kalerkantho


রংপুরে শীত কমেনি, বেড়েছে গরম কাপড়ের দাম

স্বপন চৌধুরী, রংপুর    

২৩ জানুয়ারি, ২০১৮ ১০:২৬



রংপুরে শীত কমেনি, বেড়েছে গরম কাপড়ের দাম

শীত জেঁকে বসায় তিস্তার চরাঞ্চলসহ রংপুরের সর্বত্র নিম্ন আয়ের মানুষের দূর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে। সন্ধ্যার পর থেকে পরদিন সকাল ১০টা পর্যন্ত ঘন কুয়াশায় ঢাকা থাকছে প্রকৃতি।
 
গত কয়েকদিনের শৈত্যপ্রবাহের পর রংপুরের তাপমমাত্রা কিছুটা বাড়লেও ঠাণ্ডা কমছে না। হিমেল হাওয়ায় ঠাণ্ডাজনিত রোগে শিশু ও বয়স্কদের দুর্ভোগ বেড়েছে।
 
এদিকে, শৈত্যপ্রবাহসহ শীতের তীব্রতা বাড়ার সাথে সাথে পুরনো কাপড়ের দোকানগুলোতে মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। দামও বেশি নিচ্ছে দোকানদাররা। গ্রাম-শহর সর্বত্রই উপচেপড়া ভিড় দেখা যায় শীতবস্ত্রের কাপড়ের দোকানগুলোতে। শুধু রংপুর শহরে প্রতিদিন বিক্রি হচ্ছে কয়েক লাখ টাকার গরম কাপড়।
 
সরেজমিনে তিস্তার চরাঞ্চলে গিয়ে চোখে পড়ে অভাবী ও শীতকাতর মানুষের দুর্ভোগ। নদীপারের হিমেল হাওয়ায় গায়ে কম্বল জড়িয়ে থাকা যেখানে দুঃসাধ্য, সেখানে চরাঞ্চলের মানুষজন গায়ে শুধু একটা গেঞ্জি কিংবা লুঙ্গি জড়িয়ে আছেন। আর নারীদের সম্বল শুধু শাড়ির আঁচল।
 
গত সোমবার সন্ধ্যার পর চুলোয় ভাতের হাড়ি বসিয়ে আগুনের কাছে বসে ছিলেন আলাল চরের ছখিনা বেওয়া। তিনি বলেন, 'চুলার আগুনই হামার সম্বল। কয়দিন থাকি খুব ঠাণ্ডা পড়ছে। চুলার আগুন নিভি গেইলে রাইতোত (রাতে) কান্দি কাটা নাগবে।' একই গ্রামের জোস্না কেগম বলেন, 'ঘরোর একখান পাতলা খ্যাতা (কাঁথা) আছে। কিন্তু তাতে গাও (শরীর) গরম হয় না।
 
জয়রামওঝা চরের ফজলুল হক, মোখলেছার রহমান বলেন, 'একদিন না খ্যায়া থাকা যায়, তাও শীতের কষ্ট সহ্য হয় না। মরণের ঠাণ্ডা শুরু হইল, কিন্তু ঘরোত কোনো গরম কাপড় নাই।' শীতে এবার এমনি অবস্থা বিরাজ করছে চরাঞ্চলের প্রতিটি বাড়িতে।
 
রংপুর শহরে শীতের কাপড়ের মার্কেটগুলোর মধ্যে স্টেশন বাজার পুরাতন কাপড়ের মার্কেট, শাহ  মো. সালেক মার্কেট, শাহ জামাল মার্কেট, সুরভি উদ্যানের পাশে ফুটপাতের মার্কেট, হনুমানতলা মার্কেটে সবচেয়ে বেশি কাপড় বিক্রি হয়। এই কয়েকটি মার্কেটে ছোট-বড় প্রায় ৫০০টি দোকান রয়েছে। শীতকে কেন্দ্র করে ঢাকা থেকেও অনেকেই এখানে ব্যবসা করতে আসেন। এ ছাড়া শহরতলীর সাতমাথা, মাহীগঞ্জ, চকবাজার, মডার্ন মোড়ে শীতের কাপড়ের অনেকগুলো মার্কেট রয়েছে।
 
