kalerkantho


খরুলিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে যা ঘটেছে...

দুই প্রধান শিড়্গককে আসামী করে 'ক্যাডার আয়াতে'র মামলা
বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির ১৫ জনের ১৩জনই জামায়াত
জামায়াতের ক্যাডার ও সংগঠনভিত্তিক দ্বন্দ্ব
তাফসীর মাহফিল নিয়েও পুরানো বিরোধ

নিজস্ব প্রতিবেদক, কক্সবাজার   

৯ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:৪১



খরুলিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে যা ঘটেছে...

ছবি: কালের কণ্ঠ

'ইয়ান মানুষ গড়ার কারখানা নয়- মানুষ মারার কারখানা হই গেইয়্যে' অর্থাৎ কক্সবাজারের খরুলিয়া উচ্চ বিদ্যালয়টি নিয়েই এমন কঠিন মন্তব্য স্থানীয় একজন গ্রামবাসীর। গতকাল সোমবার সকাল বেলায় বিদ্যালয় এলাকায় গিয়ে এমন মন্তব্যটি শুনা গেছে। বিদ্যালয়টির দেওয়ালে চিকাও দেখা গেছে-'মানুষ গড়ার কারিগর-ইসলামী ছাত্র শিবির।' এই বিদ্যালয়েই রবিবার স্থানীয় একজন অভিভাবককে রশি দিয়ে বেঁধে বেদম মারধর করা হয়। এমন বর্বর ঘটনার ভিডিও ফেসবুকে ভাইরাল হয়ে পড়ে। দেশ-বিদেশে বিদ্যালয়টি নিয়ে উঠে নানা কথা।

রবিবারের এ ঘটনাটি নিয়ে গতকাল সোমবার রাতে কক্সবাজার সদর মডেল থানায় মামলা হয়েছে। ঘটনার শিকার স্থানীয় জামায়াত-শিবিরের ক্যাডার আয়াতুলস্নাহ বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করা হয়। মামলায় তার ওপর পরিচালিত বিদ্যালয়টির ছাত্র ও শিক্ষকদের নির্যাতনের বিবরণ তুলে ধরা হয়। মামলায় খরুলিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এবং জামায়াত সমর্থিত জহিরুল হক ও স্থানীয় কেজি স্কুলের অধ্যক্ষ ও জামায়াত সমর্থিত মাষ্টার বোরহান উদ্দিন এবং বিদ্যালয়ের দপ্তরি নুরুল হকসহ ৬ জনের নাম উল্লেখসহ আরো কয়েকজনকে আসামি করা হয়।

ঘটনার ব্যাপারে সদর মডেল থানার ওসি রনজিত কুমার বড়ুয়া জানিয়েছেন, ঘটনাটি অত্যন্ত ন্যাক্কারজনক। ঘটনার ব্যাপারে মামলা রেকর্ড করার পর আসামিদের গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশি অভিযান শুরু করা হয়েছে।

সরেজমিন জানা গেছে, একজন আওয়ামী লীগ নেতাকে সামনে দিয়েই কক্সবাজারে দুটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সরকারি বিরোধ কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে চিহ্নিত জামায়াত শিবিরের ক্যাডাররা। কক্সবাজার-চট্টগ্রামের মহাসড়কের পাশেই জামায়াত-শিবিরের ঘাঁটিতে গড়ে উঠা খরুলিয়া উচ্চ বিদ্যালয় ও কেজি অ্যান্ড প্রি-ক্যাডেট স্কুল দু'টি স্বাধীনতা বিরোধীরা নিজেদের কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে সুকৌশলে। এই দুই স্কুলের মধ্যে স্থানীয় জামায়াতের ক্যাডার ভিত্তিক ও সাংগঠনিক ভিত্তিক ক্ষমতা নিয়েই তৈরি হয়েছে বিরোধ।

