kalerkantho


'এত ঠাণ্ডা ল্যাগছে, কাজে মুন চ্যাচ্ছে না'

রফিকুল ইসলাম, রাজশাহী    

৭ জানুয়ারি, ২০১৮ ১১:৫৫



'এত ঠাণ্ডা ল্যাগছে, কাজে মুন চ্যাচ্ছে না'

'এত ঠাণ্ডা ল্যাগছে, কি যে করি। ঘরেও থ্যাকতে প্যারছি না। আবার বাহিরেও বাতাসের অত্যাচার। এই ঠাণ্ডায় কাজ করতেও মুন চ্যাচ্ছে না। কিন্তু কাজ না করলে খ্যাতে দিবে ক্যাডা। তাই কষ্ট হলেও কাজ করতে বাহিরে আইছি।'

আজ রবিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে নির্মাণকাজের ফাঁকে শীতে কাবু হয়ে মাঠের মধ্যে খড়কুটো জ্বালিয়ে আগুন তাড়ানোর চেষ্টার সময় এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন রাজশাহী নগরীর উপকণ্ঠ হরিয়ান এলাকার বাসিন্দা নাজিরুল ইসলাম।

নাজিরুলের মতো হাজার হাজার হাজার শ্রমিক রাজশাহীতে অব্যাহত শীতের মধ্যে দুর্ভোগ মাথায় নিয়ে কাজের সন্ধানে বাড়ি থেকে বের হচ্ছেন। আর শীতের কাঁপুনির মধ্যেই সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত কাজ করে চলেছেন শ্রমিকরা।

সারা দেশে এখন চলছে শৈত প্রবাহ। এতে উত্তরাঞ্চলের জেলা রাজশাহীতে বিজার করছে তীব্র শীত। বলা যায়, শীতে কাহিল হয়ে পড়েছে জেলার সাধারণ মানুষ। একেবারে প্রয়োজন ছাড়া ঘর ছেড়ে বের হচ্ছেন না কেউ।

কিন্তু খেটে খাওয়া মানুষ ঘরে বসে না থাকতে পারায় তাদের দুর্ভোগের যেন শেষ নেই। কাজের সন্ধানে বের হয়ে তীব্র শীতের মধ্যে কাঁপছেন তারা। শীত নিবারণ করতে অনেককে খুড়কুটো জ্বালিয়ে রাখতে দেখা যায়। কিন্তু ছিন্নমূল বা খেটে খাওয়া হতদরিদ্র মানুষের মাঝে তেমন সাহায্য নিয়ে হাত বাড়ানোর তেমন কোনো খবর পাওয়া যায়নি। ফলে ভোগান্তিতে পড়েছেন এসব মানুষ।

আজ সকাল সাড়ে ১১টায় এ রিপোর্ট লেখার সময় পর্যন্ত রাজশাহীর আকাশে দেখা মেলেনি সূর্যের। কুয়াশাও ছিল এ সময় পর্যন্ত। ফলে ঠাণ্ডার পরিমাণ বেলা বাড়লেও কমেনি। বরং বাতাসের কারণে আরো ঠাণ্ডা জেঁকে বসেছে।

রাজশাহী আবহাওয়া অফিসের উচ্চ পর্যবেক্ষক হেলেনা খানম জানান, রবিবার রাজশাহীতে বছরের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৫ দশকি ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এর আগে গতকাল শনিবার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ৫ দশকি ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তবে রবিবার ছিল চলতি বছরের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা। আজ রবিবার ভোর ৫টা থেকে সকাল ৬টার মধ্যে এ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়।

তাপমাত্রা নিচে নামার পাশাপাশি উত্তরের হিমেল হাওয়া ঠাণ্ডার পরিমাণ আরো কয়েকগুণ বেড়ে যায়। পাশাপাশি বয়ে যাচ্ছে শৈতপ্রাহ। চলতি সপ্তাহজুড়েই এরকম ঠাণ্ডা থাকতে পারে বলেও জানান তিনি।

