kalerkantho


চালবাজিতে জড়িত সাগর-রফিকের ৬ সদস্যের সিন্ডিকেট

এক ট্রাক ভেজাল চাল সরবরাহে ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকার মুনাফা

নিজস্ব প্রতিবেদক, কক্সবাজার   

১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:৩৯



এক ট্রাক ভেজাল চাল সরবরাহে ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকার মুনাফা

ছবি: কালের কণ্ঠ

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এক ট্রাক ভেজাল চাল সরবরাহ দিলেই ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকার মুনাফা মিলে। এ কারণেই রোহিঙ্গাদের জন্য চাল সরবরাহ দিতে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে চাল ব্যবসায়ীরা। ইতিমধ্যে একটি বড় সিন্ডিকেট রোহিঙ্গাদের পঁচা চাল সরবরাহ দিয়ে হাতিয়ে নিতে শুরু করেছে কোটি কোটি টাকা। গত বুধবার রাতে কক্সবাজার সদর উপজেলা পরিষদ সংলগ্ন খাদ্য গুদাম গেইটে আটক ট্রাকটির চালেই মুনাফা দাঁড়ায় ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা। এভাবে শত শত ট্রাক চাল সরবরাহ দিয়ে সিন্ডিকেটটি ইতিমধ্যে হাতিয়ে নিয়েছে কয়েক কোটি টাকা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত বুধবার রাতে আটক ট্রাকটির ২০ টন নিম্নমানের চালের কেজি প্রতি দাম হচ্ছে ২৮ টাকা। এই হিসাবে ২০ টন চালের মূল্য দাঁড়ায় ৫ লাখ ৬০ হাজার টাকা। অথচ উন্নত মানের আমদানিকৃত চালের কেজি হচ্ছে ৪৬ টাকা। এ হিসাবে ২০ টন চালের দাম হবার কথা ৯ লাখ ২০ হাজার টাকা। সিন্ডিকেট সদস্যরা চট্টগ্রামের দেওয়ানহাট খাদ্য গুদাম থেকে কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের জন্য সরবরাহ দিতে নেওয়া উন্নত মানের চাল বাইরের বাজারে বিক্রি করে দেয়। এরপর খাদ্য গুদামের ইনভয়েস কপি হাতে নিয়ে কক্সবাজার অথবা বান্দরবান এলাকা থেকে পঁচা চাল কিনে নিয়ে ভোরে কক্সবাজারের খাদ্য গুদামের গছিয়ে দেওয়া হয়।

চট্টগ্রামের সরকারি গুদাম থেকে কক্সবাজারে বিশ্ব খাদ্য সংস্থাকে চাল সরবরাহ দেয়ার কাজে নিয়োজিত সরবরাহকারীদের চাল নিয়ে চালবাজিতে জড়িত রয়েছে ৬ জনের একটি সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেটের ৬ সদস্যের মধ্যে ৪ জনই কক্সবাজারের এবং অপর ২ জন চট্টগ্রামের চালবাজ। অনুসন্ধানে জানা গেছে, কক্সবাজারের সাগর-রফিক সিন্ডিকেট সদস্যদ্বয় হচ্ছেন চালবাজির অন্যতম পথ প্রদর্শক। তাদের সঙ্গে রয়েছেন কক্সবাজার শহরের চাল বাজারের বুলবুল, উখিয়ার আবদুর রহিম, পটিয়ার আলম এবং চন্দনাইশের অরুণ।

কক্সবাজারের সাগর-রফিক সিন্ডিকেট চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের খাদ্য গুদামের কর্মকর্তাদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে পঁচা চালের বাণিজ্যে ভাগাভাগি করছে। চট্টগ্রামের খাদ্য গুদাম থেকে উন্নত মানের চালের নেওয়া ইনভয়েস নিয়ে সিন্ডিকেট সদস্যরা বাইরের বাজার থেকে পঁচা চাল কিনে কক্সবাজারের খাদ্য গুদামে সরবরাহ করে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। অভিযোগ রয়েছে, এক্ষেত্রে সাগর-রফিক সিন্ডিকেট সদস্যরা কক্সবাজারের খাদ্য গুদাম কর্মকর্তার সঙ্গে গোপন আঁতাত করেই দীর্ঘদিন ধরে চালিয়ে যাচ্ছে পঁচা চাল বাণিজ্য।