এই অংশ হিসেবে গত রবিবার সকালে সাংগঠনিক ভিত্তিক জামায়াত নেতা খরুলিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জহিরুল হকের নেতৃত্বে পরিকল্পতিভাবে দড়ি দিয়ে বেঁধে মারধর করা হয় স্থানীয় এক সময়ের দুর্ধর্ষ শিবির ক্যাডার ও বর্তমানের জামায়াত কর্মী আয়াত উল্লাহকে। স্কুলের মধ্যে ভাগভাটোয়ার ও নেতৃত্ব নিয়েই ঘণ্টাব্যাপী বেঁধে আয়াত উল্লাহকে মারধর করা হয়েছে বলে অভিযোগ।

খরুলিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জহিরুল হক বলেন, আয়াত উল্লাহ হলো সন্ত্রাসী। তার বিরুদ্ধে নাশতকাসহ প্রায় আটটি মামলা রয়েছে। প্রতিনিয়ত তিনি স্কুলে এসে নিজের ক্যাডার ভিত্তিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যায়। গত সোমবারও এসে স্কুলের শিক্ষকদের গালিগালাজ করে। এক পর্যায়ে কেজি অ্যান্ড প্রি-ক্যাডেট স্কুলের প্রধান শিক্ষক বোরহান উদ্দিন ও আমার গায়ে হাত তুলে। বিষয়টি শিক্ষার্থীরা দেখে এগিয়ে এসে আয়াত উল্লাহকে মারধর করে।

আয়াত উল্লাহ বলেন, আমার ছেলে শাহরিয়ার নাফিজ আবির খরুলিয়া কেজি অ্যান্ড প্রি-ক্যাডেট মডেল স্কুলে প্রথম শ্রেণি থেকে দ্বিতীয় শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়েছে। রবিবার সকালে ছেলের দ্বিতীয় শ্রেণিতে ভর্তির বিষয়ে জানতে স্কুলে যায়। কিন্তু দ্বিতীয় শ্রেণিতে মাসিক বেতন হলো ২৫০ টাকা। আর ভর্তি হলো ১ হাজার টাকা। যা গত বছর ছিল মাসিক বেতন ২০০ টাকা ও ভর্তি ফ্রি ছিল ৬০০ টাকা।

তিনি আরো বলেন, অঘোষিতভাবে কাউকে না জানিয়ে কেন এতো টাকা বাড়ানো হলো; এসব বিষয়ে আমি কেজি অ্যান্ড প্রি-ক্যাডেট স্কুলের প্রধান শিক্ষক বোরহানের কাছ থেকে জানতে চায়। এবং আমার ছেলে এ প্লাস না পাওয়ার কারণও জানতে চায়। একজন অভিভাবক হিসেবে এসব বিষয়ে জানতে চাইলে প্রধান শিক্ষক বোরহান ক্ষিপ্ত হয়ে যান। এমনকি বিভিন্নভাবে তিনি ধমকি স্বরূপ স্কুলের কমিটির সঙ্গে কথা বলতে বলেন আমাকে।
 
তার কথা মতো একই কমিটির পরিচালিত লাগানো খরুলিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জহিরুল হকের কাছ থেকে জানতে চায় স্কুলের বিভিন্ন বিষয়ে। সম্প্রতি একটি গোপনে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি বিষয়েও জানতে চাওয়া হয় জহিরুল হকের কাছ থেকে। এসব বিষয়ে জানতে চাওয়ায় দুই স্কুলের প্রধান শিক্ষক ক্ষিপ্ত হয়ে আমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে। এক পর্যায়ে দুই প্রধান শিক্ষক অপরাপর শিক্ষক ও ছাত্রদের ডেকে আমাকে এলোপাতাড়ি মারধর করতে থাকে অতর্কিতভাবে।

মারধরের এক পর্যায়ে দড়ি নিয়ে এসে আমার হা ও পা বেঁধে ফেলে। এরপর যে যার মতো করে আমাকে লাথি ঘুষি ও লাঠি দিয়ে পেটাতে থাকে। প্রায় ঘণ্টাব্যাপী মাটিতে ফেলে আমাকে নির্যাতন করে দুই স্কুলের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। পরে এলাকাবাসীরা এসে আমাকে উদ্ধার করেন।

