম এই কলেজেরই ছাত্রী, এখন ইংলিশ শিক্ষিকা। তিনি বলেন, শত কষ্টের মধ্যে দিয়েও ছাত্রদের পড়ালেখার আগ্রহ তৈরী করতে পেরে আমরা আনন্দিত, যদি একটি ছাত্রীনিবাস থাকতো তাহলে জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের ছাত্রীরা এখানে এসে লেখাপড়া করতে পারতো।

২০০২ সালে বল্লারটোপ গ্রামের আলাউদ্দিন মোল্যা (প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি) সাবেক চেয়ারম্যান ফসিউর রহমান, শেখ রফিউদ্দিন, আয়ুব হোসেন মোল্যা, আ. হালিম ব্শ্বিাস, আতাউর রহমান, রেজা খান, কুমারেশ রায়সহ কয়েকজন একটি কলেজ স্থাপনের উদ্যোগ নিয়ে নিজেদের ২ একর জায়গা দান করেন। অজোপাড়াগায়ে কলেজ স্থাপনে বাধা-অন্য ইউনিয়নের প্রভাবশালীরা। নানা চড়াই উৎরাই পেরিয়ে ২০০৪ সালে এমপিও ভুক্ত হয় কলেজটি। এরপর প্রতিবছর শিক্ষার মান ঠিক রেখে পাসের হার নব্বই এর উপরে রাখছে জেলার সবচেয়ে অবহেলিত এই কলেজ। 

একমাত্র টিনশেডে চলে ক্লাস। সিলিং ছাড়া টিনের চালে প্রচণ্ড গরমে হাসফাস আর বর্ষায় পানি পড়ে ভিজে চলে ৩’শ শিক্ষার্থীর ক্লাস। প্রাইমারি স্কুলের মতো লম্বা একচিলতে ক্লাসরুমে ভাগ করে চলে বিজ্ঞান, মানবিক আর বাণিজ্য বিভাগের লেখাপড়া।

৩’শ শিক্ষার্থী আর ২৩ শিক্ষকের জন্য কলেজের পিছনের বাগানের ভিতর দুটি বাথরুমের একটি নষ্ট, বাথরুমে গেলে ছাত্রীদের দল বেধে লাইনে দাড়িয়ে সারতে হয় প্রাকৃতিক কাজ, আর ছাত্ররা বাগানের মধ্যেই। কলেজের প্রায় দু’শ ছাত্রীর জন্য নেই কোন কমনরুম, এক ক্লাস শেষে অন্য ক্লাসে যাওয়ার আগের সময়টুকু কাটানোর মতো কোনো দাঁড়াবার যায়গাও নাই।

এইচএসসি পাস করা মানবিক বিভাগের ছাত্রী শারমিন স্বরি জানায়, বাথরুমে যেতে আমাদের ভয় লাগে, প্রায়ই পাসের একটি বাড়িতে বাথরুমে যাওয়া নিয়ে গণ্ডগোল লেগে থাকে। মেয়েদের সমস্যার সময়ে অনেকে কলেজে আসে না।

কলেজের ১৭ পুরুষ আর ৬ নারী শিক্ষকের জন্য নেই কোনো মিলনায়তন। ১০ ফুটের এক চিলতে রুমে ২৩ জন শিক্ষকের গাদাগাদি বসা। প্রিন্সিপ্যালের সাথে বসে মিটিং করতে গেলে জুনিয়র শিক্ষকদের পিছনে দাঁড়িয়ে শুনতে হয়। এক ক্লাস থেকে আরেক ক্লাসে আসা যাওয়ার পথে অধিকাংশ সময়ে জুনিয়র শিক্ষকদের দাঁড়িয়ে থেকে আবার নতুন ক্লাসে ঢুকতে হয়।

ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের শিক্ষিকা তন্দ্রা বায় বলেন, নির্ধারিত ক্লাসের জন্য যে একটু প্রস্তুতি নেব সেই অবস্থা নেই। নিজের বসারই জায়গা পাই না। আমাদের কোনো রকমে গাদাগাদি করে বসতে হয়। নড়াইলের কোনো কলেজের বোধ হয় এমন দৈন্যদশা নেই। তারপরও আমাদের এখানে পড়ালেখার পরিবেশ ভালো বলে মানসিক প্রশান্তি আছে। তাই শত কষ্টের মধ্যে দিয়ে ও আমরা কাজ করে যাচ্ছি।

