kalerkantho


রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল

হিমঘরের ফ্রিজ বিকল, লাশ শুকিয়ে কঙ্কাল

স্বপন চৌধুরী, রংপুর    

২৪ জানুয়ারি, ২০১৮ ১০:৩০



হিমঘরের ফ্রিজ বিকল, লাশ শুকিয়ে কঙ্কাল

রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের হিমঘরে সবগুলো ফ্রিজ আবারো বিকল হয়ে পড়েছে। ফলে সেখানে রাখা লাশগুলো পচে ছড়িয়ে পড়ছে দুর্গন্ধ। এরই মধ্যে কয়েকটি লাশ আর শনাক্তই করা যাচ্ছে না।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, ফ্রিজগুলো সচল করতে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা লাশগুলোর বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে জেলা প্রশাসন ও পুলিশকে।

হাসপাতালের হিমঘরে গিয়ে দেখা যায়, পচা লাশের দুর্গন্ধে সেখানে দাঁড়িয়ে থাকার অবস্থা নেই।  সেখানে কর্তব্যরত ডোম মানু জানান, সপ্তাহখানেকের বেশি সময় ধরে হিমঘরের তিনটি ফ্রিজের সবগুলোই বিকল হয়ে পড়ে রয়েছে। এতে ফ্রিজে রাখা ১০টি লাশে পচন ধরেছে। এরই  মধ্যে চারটি লাশ এই হিমঘরে রয়েছে দুই থেকে চার বছর ধরে।

মানু জানান, এর আগেও একাধিকবার বিকল হয়ে পড়েছিল হিমঘরের ফ্রিজগুলো। এ কারণে দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা লাশগুলো এখন কঙ্কালে পরিণত হয়েছে। এগুলো শনাক্ত করারও কোনো উপায় নেই। অপেক্ষাকৃত নতুন লাশগুলোও এখন পচে গিয়ে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০১৪ সালের জানুয়ারি মাসে নীলফামারীর নীপা নামের এক নারী বিষপান করে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। গুরুতর অবস্থায় তাকে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।  সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। ওই নারী হিন্দু ধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে বিয়ে করেন। কিন্তু মেয়েটির পরিবার এ বিয়ে মেনে নেয়নি। তারা আদালতে মামলা দায়ের করেন। সেই মামলা এখনও নীলফামারী আদালতে বিচারাধীন।

নীপার আত্মহত্যার পর তার লাশ নিতে পাল্টাপাল্টি আবেদন করা হয় তার স্বজন ও শ্বশুর বাড়ির পক্ষ থেকে। তবে লাশটি কারা গ্রহণ করবে-সে সিদ্ধান্ত না পাওয়ায় চার বছর ধরে তার লাশটি পড়ে আছে রংপুর মেডিক্যালের হিমঘরে। এ ছাড়া ২০১৫ সালের ৩০ এপ্রিল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় এক অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির।

আরো পড়ুন চলে গেলো ‘কমলা সুন্দরী’ 

একই বছরের ৫ আগস্ট ও ১ সেপ্টেম্বর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান আরো দুই অজ্ঞাতপরিচয় নারী। নীপার পাশাপাশি এই তিনটি লাশও পড়ে রয়েছে হিমঘরের ফ্রিজে। এই দীর্ঘ সময়েও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ লাশগুলো দাফন করার কোনো  পদক্ষেপ নেয়নি।

এই চারটি লাশের বাইরে বর্তমানে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের হিমঘরে রয়েছে আরো ছয়টি লাশ। এর মধ্যে পঞ্চগড় জেলার দেবীগজ্ঞ উপজেলা সদরের রোস্তম আলীর মেয়ে আরজিনা বেগম সপাতাহখানেক আগে শীত নিবারণে আগুন পোহাতে গিয়ে দগ্ধ হয়ে হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। আরজিনার স্বজনরা লাশটি নিতে না আসায় তার ঠিকানা হয়েছে হিমঘর। এভাবে আরো  পাঁচটি বেওয়ারিশ লাশ থাকায় হিমঘরের ফ্রিজে লাশের সংখ্যা রয়েছে ১০টি।

