kalerkantho


'একনা কম্বল দেও বাবা'

আব্দুল খালেক ফারুক, কুড়িগ্রাম    

৯ জানুয়ারি, ২০১৮ ০৯:১৮



'একনা কম্বল দেও বাবা'

'বন্যার সমায় হামার খেতা বালিশ ভাসি গেইছে। তার উপরা যে জার পরছে। এই জার হামরা কাটাই কেমন করি। জারোতে হিনা হামরা মরি যাই। একনা কম্বল দেও বাবা।'

এমন আকুতি ধরলা পারের গ্রাম ফকিরপাড়া গ্রামের বৃদ্ধা ভিক্ষুক পাইনজো বিবির। স্বামী বায়েজীদ বোস্তামিও ভিক্ষুক। এখন অসুস্থতার জন্য গৃহবন্দি। স্বামী-স্ত্রীর সংসারে তাই পাইনজোর আয়ই ভরসা। তীব্র শীত উপক্ষো করে ছেঁড়া সোয়েটার আর পাতলা একটি চাদরে শরীর ঢেকে ছুটতে হয় ভিক্ষা করতে।

এই দম্পতি জানান, ভাঙাচোরা ছাপড়া ঘরে কঠিন শীত পার করলেও শীতবস্ত্র দিয়ে কেউ তাদেরকে সহায়তা করছে না।

আজ মঙ্গলবার সকালে সদর উপজেলার ধরলা তীরবর্তী ফলিকরপাড়া, মণ্ডলপাড়া ও বাংটুরঘাট এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ঘন কুয়াশায় ঢেকে আছে চারপাশ। রাস্তাঘাটে লোক চলাচল কম। কাঁপুনি ধরা ঠাণ্ডায় মজুররা মাঠে যেতে না পারায় সংসারে অভাব জেঁকে বসেছে। শিমসহ কয়েকটি সবজিতে মড়ক দেখা দেওয়ায় ক্ষতির মুখে কৃষকরা। 

আরো পড়ুন খাবার চাওনা বাহে, অ্যাকনা কম্বল দেও

ফকিরপাড়া গ্রামের কৃষক এনামুল হক জানান, তার ৬০ শতক শিমের ক্ষেত গত এক সপ্তাহের তীব্র শীতে ছত্রাক লেগে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কোনো ওষুধ কাজ করছে না। একই গ্রামের কৃষক তারা মিয়া জানান, আলুতে কোনো কোনো এলাকায় সীমিতভাবে ছত্রাকের আক্রমণ দেখা দিয়েছে। তাই ঘন ঘন স্প্রে দিয়ে মড়ক ঠেকানোর চেষ্টা করছেন তারা। তবে ঠাণ্ডার কারণে মজুর পাওয়া মুশকিল হয়ে গেছে।

বাংটুর ঘাট এলাকার দিনমজুর আমজাদ হোসেন বলেন, 'যে জার পড়চে। কাম করব্যার গেইলে শরীল কাঁপে। হাত-পাও ধরে। কেমন করি কাম করি। চাউলের দাম বেশি। খুব কষ্টে আছি বাহে।' মাটি কাটার কাজ করেন মধ্যবয়সী আয়েশা বেগম। কয়েকদিন ধরে কাজে যেতে পারছেন না তিনি। সারাদিনই ঠাণ্ডায় অস্থির থাকেন। খড়কুটো জ্বালিয়ে উত্তাপ নেন। বলেন, 'এদোন করি কয়দিন চলবে। কী বিপদ আসিল বাহে।' 

আরো পড়ুন কুড়িগ্রামে এক সপ্তাহে শীতজনিত রোগে মৃত্যু ১১ জনের

বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে ঘর-বাড়ি ভেসে গেছে সন্ন্যাসী গ্রামের দিনমজুর বাহাদুর মিয়ার। সরকারি বেসরকারি সাহায্য সহয়োগিতা নিয়ে কোনোমতে বাঁধের ধারে মাথা গুঁজে আছেন। ধরলা নদীর হিমেল বাতাশে কাবু হয়ে পড়েছেন এই বৃদ্ধ। কোনো  শীতবস্ত্র পাননি। একই অবস্থা প্রতিবেশী খায়রুল, নুরুজ্জামান, শাহাদাতসহ অনেকের।

ঠাণ্ডার কবলে পড়ে শিশু ও বৃদ্ধরা আক্রান্ত হচ্ছে নানা রোগে। কাজীপাড়া গ্রামের মিনজু বেগম জানান, তার ৯ মাস বয়সী ছেলে মেরাজ নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে। কয়েকদিন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে কিছুটা সুস্থ হলেও আবারো অসুস্থ হয়ে পড়েছে সে। একই গ্রামের শিউলী গেম জানান, তার ১৪ মাস বয়সী ছেলে আবু বকর শ্বাসকষ্টের রোগে ভুগছে।

অপরদিকে, অত্যধিক ঠাণ্ডায় গবাদি পশু নিয়ে দুর্ভোগে পড়েছেন মালিকরা। গরু ছাগলকে পুরনো কাপড় আর চট দিয়ে ঢেকে দিয়েও রক্ষা করা যাচ্ছে না। দেখা দিচ্ছে নানা অসুখ বিসুখ। মারা যাচ্ছে গবাদি পশুও। বাংটুর ঘাটের খমিরণ জানান, রবিবার রাতে তাদের একটি ছাগল মারা গেছে আর সোমবার রাতে মারা গেছে একটি গরু।

কুড়িগ্রাম কৃষি আবহাওয়া অফিসের তথ্যমতে, আজ মঙ্গলবার সকালে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ৫ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। 

 

 



মন্তব্য