kalerkantho


ট্রেনে কাটা পড়ে হাত-পা হারালেন দিনমজুর জাহাঙ্গীর

আঞ্চলিক প্রতিনিধি, ময়মনসিংহ    

২০ এপ্রিল, ২০১৮ ১৮:৩৪



ট্রেনে কাটা পড়ে হাত-পা হারালেন দিনমজুর জাহাঙ্গীর

'আল্লার অশেষ রহমতে ছেড়াডা (ছেলে) বাইচ্যা আছে। কিন্তু মইর‌্যা গেলেই মনে অয় ভালো অইতো, অহন চোখের সামনে মরণের দিকে যাইতাছে। বাবা অইয়াও কিছু করতাম পারতাছি না। আপনারা আমার ছেড়াডারে বাচাইন।'

চলন্ত ট্রেনের চাকায় কাটা পড়ে দুই পা ও হাতের কব্জি পর্যন্ত হারান কর্মক্ষম ছেলে।  অর্থাভাবে গত ১১ দিন ধরে হাসপাতালে প্রয়োজনীয় চিকিৎসার অভাবে আহত ছেলে মৃত্যুর দিকে যাচ্ছেন। ছেলেকে বাঁচাতে দিনমজুর বাবা আজ শুক্রবার সকালে এ প্রতিনিধির কাছে এসে  বুক থাপরে কান্নাজড়িত কণ্ঠে এভাবেই কথাগুলো বলেন।

হাত-পা হারানো যুবকের নাম মো. জাহাঙ্গীর আলম (২৮)। তিনি নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার রোয়াইলবাড়ি ইউনিয়নের সরিদাকান্দা গ্রামের আবদুর রহিমের জ্যেষ্ঠ পুত্র। বাবাসহ তিনি ব্রাহ্মণবাড়ীয়া শহরে রিকশা চালানো ছাড়াও দিনমজুরের কাজ করতেন। ঘটনার দুই আগে তিনি বাড়িতে এসে গত ৯ এপ্রিল ময়মনসিংহ-ভৈরর রেলপথের নান্দাইল রোড রেলওয়ে স্টেশনে এসে ট্রেনের ছাদে চাপেন। এ সময় ইঞ্জিনের ধোঁয়া থেকে নিজেকে রক্ষা করতে অন্য বগিতে যাওয়ার সময় পা ফসকে ছাদ থেকে নিচে পড়ে যান। সঙ্গে সঙ্গে চলন্ত ট্রেনের চাকায় কাটা পড়ে তার দুই পা। থেঁতলে যায় কব্জি পর্যন্ত কর্মক্ষম দুটি হাত।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় ঘণ্টাব্যাপী ঘটনাস্থলে রক্তাক্ত অবস্থায় কাতরাতে থাকলেও উপস্থিত কেউ এগিয়ে আসেনি তাকে উদ্ধারে। পরে প্রায় পাঁচ  কিলোমিটার দূর থেকে খবর পেয়ে পরিবারের লোকজন এসে তাকে উদ্ধার করে পঙ্গু অবস্থায় ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানেই গত ১১ দিন ধরে অর্থাভাবে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা করাতে না পেরে দিন দিন তার অবস্থার অবনতি হচ্ছে। চিকিৎসক বলছেন এই মুহূর্তে সঠিক চিকিৎসা না করাতে পারলে জাহাঙ্গীরকে বাঁচানো কঠিন হবে। জানা গেছে, ট্রেনের ভাড়া না থাকায় জাহাঙ্গীর বিনা ভাড়ায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যেতে চাইছিলেন।

জাহাঙ্গীরের বাবা আবুদর রহিম জানান, তিনি ব্রাহ্মণবাড়ীয়া শহরের কাছকাছি এলাকায় দিনমজুর হিসেবে কাজ করেন। তাঁর ছেলে জাহাঙ্গীর ওই শহরে রিকশা চালায় ও ফসলের মৌসুমে দিনমজুরির কাজ করেন। ঘটনার দিন (৯ এপ্রিল) বাড়িতে ঝগড়া হচ্ছে বলে তাঁর কাছে সংবাদ যায়। এই সংবাদ পেয়ে তিনি বাড়িতে গিয়ে জাহাঙ্গীরের ট্রেনে কাটা পড়ার ঘটনা জানতে পারেন। হাসপাতালে গেলে ছেলে তার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন।

আবদুর রহিম জানান, ছেলেকে সুস্থ করে তুলতে অনেক টাকা দরকার। কিন্তু মাথা গোঁজার ঠাঁই ভিটেবাড়িটুকু ছাড়া তার আর কিছুই নেই। দিনমজুরির আয় দিয়ে আট সদস্যের সংসারই টেনেটুনে চালাতে হয়। ছেলের  চিকিৎসা করবেন কী দিয়ে।

রহিমের প্রতিবেশী ফাইজুল ইসলাম ভূঁইয়া (৩২) বলেন, 'ট্রেনে কাটা পড়ার পর থেকে হাসপাতালে নেওয়া, ভর্তি করা, ওষুধ ক্রয়, রক্ত যোগাড় ইত্যাদি করতে অনেক টাকা খরচ হয়েছে। মানুষের কাছে হাত পেতে টাকা যোগাড় করা হয়েছে। ফাইজুল বলেন, উপর্জনক্ষম একজন মানুষ হারালে স্বাভাবিকভাবে একটি দরিদ্র পরিবার পঙ্গু হয়ে পড়ে। তার ওপর একজন পঙ্গু ব্যক্তির বোঝা যদি দরিদ্র পরিবারের ঘাড়ে চেপে বসে তাহলে কী অবস্থা হয় তা আবদুর রহিমকে না দেখলে বোঝা যায় না।'

ফাইজুল আরো বলেন, এখন জাঙ্গীরকে বাঁচাতে প্রয়োজনীয় টাকা দরকার। এ জন্য এগিয়ে আসতে হবে সহৃদয়বান মানুষকে। 


মন্তব্য