kalerkantho


চোখের জলে কাকন বিবিকে বিদায় জানাল এলাকাবাসী

শামস শামীম, ঝিরারগাও, দোয়ারাবাজার থেকে ফিরে   

২২ মার্চ, ২০১৮ ২২:৪৯



চোখের জলে কাকন বিবিকে বিদায় জানাল এলাকাবাসী

ছবি: কালের কণ্ঠ

'ও মাইগো। আমার খেউ নাইগো। মাই আমারে এতিম খইরা গেছইনগিগো।' কাকন বিবির একমাত্র মেয়ে সকিনা বিবি এভাবেই মা বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধা কাকন বিবিকে হারিয়ে বিলাপ করছিলেন। প্রতিবেশীরা শান্তনা দিচ্ছিলেন আর চোখের জল মুছছিলেন। তারা খাইমারা নদী তীরের ছায়াঘেরা বাড়িটিতে এসে সকিনা বিবিকে শান্তনা দেওয়ার পাশাপাশি ঘরের ভেতরে বিভিন্ন সময়ে পুরস্কার ও সম্মাননা পাওয়া ছবি-ক্রেস্ট দেখছিলেন।

এলাকার প্রবীণতম এই নারী মুক্তিযোদ্ধাকে হারিয়ে অনেককেই বিলাপ করতে দেখা গেল। তারা চোখের জলে শেষ বিদায় জানিয়েছেন বাংলাদেশের জন্মযোদ্ধা এই নারীকে। শেষ বিদায় জানাতে আসা মুক্তিযোদ্ধা জনতা যুদ্ধদিনের তার আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করে তার বীর প্রতীক খেতাব রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিসহ তার স্মৃতিরক্ষার দাবি জানিয়েছেন।

বুধবার রাত সোয়া ১১টায় বার্ধক্যজনিত রোগে ভোগে সিলেটের ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে মারা যান কাকন বিবি। তার মৃত্যুর পরই বিশিষ্টজনরা ছুটে যান সেখানে। দুপুর ১টায় সিলেট থেকে অ্যাম্বুলেন্সযোগে কাকন বিবির গ্রাম দোয়ারাবাজার সীমান্তের লক্ষীপুর ইউনিয়নের ঝিরারগাও গ্রামে আসে। তার মৃত্যুর খবর পেয়েই এলাকাবাসী সকাল থেকে তার বাড়িটিতে জড়ো হন। লাশ এসে বাড়িতে পৌঁছার পর একনজর দেখার জন্য ভীড় জমান এলাকাবাসী। তারা তার মৃত্যুতে নানা স্মৃতি রোমন্থন করেন। বেলা সোয়া ৩টায় লক্ষীপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সংলগ্ন খেলার মাঠে তাকে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা জানানো হয়। বিউগলের করুণ সুরে সম্মাননা জানায় পুলিশ। এ সময় জেলা প্রশাসক মো. সাবিরুল ইসলাম, পুলিশ সুপার মো. বরকতুল্লাহ খান, উপজেলা চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ ইদ্রিস আলী বীরপ্রতীক, আব্দুল মজিদ বীরপ্রতীক, আব্দুল হালিম বীরপ্রতীকসহ প্রশাসনের সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন। সাড়ে ৩টায় তার নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে হাজারও মুসল্লি অংশগ্রহণ করেন। শেষে তার বসতঘরের সামনে বাংলাবাজার-রাবারড্যাম সড়কের পশ্চিমের পাশে দাফন করা হয়।

এলাকাবাসীর স্মৃতিরোমন্থন
গ্রামের সত্তরোর্ধ আলী আহমদ ছিলেন কাকন বিবির প্রতিবেশী। কাকন বিবিকে ১৯৯৭ সালে সরকারের পক্ষ থেকে যে এক একর খাসভূমি বন্দোবস্ত দেওয়া হয়েছিল সেই ভূমি ছিল এই আলী আহমদের দখলে। তিনি স্বেচ্ছায় কাকন বিবিকে দখল ছেড়ে দিয়েছিলেন। আলী আহমদ বলেন, গত ২০-২৫ বছর ধরে তাকে চিনি। এমন সহজ-সরল মানুষ আমি আর জীবনে দেখিনি। তিনি বলেন, কাকন বিবির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রীসহ বড় বড় কর্মকর্তাদের সম্পর্ক ছিল। তারা তাকে শ্রদ্ধা করতেন। এই সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে আমরা কিছুটা সুবিধাও পেয়েছি। তার কারণে সরকার এক সপ্তাহের মধ্যে আমাদের এলাকায় বিদ্যুৎ দিয়েছিল। গ্রামীণ কয়েকটি রাস্তাঘাটও হয়েছে তার কারণে।

