kalerkantho


দগ্ধ অর্ধশত

রংপুরে আগুন পোহাতে গিয়ে সাত দিনে মৃত্যু ১৪ জনের

স্বপন চৌধুরী, রংপুর    

১৫ জানুয়ারি, ২০১৮ ১৬:৪৪



রংপুরে আগুন পোহাতে গিয়ে সাত দিনে মৃত্যু ১৪ জনের

প্রচণ্ড শীতে আগুন পোহাতে গিয়ে রংপুর অঞ্চলে দগ্ধ হয়ে আরো চারজনের মৃত্যু হয়েছে।

এরা হলেন লালমনিরহাটের রাজপুর এলাকার খুকুমনি (৭০), গাইবান্ধা সদরের টেংগার এলাকার জয়নুল আবেদীন (৬৫), রংপুরের পীরগঞ্জের ভেণ্ডাবাড়ি এলাকার হাচো বেগম (৬৭) এবং রংপুরের তারাগঞ্জের ফাজিলপুর এলাকার জামিরুন বেওয়া (৮০)।

এদের মধ্যে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রবিবার সকাল থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা পর্যন্ত মারা যান তিনজন। শনিবার রাতে মারা যান খুকুমনি। তাদের শরীরের বেশিরভাগ অংশ পুড়ে যাওয়ায় বাঁচানো সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছেন হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের সহকারী রেজিস্ট্রার নূর আলম সিদ্দিক।

নূর আলম জানান, মৃতরা সবাই শীত নিবারণে খড়কুটো জ্বালিয়ে আগুন পোহাতে গিয়ে দগ্ধ হয়েছিলেন। একই ঘটনায় দগ্ধ হয়ে আরো ৫২ জন হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসা নিচ্ছেন। এদের মধ্যে আরো কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।

আরো পড়ুন উত্তরে কমছে না শীতের দাপট 

অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগে শীত নিবারণের সময় আগুনে দগ্ধ হয়ে গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১০ জন মারা গেছেন। এরা হলেন রংপুর নগরীর নজিবের হাট এলাকার বেলাল হোসেনের স্ত্রী আফরোজা খাতুন (৩০), ঠাকুরগাঁও শহরের থানাপাড়ার আঁখি আক্তার (৪৫), রংপুরের জুম্মাপাড়া পাকারমাথা এলাকার রুমা খাতুন (৬৫), কাউনিয়া উপজেলার গোলাপী বেগম (৩০), লালমনিরহাট সদরের শাম্মী আখতার (২৭), পাটগ্রাম উপজেলার ফাতেমা বেগম (৩২), আলো বেগম (২২), নীলফামারী সদরের রেহেনা বেগম (২৫), রংপুর সিটি করপোরেশেনের মাহিগঞ্জের চাঁদ মিয়ার স্ত্রী মনি বেগম (২৫) এবং নীলফামারী সদরের সোনারায় এলাকার আমজাদ হোসেনের স্ত্রী মারুফা খাতুন (৩০)।

এ নিয়ে রংপুর অঞ্চলের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া শৈত্যপ্রবাহকে কেন্দ্র করে গত সাত দিনে আগুনে দগ্ধ হয়ে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৪ জনে।

আরো পড়ুন রংপুরে শীতার্ত মানুষের মাঝে কম্বল বিতর 

পৌষ মাসের শেষ দিকে হঠাৎ রংপুর অঞ্চলে শুরু হওয়া শৈত্যপ্রবাহে শীতের তীব্রতা বৃদ্ধি পাওয়ায় কাহিল হয়ে পড়ে জনজীবন। বিশেষ করে শ্রমজীবীসহ নদীপারের মানুষ পড়েছেন চরম দুর্ভোগে। কয়েকদিন ধরে এই অঞ্চলে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৩ থেকে ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করে।

আজ সোমবার মাঘ মাসের দ্বিতীয় দিনে রংপুরে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৯ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হলেও শীতের তীব্রতা কমেনি। বরং দিনভর কুয়াশাসহ হিমেল হাওয়ায় কনকনে ঠাণ্ডার কারণে হাটবাজার, রাস্তাঘাট অনেকটাই ফাঁকা ছিল। বিকেলের ভেতর স্তব্ধ হয়ে যায় গোটা অঞ্চল। সর্বোচ্চ এবং সর্বনিম্ন তাপমাত্রা কাছাকাছি থাকায় শীতের তীব্রতা বেড়েছে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া দপ্তর।

রংপুরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, প্রচণ্ড শীতে জনজীবন প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। একইসঙ্গে ঘন কুয়াশার চাদরে ঢাকা পড়েছে জনপদ।

তিস্তাপারের ধামুর এলাকার সত্তুর বছরের জিন্নাত আলী বলেন, 'নদীপারের ঝুপড়ি ঘরোত হু হু করি বাতাস ঢোকে। ঠাণ্ডায় সারারাইত নিন (ঘুম) ধরে না।' শীতের তীব্রতা বৃদ্ধি পাওয়ায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন চরাঞ্চলের অভাবি মানুষজন। বাধ্য হয়ে তারা শীত নিবারণে খড়কুটো সংগ্রহ করে গণঅগ্নিকুণ্ড ব্যবহার করছেন। আগুন পোহাতে গিয়ে অসাবধানতায় দগ্ধ হচ্ছেন নারী ও শিশুরা।

সরেজমিনে আজ সোমবার সকালে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে দেখা গেছে, বার্ন ইউনিটের আইসিউই, ৬ নম্বর ওয়ার্ড, ১৬ নম্বর ওয়ার্ড এবং ১৮ নম্বর ওয়ার্ডে ছয়জন দগ্ধ শিশুসহ ৫২ জন চিকিৎসাধীন। এদের মধ্যে বেশিরভাগই নারী। বার্ন ইউনিটে বিছানায় জায়গা না হওয়ায় বারান্দায় রাখা হয়েছে অনেক রোগীকে।

চিকিৎসাধীন রয়েছেন নীলফামারীর কিশোরগঞ্জের আসমা বেগম। তিনি জানান, শীতের কবল থেকে বাঁচতে ধানের খড় দিয়ে আগুন পোহাতে গিয়ে অসাবধানতায় শাড়ির পেছনে আগুন লেগে যায়। এতে তার কোমরের নিচ থেকে পা পর্যন্ত ঝলসে যায়। একই ধরনের কথা জানিয়েছেন রংপুরের পানবাজার এলাকার মমতাজ বেগম, লালমনিরহাটের আদিতমারীর মনোয়ারা বেগমসহ দগ্ধ অনেকেই।

চিকিৎসাধীন দগ্ধ শিশু পাঁচ বছরের তাসনিমের মা জমিলা বেগম জানান, চাদর গায়ে মুড়িয়ে দিয়ে আগুন পোহানোর সময় চাদরের এক কোনায় আগুন লেগে দগ্ধ হয়েছে তার মেয়ে। চিকিৎসাধীন প্রায় সবাই শীত নিবারণ করতে গিয়েই দগ্ধ হয়েছেন বলে জানা গেছে।

রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের প্রধান ডা. মারুফুল ইসলাম বলেন, 'ওয়ার্ডে মোট বেড সংখ্যা ২৬টি অথচ দগ্ধ রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি। এ কারণে বাধ্য হয়ে অনেক রোগীকে মেঝেতে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে।' 



মন্তব্য