আরো পড়ুন রংপুরে শীত কমেনি, বেড়েছে গরম কাপড়ের দাম 

হিমঘরের কর্মচারী জয়নাল আবেদীন বলেন, 'হিমঘরের চারটি লাশ অনেকদিন ধরে পড়ে আছে। সম্প্রতি নতুন যোগ হয়েছে আরো ছয়টি লাশ। ফ্রিজ নষ্ট হওয়ায় বাধ্য হয়ে লাশগুলো বের করে ঘরের মেঝেতে রাখা হয়েছে।' তিনি জানান, লাশের দুর্গন্ধের কারণে হিমঘরে যাওয়াই দুষ্কর হয়ে পড়েছে। বিষয়টি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে অবহিত করার পরও বিকল হওয়া ফ্রিজগুলো সচল করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না।

অনুসন্ধানে জানা যায়, নীলফামারীর ডোমার উপজেলার বামনিয়া এলাকার অক্ষয় কুমারের মেয়ে নীপা রানীর প্রেমের সম্পর্ক ছিল পার্শ্ববর্তী বোড়াগাড়ি গ্রামের ইউপি সদস্য জহুরুল ইসলামের ছেলে হুমায়ুন কবীর রাজুর সঙ্গে।

২০১৪ সালের জানুয়ারি মাসের প্রথম দিকে পালিয়ে নীলফামারী শহরে আসেন রাজু ও নীপা। সেখানে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন নীপা এবং পরে তারা বিয়ে করেন। বিষয়টি মেনে নেননি নীপার বাবা অক্ষয় কুমার। তিনি এ ঘটনায় অপহরণ মামলা করেন। এরপর পুলিশ রাজুকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠালে বাবা অক্ষয় কুমার জোর করে নীপাকে বাড়িতে নিয়ে যান। এর কিছুদিন পর রাজু জামিনে মুক্তি পান।

এর মধ্যে নীপা বিষ পান করে আত্মহত্যা করেন। তার লাশটি ময়নাতদন্তের জন্য রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে আনা হলে তখন থেকে সেটি হিমঘরে পড়ে আছে।

অন্যদিকে, প্রেমিকার মৃত্যুর খবর শুনে ৫৩ দিনের মাথায় প্রেমিক রাজুও বিষপাণ করে আত্মহত্যা করেন। এরপর নীপার লাশ নিয়ে শুরু হয় দুই পরিবারের দ্বন্দ্ব। নীপা রানীর বাবা অক্ষয় কুমার তার মেয়ের লাশ দাবি করে আদালতে মামলা করেন।

অন্যদিকে তার স্বামী রাজুর বাবা জহুরুল ইসলামও পুত্রবধূর লাশ দাবি করেন। এ মামলা এখনো বিচারাধীন। ফলে মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত লাশ কার জিম্মায় দেওয়া হবে- তা নির্ধারণ করা যাচ্ছে না বলে জানিয়েছে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

রাজুর বাবা জহুরুল ইসলাম জানান, নীলফামারী আদালতে নীপা এফিডেভিট করে মুসলিম হয়ে তার ছেলে রাজুকে বিয়ে করে। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস-তারা দুজনই মারা গেছে। তিনি তার পুত্রবধূর লাশ দ্রুত দাফনের অনুমতি চান।

ডোমার উপজেলার বামনিয়া ইউনিয়য়ের ওয়ার্ড সদস্য খুরশিদ আলম তিতাস ও বোড়াগাড়ি ইউপি সদস্য রাশেদুজ্জামান বলেন, আইনি জটিলতায় প্রায় চার বছর ধরে লাশ হাসপাতালের হিমঘরে পড়ে থাকাটা দুঃখজনক।

এ ব্যাপারে হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ  রংপুর বিভাগের আহ্বায়ক ও আইনজীবী এম এ বাশার বলেন, 'দুই থেকে চার বছর ধরে লাশ হাসপাতালের হিমঘরে পড়ে থাকা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন।' অবিলম্বে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করে এরসঙ্গে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।

হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. শফিকুল ইসলাম হিমঘরের ফ্রিজগুলো বিকল হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছে। এর আগেও গত বছরের জুলাই মাসে হিমঘরের ফ্রিজগুলো বেশ কিছুদিন বিকল ছিল। ওই সময় অনেক চেষ্টার পর সচল করা হলেও আবারো বিকল হয়ে গেছে।

দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা চারটি লাশের ব্যাপারে জেলা প্রশাসন ও পুলিশকে চিঠি দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।



মন্তব্য