kalerkantho


রাজৈর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স

নানা সমস্যায় মুখ থুবড়ে পড়েছে স্বাস্থ্যসেবা

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

২১ জুন, ২০১৮ ১৯:৫৭



নানা সমস্যায় মুখ থুবড়ে পড়েছে স্বাস্থ্যসেবা

নানা অব্যাবস্থাপনা, অনিয়ম ও জনবল সংকটের কারণে মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে  স্বাস্থ্যসেবা মুখ থুবড়ে পড়েছে। বহুমুখী সমস্যার সমাধানের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ না থাকায় 'সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা'- প্রধানমন্ত্রীর এই অঙ্গিকার বাস্তবায়ন কার্যত হুমকির মুখে পড়েছে। এর ফলে রাজৈর উপজেলার প্রায় ৪ লাখ মানুষ স্বাস্থ্যসেবার সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলে একাধিক সূত্রে জানা গেছে। 

খোজ নিয়ে দেখা গেছে, রাজৈর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসকসহ জনবল সংকট, আধুনিক যন্ত্রপাতি অযত্নে-অবহেলায় নষ্ট হওয়া, একাধিক স্টাফ আমেরিকা প্রবাসী, অনুপস্থিত স্টাফের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া, হাসপাতালে দালালদের দৌরাত্ব, চিকিৎসকদের ক্লিনিকে সময় দেওয়াসহ নানা সমস্যায় এই উপজেলার মানুষ চিকিৎসা সেবা ঠিকমতো পাচ্ছে না।

হাসপাতাল, এলাকাবাসী ও সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে, রাজৈর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ৫০ বেডের হাসপাতাল হলেও ৩১ বেডের জনবল দিয়ে চলছে সকল কার্যক্রম। ৫০ বেডের অবকাঠামো থাকলেও কার্যক্রমের কোনো অনুমোদন নেই। ৩১ বেডের কার্যক্রমেও রয়েছে নানা অসঙ্গতি, ওষুধ সংকট, যন্ত্রপাতিসহ আনুষাঙ্গিক সরমঞ্জাদির অভাবে চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা। 

আরো জানা গেছে, ক্যাটাগরি অনুযায়ী ১৬৪টি পদের পদায়ন থাকলেও হাসপাতাল কাজ করছেন মোট ১২৫ জন। বাকী ৩৯ পদ দীর্ঘদিন ধরে শূণ্য রয়েছে। এর মধ্যে আবার কেউ-কেউ পেসনে কাজ করছে অন্যত্রে। তারা মাসে একবার এসে বেতন নিয়ে যায়। প্রায় ৭ মাস ধরে আবাসিক মেডিক্যাল অফিসারের পদ শূণ্য রয়েছে। শূন্য রয়েছে জুনিয়র কনসালটেন্ট (সার্জারী), সিনিয়র নার্স ২ পদটিও। আর উচ্চতর প্রশিক্ষণের নামে পেসনে অন্যত্রে আছেন মেডিক্যাল টেকনোলজিষ্ট। এ ছাড়াও বিভিন্ন দুর্নীতির মামলায় বরখাস্ত  হওয়া প্রধান সহকারি কাম হিসাব রক্ষক পদ, অফিস সহকারি কাম কম্পিউটার অপারেটর ২টি, ভান্ডার রক্ষক ১টি, সহ-সেবক ১টি, স্বাস্থ্য পরিদর্শক ৩টি, সহস্বাস্থ্য পরিদর্শক ২টি, স্বাস্থ্য সহকারি ১১টি, উপজেলা স্বাস্থ্য  কেন্দ্রের বয় ২টি,  ঝাড়ুদার ১টি, ইউএসসি ৫টি, এমএলএসএস ১টি, ফার্মাসিষ্ট ১টি, উপ-সহকারি কমিউনিটি মেডিক্যাল  অফিসার (স্যাকমো) ২টি পদ শুন্য রয়েছে। তা ছাড়াও হ্যাপী আক্তার নামে একজন উপ-সহকারি কমিউনিটি মেডিক্যাল অফিসার (স্যাকমো) অনুপস্থিত রয়েছেন। 

এ ব্যাপারে নাম না প্রকাশের শর্তে হাসপাতালের কয়েকজন স্টাফ জানায়, হ্যাপী আক্তার বিয়ের পর স্বামীর সাথে আমেরিকা চলে গেছেন। 

তারা আরো জানায়, উপজেলার খালিয়া, ইশিবপুর, কবিরাজপুর, পাইকপাড়া  ও বদরপাশা ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রের সহকারি সার্জনের (মেডিক্যাল অফিসার) ৫টি পদ শূণ্য আছে। আর আমগ্রাম ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রের সহকারি সার্জন অনুমতি না নিয়ে এক বছর ধরে অনুপস্থিত রয়েছেন। শোনা যাচ্ছে তিনিও সপরিবারে আমেরিকা প্রবাসী। 