শহরের বাইরের দেউতি, সৈয়দপুর, বড় দরগাহ, নব্দীগঞ্জ, হারাগাছ ও পাগলাপীর বাজার ঘুরে দেখা গেছে- এসব বাজারে পুরনো কাপড়ের ক্রেতা বেশি। স্বল্প আয়ের মানুষ থেকে শুরু করে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের পদচারণায় মুখরিত রংপুরের পুরাতন কাপড়ের বাজার।
 
শীত মোকাবেলায় নতুন কাপড়ের চেয়ে বিদেশি পুরনো কাপড়ের চাহিদা বেশি বলে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়। বিদেশি পুরনো শীতের কাপড়ের দাম তুলনামূলক কম। তাছাড়া এই কাপড়গুলো দেখতে সুন্দর, মানসম্পন্ন ও টেকসই হওয়ায় ক্রেতাদের এসব কাপড়ে আগ্রহ বেশি।
 
আরো পড়ুন শীতে কাঁপছে উত্তর 
 
আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে সাধারণ মানুষ শহরে আসছে গরম কাপড় কিনতে। পুরনো শীতবস্ত্রের দাম গতবারের তুলনায় কিছুটা বাড়লেও নতুনের চেয়ে তুলনামূলক কম দাম বলে শহর কিংবা গ্রামের সব শ্রেণির মানুষ ফুটপাত থেকে শীতের পোশাক কিনছে। কোট, জ্যাকেট, সোয়েটার, ট্রাউজার, ওভারকোট, ফুল হাতা গেঞ্জি, কম্বল, মেয়েদের কার্টিগান, হাতমোজা ও পা মোজার ক্রেতার সংখ্যা বেশি।
 
আরো পড়ুন শীত বাড়ছে, উত্তরে কম্বল সংকট 
 
তবে গত বছরের চেয়ে এবার পুরনো কাপড়ের দাম অনেক বেশি বলে ব্যবসায়ী ও ক্রেতারা অভিযোগ করেছেন। 
ফুটপাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা জানান, গত বছরের তুলনায় এ বছর পুরাতন কাপড়ের দাম মহাজনরা বেশি করে নিচ্ছেন। ফলে তাদেরও বেশি দামে বিক্রি না করে উপায় থাকে না।
 
ব্যবসায়ীরা জানান, প্রতিবছর শীতের সময় মহাজনদের কাছ থেকে গরম কাপড়ের গাইট নিয়ে তা খোলা বাজারে খুচরা বিক্রি করেন তারা । গত বছর সাত থেকে আট হাজার টাকায় একটি কাপড়ের গাইট বা বেল কেনা যেতো। এ বছর একটি গরম কাপড়ের গাইট কিনতে ১৪ থেকে ১৬ হাজার টাকা লাগছে।
 
শাহ জামাল মার্কেটের পুরাতন কাপড়ের পাইকারি ব্যবসায়ী সিদ্দিক হোসেন বলেন, 'শীতকে ঘিরে চীন, তাইওয়ান, জাপান, কোরিয়া ও রাশিয়া থেকে পুরাতন শীতবস্ত্র আসছে। পরিবহন খরচ ও ব্যাংক ঋণের কারণে কাপড়ের বেলের দাম বেড়ে গেছে। আমরা পাইকারি বিক্রির জন্য চট্টগ্রাম ও ঢাকা থেকে কাপড়ের বেল ট্রাকে করে আনি ও খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করি।'
 
