kalerkantho


আজ নড়াইলের ইতনা গণহত্যা দিবস

নড়াইল প্রতিনিধি   

২২ মে, ২০১৮ ২১:১৮



আজ নড়াইলের ইতনা গণহত্যা দিবস

আজ ২৩মে  নড়াইলের ইতিহাসে এক ভয়াল দিন। ১৯৭১ সালের এই দিনে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাক হানাদার বাহিনী লোহাগড়া উপজেলার ইতনা গ্রামে ঢুকে একের পর এক বাড়িঘর লণ্ড ভণ্ড করে জ্বালিয়ে দেয়। নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করে ৪২জন নিরীহ মানুষকে। আর এসব নিহতের লাশ ঘরবাড়ির জ্বলন্ত আগুনে ফেলে উল্লাসে মেতে ওঠে তারা। এমন বিভৎস ঘটনা ঘটলেও শহীদদের স্মরণে স্বাধীনতার ৪৮ বছরেও সেখানে সরকারি উদ্যোগে কোন স্মৃতিস্তম্ভ গড়ে ওঠেনি। পরিবারের আয়ক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে বছরের পর বছর বাকি সদস্যরা দুর্দশা আর অবহেলার মধ্যে দিয়ে দিন কাটচ্ছে। আজো সেই গণহত্যার স্বাক্ষী হয়ে আছে ইতনা গ্রাম আর মধুমতি নদী।    

মধুমতি নদীর পাড়ে ইতনা গ্রাম। নদীর ওপারে গোপালগঞ্জের ভাটিয়াপাড়া পাকিস্তানি আর্মি ক্যাম্প। এপারে মুক্তিকামী লোকেরা এলাকা ছেড়ে বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযুদ্ধে নাম লেখাতে চলে গেছে। মুক্তিপাগল  ইতনা গ্রামের পাশের চরভাটপাড়া গ্রামের অনিল কাপালী কয়েকদিন ওত পেতে থেকে সুযোগ বুঝে ২২ মে রাতে একজন পাক সেনার কাছ থেকে একটি অস্ত্র কেড়ে নিয়ে ঝাঁপ দেন মধুমতি নদীতে। অনিল ইতনা গ্রামে অবস্থান করছেন এমন খবরে পরদিন ভোরে  ভাটিয়াপাড়া ক্যাম্প থেকে পাকস্তানি বাহিনী মধুমতি নদী পাড়ি দিয়ে গানবোটযোগে হাজির হয় ইতনায়। ফজরের  নামাজের আগেই  শুরু করে ধর্ষণ, লুটতরাজসহ নারকীয় তাণ্ডব। ফজরের নামাজ পড়া অবস্থায় এবং কোরান তেলাওয়াতের সময়ও লোকজনকে ঘর থেকে টেনে হিচড়ে বাইরে এনে নির্মমভাবে হত্যাযজ্ঞ চালায়।  

গ্রামের মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প তখনো ভালোভাবে গড়ে ওঠেনি, কিছু মুক্তিযোদ্ধা পাক বাহিনীকে মোকাবেলায় এগিয়ে আসেন কিন্তু সেদিন পাক সেনাদের ভারী অস্ত্রের মোকাবেলায় ব্যর্থ হন মুক্তিযোদ্ধারা। সারা দিনে আর্মির ভয়ে কবর দেওয়া হয়নি গনহত্যায় নিহতদের। রাতে দাফন ছাড়াই অন্ধকারে কোনো রকমে মাটি দেওয়া হয়েছে। এমনকি একসঙ্গে চারজনকেও কবর দেওয়া হয়েছে । 

এলাকার মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্য মিলন ঘোষ জানান, সে দিনের ভয়াবহ স্মৃতির কথা মনে করতে চাই না। ঘর ছেড়ে প্রাণের ভয়ে বেত ঝোপের মধ্যে লুকিয়ে ছিলাম। আর্মিরা মুসলমানদের মারবে না বলে ঘোষণা দেয়, কিছু মুরুব্বি লোক ঘরে ফিরে যায় কিন্তু তাদের নির্বিচারে গুলি করে মেরে ফেলে আগুনে নিক্ষেপ করে। ভোরে কুরআন শরীফ পড়া অবস্থাও কয়েকজনকে মেরেছে হানাদার রা।

