kalerkantho


পার্বতীপুরে হরিজনদের দুর্দিন যাচ্ছে

আবদুল কাদির, পার্বতীপুর (দিনাজপুর)    

২৪ এপ্রিল, ২০১৮ ১৫:১৪



পার্বতীপুরে হরিজনদের দুর্দিন যাচ্ছে

দিনাজপুরের পার্বতীপুরে বসবাসরত হরিজনদের দিনকাল এখন ভালো যাচ্ছে না। চরম দুর্দিন যাচ্ছে তাদের। সরকারি বেসরকারি কর্মসংস্থান কমে যাওয়ায় এ অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। আর্থিক অভাব অনটনের সঙ্গে  সাম্প্রতিক শিলা বৃষ্টিতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তাদের ঝুঁপড়ি ঘরের। এ অবস্থায় মানবেতর জীবন যাপন করতে হচ্ছে তাদের।

সূত্র জানায়, স্বাধীনতার আগে পার্বতীপুরে আমেরিকান ক্যাম্প, জাহাঙ্গীর নগর হরিজন পল্লী, পশ্চিম নিউ কলোনি হরিজন পল্লী ও বাবুপাড়া সুইপার পল্লীতে ছয়  শতাধিক হরিজন বসবাস করতেন। স্বাধীনতার পর দুটি পল্লী উঠে যায়। বর্তমানে জাহাঙ্গীরনগর ও বাবুপাড়ার হরিজন পল্লীতে ৪২০ হরিজন বসবাস করছেন বলে সূত্রটি জানায়।

সূত্রমতে, বৃটিশ আমলে এ অঞ্চলে রেল যোগাযোগ শুরু হলে রেল স্টেশন, অফিস, ইংরেজদের বাংলো, কর্মকর্তাদের কোয়ার্টার এবং যাত্রীবাহী ট্রেনের শৌচাগার ও কোচ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য সুইপার নিয়োগ করা হয়। ওই সময় ভারতের মতিহার জেলাসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে রেলে নিয়োগ পেয়ে এখানে চলে আসে হরিজনরা।

১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর এখানকার সব হরিজন থেকে যান । তবে, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শেষে বহু হরিজন সান্তাহার, রংপুর, ঈশ্বরদীসহ অন্যত্র চলে যান। শোনা যায়, যুদ্ধকালে এখানকার অবাঙালি বিহারি আর পাকিস্তানি সেনারা অসংখ্য বাঙালি নারী-পুরুষ শিশুকে নির্মমভাবে হত্যা করে। পরে মরদেহগুলো সুইপারদের দ্বারা বধ্যভূমিতে ফেলে দেয় তারা।

জাহাঙ্গীরনগর মহল্লার সুইপার পল্লীর বিধবা ফুলুয়া (৬১) বলেন, স্বাধীনতার পর এখানকার শংকরের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। শংকর রেলের ক্যারেজে চাকরি করে সম্প্রতি অবসর নেওয়ার পর মারা গেছেন। ফুলুয়ার দুই ছেলে আর দুই মেয়ে। সবার বিয়ে  হয়েছে। টাকার অভাবে ছেলে দুজনের চাকরি হয়নি।

ফুলুয়ার অভিযোগ, ঘুষ দিতে না পারায় রেলে চাকরি হয়নি। তাছাড়া, স্কুল-কলেজ, পৌরসভা কোথাও চাকরি পাওয়া যাচ্ছে না। সবখানে অন্য সম্প্রদায়ের লোকজন ঢুকে যাওয়ায় তাদের আর কাজ জুটছে না। স্বামীর পেনশনের চার হাজার ৬০০ আর গণশৌচাগার থেকে মাস শেষে পাওয়া ৬০০ টাকা দিয়ে খেয়ে না খেয়ে সংসার চলে তার। এর ওপর গত ৩০ মার্চ দুপুরে শিলাবৃষ্টিতে তার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। থরের সবগুলো টিন ছিদ্র হওয়ায় ঘরে থাকা যাচ্ছে না বলে উল্লেখ করেন ফুলুয়া।

একই কথা বলেছেন একই পল্লীর বাসিন্দা মিলন বাশফোঁড়। মিলনের বাবা মৃত হরিলাল বাশফোঁড়, মা কুমারী বাশফোঁড়। একসময় তাদের কাজের দিন ছিল, সুখের দিন ছিল। মিলন বলেন, 'আমার দুই ছেলে-মেয়ে। সামনের দিনগুলোতে এদের কি হবে, কীভাবে বাঁচবে কিছুই ভাবতে পারি না।' 

হরিজনদের স্থানীয় নেতা কনিল বাশফোঁড় ( ৬১)। রেলের ক্যারেজে চাকরি করে অবসর নিয়েছেন তিনি। এখন তার ছেলে রেলে চাকরি করছেন। বড় শ্যালক রাজ কুমার আর রংলাল বাশফোঁড়ের সব ছেলেরা রেলে চাকরি করছেন। কনিল জানান, তার পূর্বপুরুষ ভারতের মতিহার জেলা থেকে এসেছিলেন। কনিল বলেন, 'শত কষ্টের মধ্যেও হরিজন ছেলেমেয়েরা  এখন লেখাপড়া করছে। এ কাজে স্থানীয় উন্নয়ন গ্রাম বিকাশ কেন্দ্র প্রথম এগিয়ে আসে।'

গ্রাম বিকাশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, 'পিছিয়ে থাকা দলিত সম্প্রদায়কে এগিয়ে আনার জন্য বহু আগে থেকে আমরা কাজ শুরু করেছি।'  

     



মন্তব্য