প্রতিবেশী শামছুল হক (৭০) বলেন, কাকন বিবি নিরব বাড়িতে নিরব হয়েই থাকতেন। গ্রামের মানুষ তার কাছে তেমনটা মিশতো না। তবে সবাই তাকে শ্রদ্ধা করতো। তিনি বলেন, তার শেষ স্বপ্ন ছিল বাংলাবাজার-রাবারড্যাম সড়কটি পাকাকরণের। এ ব্যপারে প্রশাসন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের অনেকের কাছেই তার শেষ স্বপ্নের কথা জানিয়েছিলেন। তিনি বলেন, আমাদের এলাকায় ১৫-২০ বছর আগে এসেছিলেন তিনি। একটি খুপড়িঘর করে নদীর পাশে থাকতেন। গ্রামের পুরনো বাজারটিতে মাছ, শুটকি বিক্রি করে জীবন চালাতেন। আওয়ামী লীগের আমলে তার খোঁজ শুরু হলে কিছু সহায়তা পান। তিনি বলেন, অনেক কষ্ট করেছেন কাকন বিবি। ভিক্ষাও করেছেন।

গ্রামের যুবক দেলোয়ার হোসেন বলেন, দরিদ্র কাকন বিবি গ্রামের দরিদ্রদের স্নেহ করতেন। গ্রামের অসহায় কয়েকটি পরিবারের তরুণকে তিনি চাকরির ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধি ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে তিনি এলাকার গরিব কয়েকজন ছেলেকে চাকরি দিয়ে গেছেন। এর জন্য কোনো বিনিময় নেননি।

আবেগাপ্লুত সহযোদ্ধারা
১৯৭১ সালে স্বামীকে খুঁজতে বের হয়ে সম্ভ্রম হারিয়েছিলেন কাকন বিবি। এরপরই প্রতিশোধ নিতে মুক্তিযোদ্ধা হন। যুদ্ধকালীন গুরুত্বপূর্ণ সময় কেটেছে টেংরাটিলায়। এখানে তিনি নির্যাতিত হয়েছেন। টেংরাটিলার বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মজিদ বীরপ্রতিক বলেন, কাকন বিবি আমাদের সঙ্গে যুদ্ধ করেছে। ছদ্মবেশে পাকিস্তানি হানাদারদের খবর পৌঁছে দিতো আমাদের কাছে। দেশের পক্ষে কাজ করতে গিয়ে সে চরম নির্যাতিত হয়েছে। নারী জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ সম্মান হারিয়েছে। তার স্মৃতি রক্ষায় প্রশাসনকে আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, তার নামে স্মৃতিবাহী স্থাপনার নামকরণ করতে হবে।

মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হালিম বীরপ্রতীক কাকন বিবির ঘোষিত বীরপ্রতীক খেতাব কার্যকর না হওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। তিনি বলেন, রাষ্ট্র ও সরকার কাকন বিবিকে যোগ্য সম্মান দেয়নি। একাত্তরে কাকন বিবি যে সাহস দেখিয়েছেন তার জন্য আমরা ঋণি। তিনি তার সম্ভ্রম হারিয়ে এদেশের পতাকাকে রাঙিয়েছেন। কিন্তু এই স্বাধীন রাষ্ট্রে তাকে দেওয়া বীরপ্রতীক খেতাব কার্যকর করতে পারেনি। অবিলম্বে ঘোষিত খেতাব গেজেটভুক্ত করার আহ্বান জানান তিনি। দোয়ারাবাজার উপজেলা চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ ইদ্রিস আলী বীর প্রতীক বলেন, আমাদের অঞ্চলে আদিবাসী সমাজের একমাত্র নারী মুক্তিযোদ্ধা তিনি। একাত্তরের তার আত্মত্যাগ কোনো কিছু দিয়েই পূরণ সম্ভব নয়। তার স্মৃতি ধরে রাখতে হবে। এ জন্য প্রশাসনকে এগিয়ে আসতে হবে।