এলাকাবাসীরা জানিয়েছে, ১৯৯৩ সাল থেকে যাত্রা শুরু হয় খরুলিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের। এরপরে বিদ্যালয়ের সামনের মাঠে কেজি অ্যান্ড প্রি-ক্যাডেট নামে আরো একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হয়। এই দুই স্কুলের পরিচালনা কমিটি রয়েছে একটি। প্রায় ১৫ জন পরিচালনা কমিটির মধ্যে সভাপতি হাজী এনামুল হক হলেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা। আর প্রথম সদস্য মোস্তফা কামাল স্থানীয় বিএনপি নেতা। বাকি ১২ জন সবাই চিহ্নিত জামায়াত শিবিরের কর্মী।

এ ছাড়া খরুলিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের ২৬ জন শিক্ষকের মধ্যে দুইজন হিন্দু শিড়্গক ছাড়া সবাই জায়ামাতের কর্মী। এর মধ্যে মাস্টার ওবায়দুল হক বাবুল ও ফয়সাল নাশকতা মামলার জেল ফেরত আসামি। একই কমিটির নিয়ন্ত্রণে থাকা কেজি অ্যান্ড প্রি-ক্যাডেট স্কুলের ছয়জন শিক্ষকের মধ্যে পাঁচজনই জামায়াত সমর্থিত শিক্ষক। বাকি একজন হিন্দু শিক্ষক।

এ বিষয়ে স্কুল পরিচালনা কমিটির মধ্যে অন্যতম সদস্য মোস্তফা কামাল বলেন, আমি বিএনপি রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ঠিক আছে। সভাপতি এনামুল হক আওয়ামী লীগের নেতা। আর বাকি সবাই জামায়াত সমর্থিত লোকজন। তিনি বলেন, সভাপতি হিসেবে এনামুল হককে আমি নিয়ে এসেছি। কিন্তু খরুলিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দ্বিমত ছিল। তারপরও আমি থাকে সভাপতি করি।

স্থানীয় একটি সূত্রে জানা গেছে, মহাসড়কের পাশে হওয়ায় এই স্কুলের দিকে তেমন কারো নজর নেই। আর খরুলিয়া হচ্ছে জামায়াত শিবিরের মূল ঘাঁটি। অতীতে তিনবার এই স্কুলের সামনে হামলার শিকার হয়েছিল বর্তমান কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মোস্তাক আহমদ চৌধুরী।

বিএনপি-জামায়াতের আন্দোলনের সময়ে এই এলাকা থেকে বহুবার সহিংসতার ঘটনা ঘটে। বহুবার ইট পাটকেল নিড়্গেপ করে গাড়িও ভাঙচুর করা হয়েছিল। এমনকি দেলোয়ার হোসাইন সাঈদীকে চাঁদে পাঠানোর নামে যে সহিসংতার ঘটনা ঘটে তার সূত্রপাত হয় খরুলিয়া স্কুলের সামনে থেকে। এই সহিংসতায় জ্বালাও পোড়াও এবং সড়কে গাছ ফেলে ব্যারিকেট ও রাস্তা কেটে অবরোধ করা হয় খুরুলিয়া স্কুলের সামনে থেকে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, খরুলিয়া স্কুলে নিয়মিত জামায়াতের গোপন বৈঠকের কার্যক্রম চলে। শিবির কর্মীদের নিয়মিত সাথী বৈঠকসহ প্রশিক্ষণের দিক নির্দশনাও চলে বহুবার। স্কুল কমিটির লোকজন গোপনে জামায়াত সমর্থিক কর্মীদের নিয়োগ দিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের এই জামায়াতি কার্যক্রম সহজেই চালিয়ে নিতে কেৌশলে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা হাজী এনামুল হককে কমিটির সভাপতিও করা হয়।

এ বিষয়ে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি হাজী এনামুল হক বলেন, 'আমি বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি। স্থানীয় আওয়ামী লীগের সঙ্গে আমি জড়িত রয়েছি। কমিটির অপর একজন সদস্য মোস্তফা কামাল হচ্ছেন বিএনপি নেতা। অন্যান্যরা সবাই জামায়াতের লোকজন।'