এলাকার মুক্তিযোদ্ধা রফিউদ্দীন শেখের ছেলে চা দোকানদার পজু  শেখ তার পরিবারের দূর্দশার কথা বলতে গিয়ে কেদে ফেলেন । তিনি আক্ষেপ করে বলেন,  মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্যরা  দীর্ঘ বছরে  ভিক্ষা করে  দিন কাটালেও তাদের সহযোগিতায়  স্থানীয়  মেম্বার থেকে এমপি কেউই  এগিয়ে আসেননি। চরম অভাব আর সীমাহীন দুর্দশার মধ্যে দিয়ে কাটাছে তাদের দিন। এখনো বাবার মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি মেলেনি।

ওইদিনের গণহত্যায় নিহতদের পরিবারের ক্ষোভ, স্বাধীনতার যুদ্ধের কারণে মারা যাওয়া তাদের  বাবা-চাচাদের  কবরের ব্যাপারে সরকারী কোনও উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। কোনও স্মৃতি স্তম্ভ নির্মাণ করা হয়নি। তারা আশা করেছিলেন, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের আওয়ামী লীগ  সরকার  শহীদ পরিবারের খোঁজ নেবেন । 

গণহত্যায় নিহত আফসার আলী, নওশের আলী, আফসার আলী, আজাহার আলী-এ ৪ ভাইয়ের মধ্যে জীবিত মুক্তিযোদ্ধা নওয়াব আলী ক্ষোভের সাথে বলেন , প্রতি বছরই ২৩ মে আসলে সাংবাদিকরা তোড়জোর শুরু করেন কিন্তু এতে কর্তৃপক্ষের কারো টনক নড়ে না। এসব শহীদদের কারও নামই মুক্তিযোদ্ধা কিম্বা শহীদ তালিকায় স্থান পায়নি। ব্যক্তি উদ্যোগে কেবলমাত্র একটি নাম ফলক তৈরি করা হয়েছে। আমাদের আশা ছিলো, মুক্তিযুদ্ধের সরকার অন্তত শহীদ স্বীকৃতি দিবেন আর গণকবরগুলো চিহ্নিত করেবন।

ইতনা স্কুল এন্ড কলেজের শিক্ষক ফিরোজ আহম্মদ জানান, গণহত্যার শিকার ৪২টি শহীদ পরিবারের সদস্যরা বর্তমানে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। শহীদের স্মরণে আজ পর্যন্ত সরকারি ভাবে কোনও ‘স্মৃতিস্তম্ভ ’ নির্মিত হয়নি। 

লোহাগড়া উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ফকির মফিজুল ইসলাম, মুক্তিযুদ্ধে নড়াইল জেলায় সবচেয়ে বড় গণহত্যা হয় ২৩ মে ইতনাতে। গণহত্যায় নিহত ৪২ পরিবারের লোকেরা তাদের স্বজন হারিয়ে অত্যন্ত দীনহীন ভাবে চলছে। অনেক চেষ্টা আর তদ্বির করে ও আমরা গণহত্যায় নিহতদের শহীদ স্বীকৃতি দিতে পারিনি। মুক্তিযুদ্ধে নিজেদের জীবন ত্যাগ করা এ সকল বীরদের সন্মান জানানো উচিত এবং গণহত্যায় নিহতদের শহীদ স্বীকৃতি দেওয়া হোক।

শহীদদের স্মরণে গ্রামে সরকারি উদ্যোগে পাঠাগার আর স্মৃতিফলক নির্মাণের দাবি নতুন প্রজন্মের। গণহত্যায় নিহতদের রাষ্ট্রীয়ভাবে শহীদ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদানের দাবি মুক্তিযোদ্ধাসহ এলাকার মানুষের।

ইতনা গণহত্যা দিবস উপলক্ষে আজ মঙ্গলবার ইতনা গ্রামবাসীদের উদ্যোগে দিনব্যাপী নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। কর্মসূচির মধ্যে ছিল শহীদ বেদীতে পুস্পমাল্য অর্পণ, স্মরণ সভা ও দোয়া মাহফিল।



মন্তব্য