kalerkantho


সাভার ট্র্যাজেডি

জীবনের কালো মেঘ কাটেনি মিঠাপুকুরের মেঘলার

রংপুর অফিস   

২৪ এপ্রিল, ২০১৮ ২১:২১



জীবনের কালো মেঘ কাটেনি মিঠাপুকুরের মেঘলার

সাভার ট্রাজেডিতে স্বামীকে হারিয়েছেন। ওই দুর্ঘটনায় আহত অবস্থায় ৩৪ ঘণ্টা পর উদ্ধার হলেও সৌভাগ্যবশত বেঁচে যাওয়া মেঘলা আক্তারের জীবনের কালো মেঘ এখনও কাটেনি। জীবনে আর বিয়ে করা হয়নি তার। গত কয়েক বছর ধরে তিনি রংপুরের মিঠাপুকুরে অবস্থান করে জীবিকার প্রয়োজনে দর্জ্জির কাজ করছেন। ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সাভারের রানা প্লাজার দুর্ঘটনায় আহত হয়েছিলেন মেঘলা। ওই ঘটনায় নিহতদের তালিকায় রয়েছে তার স্বামী আব্দুল বাতেনের নামও। ঘটনার পর সরকারি- বেসরকারিভাবে পাওয়া সাহায্যের টাকায় বাড়িতে তিনটি পাকা ঘর তুলেছেন তিনি। ছোট পরিসরে একটি গরুর খামারসহ লীজ নিয়ে জমি চাষাবাদ করছেন সংগ্রামী এই নারী। তারপরও বছর ঘুরে এই দিন এলে ভয়াবহ সেই স্মৃতিগুলো এখনও কালো মেঘ হয়ে দেখা দেয় মেঘলার জীবনে।

জানা গেছে, মিঠাপুকুরের বাসিন্দা চাঁন মিয়ার তিন মেয়ে ও এক ছেলের মধ্যে সবচেয়ে ছোট মেঘলা আক্তার। মেঘলাকে ২০১১ সালের শেষের দিকে মাঝগ্রাম মাঠেরহাট গ্রামের রফিক উদ্দিনের ছেলে আব্দুল বাতেনের সাথে বিয়ে দেন তিনি। অভাবের সংসারে বাড়তি আয়ের রোজগারে বিয়ের তিন মাসের মাথায় মেঘলা-বাতেন দম্পতি পাড়ি জমান ঢাকার সাভার এলাকায়। রানা প্লাজায় একই ফ্লোরে কাজ নেন তারা। বছর খানেক সেখানে কাজ করার পর তাদের জীবনে নেমে আসে সেই কালো মেঘ।

বিভিষিকাময় সেই দিনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে মেঘলা জানান, দুর্ঘটনার দিন তিনি বেশ অসুস্থ ছিলেন। তারপরও মাসের শেষ সময়ে অফিসে না গেলে বেতন পাবেন না, তাই দুজনই সকাল সাড়ে আটটার দিকে ঢোকেন কর্মস্থল রানা প্লাজায়। মেঘলার সামনের একটি টেবিলের আগেরটিতে কাজ করেন বাতেন। সকাল পৌনে নয়টার দিকে বাতেনকে ওষুধ আনতে বলেন মেঘলা। প্রতিউত্তরে হাতের কাজগুলো সেরে ক্যান্টিনে গিয়ে ওষুধ নিয়ে আসবেন বলে জানান বাতেন। এর কিছুক্ষণ পরেই একটি শব্দ শুনতে পান তারা। সবাই ছোটাছুটি শুরু করে দেন। নিভে যায় সব আলো। শুধু চিৎকার-চেঁচামেচি। অজ্ঞান হয়ে যান মেঘলা। যখন জ্ঞান ফিরে আসে, তখন তিনি কোথায় আছেন বুঝতে পারছিলেন না। শুধু অনুভব করতে পারেন তার পাগুলোর ওপরে ভারি কি যেন পড়ে আছে। উদ্ধারকর্মীরা যখন মেঘলার ফ্লোরে টর্চলাইট ও অক্সিজেন দেন তখনই মেঘলা দেখতে পান তিনি শুয়ে আছেন কয়েকজন মৃত মানুষের শরীরের ওপর। আবারও অজ্ঞান হয়ে যান তিনি।

জানা গেছে, দুর্ঘটনার ৩৪ ঘণ্টা পর মেঘলাকে ধ্বংসস্তুপ থেকে উদ্ধার করা হয়। নিয়ে যাওয়া হয় এনাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে জ্ঞান ফেরার পর খোঁজ করতে থাকেন স্বামী বাতেনের। স্বজনরা তাকে জানান বাতেন সুস্থ আছেন। এরপরে মেঘলাকে রংপুরে নিয়ে আসা হয় একটি অ্যাম্বুলেন্সে করে। ওই অ্যাম্বুলেন্সে মেঘলার পাশে রাখা ছিল বাতেনের কফিন। কিন্তু ওদিকে খেয়াল নেই মেঘলার। বাড়িতে এসে কফিন খোলার পর দেখতে পান স্বামী বাতেনের লাশ। আকাশ যেন ভেঙ্গে পড়ে তার মাথার ওপর। হাউমাউ করে কেদে ওঠেন মেঘলা।

মেঘলা বলেন, 'ওই দুর্ঘটনার পর বছরখানেক চিকিৎসা নিয়ে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠি। অনুদানের টাকায় স্বামীর কুলখানিসহ তাঁর স্মৃতি আঁকরে ধরে উন্নয়নের চেষ্টা করি। বর্তমানে কিছুটা স্বচ্ছল জীবনযাপন করলেও ওই দুর্ঘটনায় স্বামী হারানোসহ কষ্টের স্মৃতিগুলো আমাকে আজও কাঁদায়।' 

মেঘলার বাবা চাঁন মিয়া বলেন, মেঘলা এখন মোটামুটি সুস্থ। তবে মানসিকভাবে সে এখনও সুস্থ হতে পারেনি। তিনি বলেন, মেঘলাকে বিয়ে দেওয়ার কয়েকবার চেষ্টা করেছি। কিন্তু সে রাজি হয়নি। স্বামীর স্মৃতিগুলো নিয়েই বেঁচে থাকতে চায় সে। 

মিঠাপুকুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মামুন-অর-রশীদ বলেন, সাভার ট্রাজেডিতে আহত ও নিহতদের তালিকায় এখানকার অনেকের নাম রয়েছে। এসব পরিবারগুলোর খোঁজ-খবর নেওয়া হচ্ছে।

 



মন্তব্য