দেয়ালে ঝুলে আছে সম্মাননা স্মারক
চারটার দিকে বসতঘরের সামনে উঠোনের কোণে দাফন চলছিল কাকন বিবির। তার টিনশেডের বসতঘরটিতে ডুকে দেখা গেল এলাকার নারীরা জড়ো হয়েছে। ছোট ছোট চারটি কক্ষে কোনো আসবাবপত্র নেই। দুটি খাট। এলোমেলো ছড়ানো কিছু জিনিষপত্র। নারীদের কেউ দাড়িয়ে, কেউ বসে দেখছিলেন দেয়ালে ঝুলানো তার কিছু ছবি ও বিভিন্ন সময়ে পাওয়া ক্রেস্ট। এর মধ্যে দেয়ালে আলপিন দিয়ে বাধাই করানো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও জনতা ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান অর্থনীতিবিদ ড. আবুল বারকাতের সঙ্গে হাস্যোজ্জ্বল ছবিটি। এর নিচেই ২০১১ সালে দৈনিক কালের কণ্ঠের সহায়তার প্রতীকি চেক ও সম্মাননা ক্রেস্ট। পাশেই বিভিন্ন সংগঠন কর্তৃক বিভিন্ন সময়ে প্রাপ্ত ক্রেস টাঙ্গানো। মনোযোগ দিয়ে সেই স্মৃতিবাহী ছবি ও ক্রেস্টগুলো দেখছিলেন নারীরা। তাদের চোখ ছিল জলে টলোমল। গ্রামের নাহিদা আক্তার চোখের জল মুছে ফেলে বলেন, কাকন বিবি ছিলেন আমাদের কাছে এক সম্মানের নাম। তিনি একজন নারী হয়েও যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছিলেন। নারী হয়েই তিনি এলাকার অনেক উন্নয়নও করে গেছেন। এলাকার মানুষ তাকে আজীবন মনে রাখবে।

প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বক্তব্য
পুলিশ সুপার মো. বরকতুল্লাহ খান বলেন, কাকন বিবি ছিলেন আমাদের প্রেরণা। তার আত্মত্যাগে আজকের এই বাংলাদেশ দাড়িয়ে আছে। এই বাংলাদেশ যতদিন থাকবে কাকন বিবিদের স্মৃতিও অম্লান থাকবে। কাকন বিবির স্মৃতিরক্ষায় প্রশাসন কাজ করে যাবে বলে জানান তিনি।

জেলা প্রশাসক মো. সাবিরুল ইসলাম বলেন, কাকন বিবি আমাদের স্বাধীন দেশ উপহার দিয়ে গেছেন। তার কারণেই আমরা ডিসি-এসপি হতে পেরেছি। কোনোভাবেই আসলে তার ঋণ শোধ হবার নয়। তিনি বলেন, আমরা প্রশাসনের তরফ থেকে কাকন বিবির স্মৃতিরক্ষায় সব ধরনের কাজ করে যাব। তাকে রাষ্ট্রীয়ভাবেও সম্মান দেওয়ার চেষ্টা করব।

যৎকিঞ্চিৎ কাকন বিবি
দোয়ারাবাজার সংলগ্ন ভারতের খাসিয়া পাহাড়ের নথরাই পাহাড়ে কাকন বিবির বাড়ি ছিল। বাবার নাম গিসো খাসিয়া এবং মায়ের নাম মেলি খাসিয়া। ৬ ভাই ১ বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। মুক্তিযুদ্ধের আগে শাহেদ আলী নামের একজনকে বিয়ে করেন। তখনই তার নাম হয় কাকন ওরফে নূরজাহান। ১৯৭১ সালের নভেম্বর মাসে পাহাড়ঘেরা টেংরাটিলায় অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে পাকসেনাদের সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে লিপ্ত হন তিনি। সেই যুদ্ধে গুলির ছিটা লাগে শরীরে। ডান উড়ুতে গুলির সেই ক্ষত অক্ষত ছিল তার। টেংরাটিলা যুদ্ধের পর আমবাড়ি, বাংলাবাজার, টেবলাই, বালিউরা, মহব্বতপুর, বেতুরা, দূর্বিনটিলা, আধারটিলাসহ প্রায় ৯টি সম্মুখযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। নভেম্বর মাসের শেষ দিকে রহমত আলীসহ আরো কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে সুনামগঞ্জ সিলেট সড়কের জাউয়া ব্রিজ অপারেশনে তিনিও ছিলেন।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর দোয়ারা বাজার উপজেলার লক্ষীপুর ইউনিয়নের ঝিরাগাঁও গ্রামে একটি পরিত্যক্ত কুড়ে ঘরে আশ্রয় নেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৯৯৭ সালে তাকে এক একর খাস ভূমি প্রদান করেন। ঝিরাগাও গ্রামে সরকার প্রদত্ত জমিতে দিন কাটাচ্ছেন তিনি।


মন্তব্য