হাসপাতাল সূত্রে আরো জানা যায়, হাসপাতালে অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে দুটি। ড্রাইভার একজন। অ্যাম্বুলেন্স দুটি থাকলেও জ্বালানী বরাদ্ধ রয়েছে একটির। ফলে দুটি অ্যাম্বুলেন্সের সুবিধা পাচ্ছে না মুমূর্ষূ রোগীরা। হাসপাতালের মূল্যবান ও আধুনিক এক্স-রে মেশিনটি রোগীদের কোনো কাজে আসছে না। মেশিনটি দীর্ঘ সাত বছর ধরে বাক্সবন্দি হয়ে পড়ে আছে। ২০১৪ সালে ৪ জুন এক্স-রে মেশিনটি একটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে স্থাপনের নিয়ম থাকলেও এটিকে একটি স্যাতস্যাতে রুমে স্থাপন করা হয়। ওই রুমে বৃষ্টি হলেই ছাদ চুঁইয়ে ও ওয়াল বেয়ে পানি পড়ে। ফলে স্থাপনের পর থেকেই মেশিনটি মাঝে মাঝে বিকল হয়ে যেত এবং গত ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বিকল হয়ে আজো অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। এদিকে
হাসপাতালের জেনারেটরটিও জালানীর অভাবে বন্ধ। বিদ্যুৎ চলে গেলে অন্ধকারে থাকতে হয় রোগীদের। 

এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৪ বছর আগে নির্মিত কমিনিউটি ক্লিনিকগুলো ব্যবহার অযোগ্য হয়ে পড়েছে। ভবনগুলোর দেয়াল ও ছাদের পলেস্তার খুলে পড়ে গেছে। গেট ভেঙ্গে পড়েছে। নলকূপ ও শৌচাগার অকেজো হয়ে আছে। এই উপজেলায় ২১টি কমিনিউটি ক্লিনিকের মধ্যে ১৩টিতেই বিদ্যুৎ সংযোগ নেই। 

আরো জানা গেছে, পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের অবস্থা আরো নাজুক। ২০০২ সালে রাজৈর উপজেলার ২টি ইউনিয়নের অংশ বিশেষ নিয়ে হরিদাসদী-মহেন্দ্রদী নামে একটি নতুন ইউনিয়ন গঠিত হয়। কিন্ত্র এই নতুন ইউনিয়নে কোনও জনবল পদায়ন করা হয়নি। রাজৈর পরিবার পরিকল্পনা বিভাগে ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারী থেকে পরিবার পরিকল্পনা অফিসারের পদ এবং ৫ বছর ধরে সহকারী পরিবার পরিকল্পনা অফিসারের পদসহ পরিবার কল্যাণ সহকারী ৫৭ পদের ২৯, পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শিকা ১০ পদের ২, পরিদর্শক ১০ পদের ২টিসহ নার্স ও পিওন পদ শূণ্য রয়েছে। এই বিভাগের নিজস্ব কোনও ভবন নেই, আছে শুধু একটি স্টোর রুম। 

চিকিৎসা নিতে আসা রোগী সেফালী বেগম, আনোয়ার শিকদার, মতিন রহমান, মুকুলসহ অনেকেই বলেন, রাজৈর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নানা সমস্যা থাকলেও প্রতিদিন আউটডোরে দুই শতাধিক রোগী ও ইনডোরে ৬০/৮০ জন রোগী চিকিৎসা সেবা নেয়। ওষুধ সংকট লেগেই থাকে। ফলে ব্যাঙ্গের ছাতার মত গজিয়ে ওঠায় ক্লিনিকগুলি ও বিভিন্ন ফার্মেসীতে ভুয়া ও নিম্নমানের ডাক্তারদের দৌরাত্ম্য এই উপজেলায় বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে রোগীরা প্রতিনিয়তিই প্রতারণার শিকার হচ্ছে।

এ ব্যাপারে রাজৈর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা অফিসার ডা. প্রদীপ চন্দ্র মন্ডল বলেন, '৩১ বেডের ঘাটতি জনবল দিয়ে ৫০ বেডের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি এবং নানা সমস্যার মধ্যেও রোগীদের চিকিৎসা সেবা দিয়ে যাচ্ছি। প্রয়োজনীয় জনবল পেলে রাজৈরের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা আরো উন্নত করা যায়। আর জেনারেটরটি মেরামত করে চালু করা সম্ভব হলেও জ্বালানী তেলের বরাদ্ধ না থাকায় জেনারেটর চালু করা সম্ভব নয়।'



মন্তব্য