চলতি বছরে এইচএসসি পাস করা আরেফিন জমাদ্দার, মেহেরুন নেছা মুক্তা জানায়, সরকারি কলেজে ঠিকমতো ক্লাস না হলে ও একদিন কলেজে না আসলে আমাদের স্যারেরা বাড়িতে ফোন করে খোঁজ নেন। স্যারেরা আমাদেরকে একেবারে পরিবারের মতো দেখেন, প্রত্যেককে আলাদাভাবে চেনেন।

এখানে রয়েছে শিক্ষকদের মূল্যায়ন ব্যবস্থা। প্রতিদিন একটি করে ক্লাসে গিয়ে প্রিন্সিপ্যাল ছাত্রদের কাছ থেকে শিক্ষকদের পড়ালেখা, আচরণ, মনোযোগী হবার ব্যাপারে খোঁজ নেন। এভাবে সপ্তাহের সাত দিনের তদারকির ফলাফল সাপ্তাহিক শিক্ষকদের সভায় উপস্থাপন করেন। নিয়মিত টিউটোরিয়াল পরীক্ষা, বছরে ৪টি ইনকোর্স পরীক্ষা নেবার ফলেই ছাত্রদের প্রায় সব পড়ালেখাই কলেজে করানো হয়। যেসব ছাত্ররা কলেজে আভ্যন্তরীণ পরীক্ষায় খারাপ ফলাফল করে তাদের ব্যাপারে অভিভাবকদের নিয়ে আলোচনায় বসেন। আলাদাভাবে নজর দেওয়া হয় সেসব ছাত্রদের প্রতি। কোনো ছাত্র খারাপ ফল করলে ফলাফল খারাপের বিষয়গলো শিক্ষকেরা নিজ উদ্যোগে দেখিয়ে দেন।

শিক্ষক দেদার মাহমুদ তুষার বলেন, কোনো শিক্ষক কিভাবে পড়াচ্ছি, শ্রেণিকক্ষে না বুঝিয়ে ক্লাস ফাকি দিয়ে চলে আসছি কিনা এগুলো তদারক করেন অধ্যক্ষ। আমাদের ভুল থাকলে তা শুধরে দেন। পরীক্ষার আগে রাতে ছাত্রদের বাড়ি গিয়ে লেখাপড়ার খবর নিতে হয় প্রিন্সিপ্যাল এর সাথে থেকে। নিয়মিত তদারকির কারনে শিক্ষার্থীরা অত্যন্ত মনোযোগী।

সমাজ বিজ্ঞানের শিক্ষক সাইফুল ইসলাম বলেন, মাধ্যমিকে জিপিএ-৫ পাওয়া ছাত্ররা বড় কলেজে ভর্তি হয়। উচ্চ মাধ্যমিকে জিপিএ সংখ্যা কমে যায়, আমাদের এখানে জিপিএ ৪ নিয়ে ভর্তি হয়ে তারাই জিপিএ ৫ পায়। ভালো ফলাফলের শীর্ষে অবস্থান করেও আমাদের কোনো একাডেমিক ভবন নেই। এভাবে অবহেলায় আর কতদিন চলবে।

কলেজের অধ্যক্ষ এম এম সাঈদুর রহমান বলেন, শত কষ্টের মধ্যে আমরা এই কলেজের লেখাপড়ার মান ভালো করার চেষ্টা করছি। এখানকার সকল শিক্ষকই অত্যন্ত মেধাবী। তাদের নিরলস চেষ্টাও উপযোগী পাঠদানের ব্যবস্থা ভালো ফলাফল এনে দিয়েছে। কলেজের উন্নয়নে বারবার বিভিন্ন মহলে ধন্না দিয়ে ও কাজ হয়নি। শিক্ষার পরিবেশ বজায় রাখতে ন্যূনতম একটি একাডেমিক ভবন  দরকার।

নিজের ইউনিয়নে এমন কলেজ নিয়ে গর্ব করেন বাঁশগ্রাম ইউপি চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম বলেন, শত কষ্টের মধ্য দিয়ে আমার ইউনিয়নের কলেজটি এত ভালো ফলাফল করেছে এত আমরা গর্বিত। আমি আমার সাধ্যমতো এই কলেজটির উন্নয়নে কাজ করে যাবো।

সরকারি কলেজের মতো নেই ন্যূনতম কোনো সুযোগ সুবিধা। স্থানীয় মেধাবী একঝাক শিক্ষকদের দক্ষতায় পরিচালিত কলেজটি শুরু থেকেই ধারবাহিক ভাবে ভালো করে যাচ্ছে। কলেজটির লেখাপড়ার মান নিয়ে এলাকাবাসী এখন গর্ববোধ করে।



মন্তব্য