সিদ্দিক হোসেন জানান, ছোট ছোট ব্যবসায়ীদের বাকিতে কাপড় দেন, তারা বিক্রি করে টাকা শোধ করেন। ব্যাংক লোনের ওপর অনেকটা নির্ভরশীল হলেও ব্যাংকগুলো এক লাখ টাকার ওপরে লোন দিতে চায় না। আবার অনেক কিছু ম্যানেজ করতে খরচ বেশি পড়ে যায়। শহরের এসব পাইকারি বাজার থেকে কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী, গাইবান্ধা, পঞ্চগড়, দিনাজপুর জেলার ব্যবসায়ীরা কাপড় কিনে নিয়ে এলাকায় খুচরা বিক্রি করেন বলে জানান তিনি। 
 
আরেক ব্যবসায়ী সুলতান আলী জানান, ছোটদের পুরনো শীত কাপড়ের ১০০ কেজি ওজনের একটি গাইট চট্টগ্রামের মোকামে সাড়ে ছয় হাজার থেকে সাত হাজার হাজার টাকা লাগে। বড়দের শীত কাপড়ের ১০০ কেজি ওজনের একটি গাইটের দাম পাঁচ হাজার থেকে সাড়ে সাত হাজার টাকা পড়ে। ৮০  থেকে ১০০ কেজি ওজনের জ্যাকেট ও সোয়েটারের একটি গাইটের  দাম পড়ছে আট হাজার টাকা। এখানে এনে পরিবহন খরচ ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে দাম বেশি পড়ছে। ফলে খুচরা বাজারেও দাম বাড়ছে।
 
খুচরা ব্যবসায়ী আবদুল্লা মিয়া জানান, একটি গাইটে ১০ টাকা থেকে শুরু করে ৬০০ টাকার কাপড়ও থাকে। ক্রেতাদের সঙ্গে দামাদামি করে সব দাম ঠিক করতে হয়। তবে কয়েকদিন থেকে শীতের তীব্রতা বেশি হওয়ায় কাপড়ও বিক্রি হচ্ছে বেশি। প্রতিদিন খুচরা দোকানে সাড়ে চার হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকার ওপরে বিক্রি হচ্ছে বলে জানান তিনি।
 
সুরভী উদ্যানের পাশে ফুটপাতের ব্যবসায়ী ইসলাম উদ্দিন জানান, কেনা কোনো কোনো গাইটের ভেতর ছেঁড়া-ফাটা কাপড় থাকে, যা মহাজনরা ফেরত নিতে চান না। এর ফলে লোকসান গুণতে হয়। একটা গাইটে বিভিন্ন ধরনের সোয়েটার, ট্রাউজার, হাফ ও ফুল হাতা গেঞ্জি এবং ছোট ছোট বাচ্চাদের কাপড় থাকে। যা বিভিন্ন দামে বিক্রি করতে হয়।
 
স্টেশন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, গত বছর বাচ্চাদের যে কাপড় ৫০ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল তা এবার ১০০ টাকার নিচে মিলছে না। বড়দের যে কাপড় ১২০ থেকে ১৩০ টাকায় কেনা গেছে, এবার তা কিনতে হচ্ছে ১৫০ থেকে ২০০ টাকায়।
 
স্টেশন বাজারের পুরাতন কাপড় ব্যবসায়ীরা জানান, গত বছরের তুলনায় এবার প্রতিটি শীতবস্ত্রের দাম ৫০ থেকে ১০০ টাকা বেশি। গত বছরের ৩০০ থেকে ৪০০ টাকার সোয়েটার এবার বিক্রি হচ্ছে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকায়। সালেক মার্কেটে কাপড় কিনতে আসা শেফালী বেগম জানান, পুরনো  কাপড়ের মধ্যে অনেক ভালো মানের কাপড় পাওয়া যায়। তবে দেখেশুনে কিনতে হয়। গত বছরের  চেয়ে এ বছর প্রতিটি কাপড়ের দাম গড়ে দ্বিগুণ বলে জানান তিনি।

মন্তব্য