তিনি আরো বলেন, ছাত্র শিবিরের সাবেক ক্যাডার এবং বর্তমান জামায়াত নেতা আয়াত উল্লাহ হলেন- খরুলিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র। তিনি প্রায় সময় স্কুলে গিয়ে শিক্ষকদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেন বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে। শুধু স্কুলে নয়; এলাকার মসজিদ মাদরাসায়ও একই অবস্থা করেন আয়াত উল্লাহ।

তার এমন আচরণ নিয়ে তিনিসহ গত শনিবার স্কুলের শিক্ষক ও কয়েকজন অভিভাবকের মধ্যে বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে কথা হয়েছে আগামী শনিবার আবার তাদের মধ্যে বৈঠক হবে। এর মধ্যে গত রবিবার কেজি স্কুলে গিয়ে প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে খারাপ আচরণ করেন। এমনকি প্রধান শিক্ষকের গায়ে হাত তুলেন। বিষয়টি দেখে অপর শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা তাকে মারধর করে এক পর্যায়ে বেঁধে রাখেন।

তিনি বলেন, আসলে দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখাটি ভুল হয়েছে। এ বিষয়ে সবার পক্ষ থেকে আমি ক্ষমাও চেয়ে নিয়েছি। এমনকি আয়াত উল্লাহ নিজেও শিক্ষকের কাছ থেকে ক্ষমা চান। বিষয়টি প্রাথমিকভাবে মিমাংসাও হয়েছে।   

কক্সবাজার সদর থানার ওসি রনজিত কুমার বড়ুয়া বলেন, খরুলিয়া এলাকাটি জামায়াতের ঘাঁটি হিসেবে চিহ্নিত। ওখানে অনেক নাশকতা মামলার পলাতক আসামির বাড়িও রয়েছে। তাছাড়া আয়াত উল্লাহর বিরুদ্ধে হত্যা ও নাশকতাসহ আটটি মামলা রয়েছে।

তিনি বলেন, খরুলিয়া উচ্চ বিদ্যালয় ও কেজি অ্যান্ড প্রি-ক্যাডেট স্কুল দুটি জামায়াত সমর্থিত লোকজনের বলে বিভিন্নভাবে জানা গেছে। এই বিদ্যালয়ে গোপন বৈঠক বা সরকারবিরোধী কোনো কর্মকাণ্ড এবং সাংগঠনিক গোপন তৎপরতার বিষয়ে নজরদারী রয়েছে।

স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধার ছেলে কক্সবাজার জেলা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম বলেন, গত বছরের ডিসেম্বরে তিন দিনব্যাপী সীরাতুনবী মাহফিল হয় স্কুলের মাঠে। কমিটির লোকজন এই মাহফিলের আয়োজন করেন। এই মাহফিলে প্রধান বক্তা ছিলেন বাংলাদেশে দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর পরের বক্তা চুয়াঙ্গার আব্দুল কাদের জিহাদী। তার বক্তব্যে তিনি সরকার বিরোধী বিভিন্ন কথাবার্তা বলেন। এমনকি শিবিরের স্লোগানও হয় মাহফিলের পরেই। এ বিষয়ে বিভিন্ন জায়গায় অভিযোগ করা হয়েছিল তখন।

কক্সবাজার-চট্টগ্রামের মহাসড়কের পাশেই জামায়াত-শিবিরের ঘাঁটিতে গড়ে উঠা খরুলিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে মানুষ তৈরির কারখানার বদলেই মানুষ মারার কারখানা হিসেবে গড়ে উঠেছে বলে আক্ষেপ সুরে মন্তব্য করেছেন স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল কাদের। তিনি বলেন, একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গরুর মতো একজন অভিভাবককে হাতে, পায়ে ও গলায় দড়ি বেঁধে প্রকাশ্যে মারধরের ঘটনা কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে হতে পারে না। এটি দেশের জন্য ইতিবাচক নয়।



মন্তব্য