গত ২৬ জানুয়ারি কক্সবাজার খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা থোয়াইপ্রু মারমার প্রথমা কন্যার বিয়ের কাজে সাগর-রফিক সিন্ডিকেট দর্শনীয় ভূমিকা পালন করেছে। পঁচা চাল সিন্ডিকেট সদস্য সাগর, রফিক, বুলবুল ও আবদুর রহিম কক্সবাজার শহর থেকে খাদ্য গুদাম কর্মকর্তার খাগড়াছড়ির কনের বিয়েতে ডেকোরেটর এবং খাসিসহ যাবতীয় বাজারের যোগান সরবরাহ করারও অভিযোগ উঠেছে। এমনকি কেবল ডেকোরেটরের বিল আসে ১৫ লাখ টাকা। তবে কক্সবাজার খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা থোয়াইপ্রু মারমা এসব অস্বীকার করেছেন।

বিশ্ব খাদ্য সংস্থা (ডাব্লিউএফপি) রোহিঙ্গাদের চাল সরবরাহ দিচ্ছে ভিয়েতনাম এবং পাকিস্তান থেকে আমদানি করা উন্নতমানের চাল। এসব চালের কেজি প্রতি দাম ৪৫ থেকে ৫০ টাকা। সাগর-রফিক সিন্ডিকেট খাদ্য গুদামের কর্মকর্তাদের সঙ্গে হাত করে সরবরাহকারীসহ শতকরা ফিফটি ফিফটি শেয়ারে উন্নতমানের চার বাইরে বিক্রি করে দিয়ে পঁচা চাল বস্তা ভর্তি করে গুদামে ঢুকিয়ে দেয়। গুদামেই পঁচা চাল খাদ্য গুদাম কর্তৃপক্ষ ও সরবরাহকারী এনজিও কর্মীদের যোগসাজসে ৩০ কেজি বস্তায় ২৭/২৮ কেজি চার ভরে রোহিঙ্গা শিবিরে পৌঁছে দেয়।

জানা গেছে, কক্সবাজারের ভেজাল চাল সরবরাহের সঙ্গে নেপথ্যে জড়িত সাগর-রফিক সিন্ডিকেটের সদস্যদের বিরুদ্ধে ইতিপূর্বেও ভেজাল চালের কয়েকটি মামলা রয়েছে। ২০১৫ সালে রামুতেও এই সিন্ডিকেটের ২টি ভেজাল চালের ট্রাক ধরা পড়েছিল। সেই ভেজাল চাল সিন্ডিকেট সদস্যরা রামু থানার তদানীন্তন সেকেন্ড অফিসারকে ম্যানেজ করে ভেজাল কাগজ নিয়ে ভেজাল চালের ট্রাক ছাড়িয়ে নেয়। তদুপরি সিন্ডিকেটের কক্সবাজারস্থ বিসিক শিল্প এলাকার ময়দার মিল গুদাম, বিমানবন্দর সড়কের গুদাম এবং কক্সবাজার সদর উপজেলা পরিষদ কার্যালয় সংরগ্ন গুদামও সিলগালা করা হয়েছিল।

প্রসঙ্গত চট্টগ্রামের আসাদ ট্রেডিং-এর নামে ডাব্লিউএফপি লোগোসহ ৪০০ বস্তার ২০ মেট্রিক টন ভেজাল চাল কক্সবাজার খাদ্য গুদামে খালাস করার আগেই সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নোমান হোসেন প্রিন্স ট্রাকটি আটক করেন। গত চার দিন পার হলেও সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কর্তৃক আটক করা চাল বোঝাই ট্রাকটির মালিকানা এখনো কেউ দাবি করেননি। এমনকি বিশ্ব খাদ্য সংস্থা (ডাব্লিউএফপি) এবং খাদ্য অফিসেরও কেউ ট্রাক বোঝাই চাল দেখতে যাননি।



মন্তব্য