রাজশাহী আবহাওয়া অফিস সূত্রমতে, গত ২ জানুয়ারি থেকে হিমেল হাওয়ার কারণে শীতের তীব্রতা বেড়েছে। পাশাপাশি কমছে তাপমাত্রা। মাঝে কেবল শনিবার বাদে প্রতিদিনই তাপমাত্রা নিচের দিকে নামছে। গত বুধবার চলতি শীত মৌসুমের মধ্যে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১০ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সেটি গত বৃহস্পতিবার সকাল ৬টায় গিয়ে রেকর্ড করা হয় ৮ দশমিক শূন্য ডিগ্রি সেলসিয়াস।

ফলে কনকনে শীতে কাবু হয়ে পড়ে জনজীবন। শুক্রবার সেটি গিয়ে দাঁড়ায় ৮ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। কিন্তু গতকাল শনিবার আবার কমে আসে ব্যাপক হারে। এক ধাপে নেমে আসে ৬ ডিগ্রির নিচে। গতকাল রেকর্ড করা হয় ৫ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আজ রবিবার সেটি গিয়ে দাঁড়িয়েছে ৫ দশকি ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসে।

আবহাওয়া অফিস সূত্র মতে, ১০ বছর পরে ২০১৩ সালের ৯ জানুয়ারি রাজশাহীতে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল ৪ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। যা তার আগের ১০ বছরের মধ্যে রেকর্ড সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল। এর আগে ২০০৩ সালের ২৩ জানুয়ারি সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল ৪ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

এরপর ২০০৪ সালে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল ৭ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ২০০৫ সালে সর্বনিম্ন তপামাত্রা ছিল ৭ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ২০০৬ সালে ৬ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ২০০৭ সালে ৬ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ২০০৮ সালে ৬ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ২০০৯ সালে ৬ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ২০১০ সালে ৬ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ২০১১ সালে ৪ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ২০১২ সালে ৬ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ২০১৩ সালে ৪ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ২০১৪ সালে ছিল ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ২০১৫ সালে রাজশাহীতে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৬ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ২০১৬ সালে ৬ দশমিক ৮ ডিগ্রী সেলসিয়াস এবং ২০১৭ সালে চার বছর পরে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৫ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

এদিকে, তীব্র শীতে অতিষ্ঠ রাজশাহীসহ গোটা উত্তরাঞ্চলের মানুষ। শীতে একেবারে কাহিল হয়ে পড়েছেন তারা। এ অবস্থা বিরাজ করছে গত তিন-চার দিন ধরেই।

সরেজমিনে দেখা গেছে, তীব্র শীতে কাতর হয়ে পড়েছেন কর্মজীবী থেকে শুরু করে শিশু ও ছিন্নমূল মানুষ। শীতের কারণে মানুষের চলাফেরা ও কার্যক্রমে দেখা দিয়েছে স্থবিরতা। অনেককে খড়কুটো সংগ্রহ করে আগুন জ্বালিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা করতে দেখা গেছে। আবার অনেকেই তীব্র শীত উপেক্ষা করেই কাজের সন্ধানে বেরিয়ে পড়েন রাস্তায়। ফলে শীতে কাহিল হয়ে পড়েন তারা।

রাজশাহী নগরীর দরিখরবোনা বস্তির বাসিন্দা নূর ইসলাম বলেন, 'খুব কষ্টে আছি। এতো শীত তাও একটি গরম কাপড় কেউ দিয়ে যায়নি। শীতের কারণে ঘর থেকেই বাইর হতে পারছি না। তাই কখনো আগুন জ্বালাইয়ে আবার কখনো ঘরের মধ্যে বসে থেকে শীত তাড়ানোর চেষ্টা করছি। কিন্তু গরম কাপড় গায়ে জড়াতে পারছি না।'

দরিখরবোনা এলাকার বাসিন্দা দিলবার রহমান বলেন, 'খুব কষ্টে আছি শীতে। কখনো শীত তাড়াতে চেষ্টা করছি আগুন জ্বালিয়ে। আগুন আর কতক্ষণ জ্বালানো যায়। তাই বেশিরভাগ সময় কষ্টেই কাটছে।'

রাজশাহী জেলা প্রশাসক হেলাল মাহমুদ শরীফ বলেন, 'আমাদের কাছে পর্যাপ্ত পরিমাণ শীতের কাপড় আছে। গত কয়েকদিন ধরেই আমরা উপজেলা পর্যায়ে শীতের কম্বল বিতরণ করেছি। এখনো করছি। নগরীতে তিনটি টিমের মাধ্যমে শীতের কম্বল বিতরণ করা হচ্ছে। কাজেই কোনো সংকট নাই।' 



মন্তব্য