kalerkantho


মানব পাচারকারী দালাল চক্রের খপ্পড়ে পড়ে

নেত্রকোনায় বিদেশগামী যুবকেরা সর্বশান্ত

হাওরাঞ্চল প্রতিনিধি   

২৩ এপ্রিল, ২০১৮ ২২:০৮



নেত্রকোনায় বিদেশগামী যুবকেরা সর্বশান্ত

নেত্রকোনার আটপাড়ায় মানব পাচারকারী দালাল চক্রের খপ্পড়ে পড়ে বিদেশগামী বেশ কিছু যুবক সর্বশান্ত হয়ে মানবেতর জীবন যাবন করছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

জেলার আটপাড়া উপজেলার সুখারী ইউনিয়নের হাতিয়া তারাচাপুর গ্রামের ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারের লোকজন এর প্রতিকার চেয়ে রবিবার বিকেলে নেত্রকোনার পুলিশ সুপার বরাবরে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।

অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, জেলার মদন উপজেলার দক্ষিণ পাড়া ফকিরবাড়ীর মৃত মুসলিম উদ্দিনের পুত্র বিদেশ ফেরত আবুল কালাম শ্বশুড়বাড়ী সূত্রে আটপাড়ার হাতিয়া গ্রামে বেড়াতে এসে এলাকার সাধারণ লোকজনকে মোটা অংকের বেতনের প্রলোভন দেখিয়ে বিদেশ নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রলুব্ধ করেন।

গত ২০১৭ সালের ৪ ডিসেম্বর হাতিয়া গ্রামের শামীম, গিয়াস উদ্দিন ও ইসলাম উদ্দিন নামে ওই ৩ যুবককে মালয়েশিয়ায় পাঠানোর কথা বলে দালাল আবুল কালাম তাদের প্রত্যেকের কাছ থেকে ৩ লাখ ৮০ হাজার টাকা করে হাতিয়ে নেন এবং তিনি ওই ৩ যুবককে ঢাকায় নিয়ে যান। প্রায় ১০-১২ দিন  ঢাকায় থাকার পর শামীমকে মালয়েশিয়ায় পাঠালেও গিয়াস উদ্দিন ও ইসলাম উদ্দিনকে পরে পাঠানো হবে বলে তাদেরকে বাড়িতে পাঠিয়ে দেন দালাল আবুল কালাম। কিন্তু দালাল আবুল কালামকে টাকা দেওয়ার প্রায় ৫ মাস পেরিয়ে গেলেও গিয়াস উদ্দিন ও ইসলাম উদ্দিনের কাছ থেকে নেওয়া টাকা ফেরত না দিয়ে তাদেরকে আজ পাঠাবে, কাল পাঠানো হবে বলে সময় ক্ষেপণ করে যাচ্ছেন দালাল আবুল কালাম।

অপর দিকে শামীম মালয়েশিয়া বিমানবন্দরে নামার পর বৈধ কাগজপত্র ও ফিঙ্গার প্রিন্ট না মিলায় ইমিগ্রেশন পুলিশ তাকে আটক করে সেখানে বন্ধি করে রাখে। সেখানে তার উপর অমানসিক নির্যাতন চালানো হয়। পরে সে বাবা মায়ের কাছে ফোন করলে তারা কালামকে বিষয়টি জানায়। কালাম তাকে ফেরত আনার জন্য আরো ২৫ হাজার টাকা দাবী করে শামীমের বাবার কাছে। পরে টাকা দেওয়ার ৯ দিন পর শামীমকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। বর্তমানে তারা ৩ জনই ঋণ করে ও জায়গা-জমি বিক্রি করে দালাল আবুল কালামকে টাকা দিয়ে সর্বশান্ত হয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন।

সরেজমিনে হাতিয়া গ্রামে গিয়ে লোকজনের সাথে কথা বলে জানা যায়, কালাম বহু লোককে মালয়েশিয়া, সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে পাঠানোর নামে তাদের প্রত্যেকের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা পয়সা হাতিয়ে নিয়েছে। আর যাদেরকে সে মালয়েশিযা পাঠিয়েছে, তারাও সেখানে ভাল নেই। অনেকেই কোনো কাজ পাচ্ছে না। যারা কাজ পেয়েছে, তারা সারা মাস পরিশ্রম করে যা পাচ্ছে, তা দিয়ে নিজের থাকা খাওয়ার খরচও জুটছে না, তাই তারা বাড়িতে টাকা পাঠাতে পাচ্ছেননা।  

ভূক্তভোগীদের অভিযোগ, দালাল কালাম ৪০ হাজার টাকা করে বেতনের কথা বললেও তারা মাসে ১০/১৫ হাজার টাকার বেশী আয় করতে পারছে না। অনেকেই মালয়েশিয়ার কাজ না পেয়ে জঙ্গলে অবস্থান করছে। অনেকেই দেশে ফিরে আসার জন্য চেষ্টা করছে। মালয়েশিয়ায় অবস্থানকারী ইলিয়াস, সোহাগ, নোমান, সুমনের পরিবারের অভিযোগ, তারা কষ্ট সহ্য করতে না পেরে দেশে ফিরে আসার চেষ্টা করছে। কিন্তু টাকা পয়সার অভাবে দেশে ফিরতে পারছে না।

বিদেশ ফেরত শামীমের বাবা রুহুল আমিন কান্না জড়িত কণ্ঠে বলেন, আমি গরিব মানুষ। অল্প কিছু জমি ছিল তাও বিক্রি করে এবং স্থানীয় লোকজনের কাছ থেকে ধার দেনা করে দালাল কালামের কথায় ছেলেকে মালয়েশিয়ায় পাঠিয়েছিলাম। বিমানবন্দরে জেল কেটে ৯ দিন পর ছেলে বাড়িতে ফিরে এসেছে। দেনার টাকা পরিশোধ করতে না পারায় পাওনাদারদের তাগদায় সে এখন পাগল প্রায়। প্রতারিত যুবকরা দালাল কালামের কাছে টাকা পয়সা ফেরত চাইলে সে তাদেরকে নানা ধরনের ভয়ভীতি দেখাচ্ছে। তার শ্বশুড়বাড়ির লোকজন দ্বারা হুমকি দিচ্ছে বলেও তারা অভিযোগ করেন।

প্রতারিত ক্ষতিগ্রস্থ লোকজন স্থানীয় প্রশাসনের কাছে বিষয়টি সুষ্ঠু তদন্ত পূর্বক দালাল কালামের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির জোর দাবী জানান। 

এ ব্যাপারে অভিযুক্ত দালাল আবুল কালামের সাথে কথা বললে সে জানায়, আমার কাছে এলাকার লোকজন এসে তাদেরকে বিদেশে যাওয়ার কথা বললে আমি তাদেরকে এজেন্সির মাধ্যমে বিদেশ পাঠিয়েছি। তারা সেখানে কাজ না পেলে সে ক্ষেত্রে আমারতো কিছু করার নেই।

নেত্রকোনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) মো. শাহ্জাহান মিয়ার সাথে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, অভিযোগটি খতিয়ে দেখে মানব পাচারকারী দালাল চক্রের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


মন্তব্য